পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ভালোবাসতে চাই সেইভাবে...

মুসলিম পরিবারে জম্ম আমার।বাবা মা খুব বেশী প্র্য্যাকটিসিং না হলেও ইসলামের প্রতি তাদের ছিল আলাদা একটা শ্রদ্ধা,ভালবাসা।

আল্লাহ রাসুলের নাম শুনলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যেত তাদের। তাই ইসলামকে চেনা সেই ছোটকাল থেকেই, তখন থেকেই ইসলামের প্রতি আলাদা একটা ভালবাসা তৈরী হয়।

খুব ছোটকাল থেকেই ইসলামকে ভালবাসতে শুরু করি আমি।নিয়মিত নামাজে যেতাম,সকালে যেতাম মক্তবে,আর এলাকার ওয়াজ মাহফিল গুলোতে থাকতাম নিয়মিত।মাহফিল হচ্ছে শুনলে অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে চলে যেতাম ওয়াজ শুনার জন্য।

হ্যা আমি ইসলামকে ভালবাসতাম ছোটকাল থেকেই, এখনো ভালবাসি, তবে ছোটকালের সেই ভালবাসা আর আজকের ভালবাসার মধ্যে রয়েছে অনেক তফাৎ। ছোটকাল থেকে দেখে এসেছি বাবা মা ইসলামকে অনেক ভালবাসতেন,এখনো সেই ভালবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। তবে আমার বাবা মার ইসলামকে ভালবাসার সীমারেখা ছিল সাপ্তাহিক জুমার নামাজ,আত্বীয়-স্বজন মারা গেলে কুলখানি দেওয়া,রমজান আসলে রোজার সাথে টুকটাক ইবাদত করা কিংবা কোরবানির ঈদে সুন্দর দেখে একটা গরু কোরবানি দেওয়া(যদিও মা নামাজ পড়ত)।

বাল্যকাল থেকে এভাবে দেখে এসেছি আমার বাবা মা,এলাকাবাসি কিংবা নিকটাত্মীয়দের ইসলামকে ভালবাসার প্রতিচ্ছবি! আমাদের দেশে শতকরা ৯০% মানুষ মুসলিম। এটা আমরা খুব গর্বের সাথে বলি প্রায় সময়।আমরা এটাও বলি যে আমাদের ঢাকা মসজিদের শহর,তবে সবচেয়ে যে কথাটা বলে আমরা বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি তা হল " আমি মুসলিম পরিবারে জম্মগ্রহণ করে গর্বিত,আমি ইসলামকে অনেক ভালবাসি।

হ্যা ইসলামকে আমরা অনেক ভালবাসি,মুসলিম পরিবারে জম্মগ্রহণ করে আমরা খুব গর্বিত! তবে ইসলামের প্রতি আমাদের ভালবাসা আর মুসলিম হিসেবে গর্বিত বোধ করার বিষয়টি শুধুমাত্র আমাদের কন্ঠনালী পর্যন পৌঁছেছে,এর চেয়ে বেশী কিছু বলে আমার মনে হয়নি।

কোন এক পরিসংখ্যানে দেখেছি বাংলাদেশ এর শতকতা ৯০ ভাগ মুসলিম হলেও নিয়মিত সালাত পড়ে পাঁচ ভাগ মানুষ,সেই পাঁচ ভাগের আবার দুই ভাগ পড়ে পাঁচ ওয়াক্ত আর তিন ভাগ পড়ে এক,দুই কিংবা তিন ওয়াক্তের মত।

আমার মনে হয় না এই পরিসংখ্যানের খুব কম বেশী হবে।সেটা আপনারা পাশের মসজিদগুলোতে গেলে দেখতে পাবেন। অনেক ছোট মসজিদেও ফজরের সময় এক কাতার হতে কষ্ট হয়ে যায়। স্কুলে পড়ার সময় যখন গ্রামের মসজিদে ফজরের নামাজে যেতাম ইমামসহ দু তিন জনকে নিয়ে জামাত করতে হত!এমন ও অনেক সময় হয়েছে কোন মুসল্লি না পেয়ে ইমাম সাহেব একা নামাজ পড়ে চলে গেছেন!! অথচ আমাদের মসজিদের আওতাধীন কমপক্ষে ৬০০ থেকে ৮০০ পুরুষ আছেন,যারা নির্বিঘ্নে ঘুমিয়েই ইসলামকে ভালবেসে যান! এখনো এই অবস্থার খুব বেশী পরিবর্তন হয়নি । অথচ সাহাবীদের যুগে কোন মুসলিম সালাত পড়েনা এটা চিন্তা কিংবা কল্পনাও করা যেতনা।

কিন্তু আপনি যদি জুমার নামাজে যান দেখবেন যে মসজিদের প্রত্যেকটি কাতার পূর্ণ হয়ে মসজিদের বাইরে পর্যন্ত অনেককে নামায পড়তে হয়।কিন্তু অন্য সময় অবস্থা হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। এজন্যইতো একজন মনিষীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল মুসলিমরা তাদের হারানো গৌরব,রাজত্ব কখন ফিরে পাবে,তখন তিনি বলেছিলেন যেদিন তুমি দেখবে যে ফজরের সময় মসজিদগুলোর প্রত্যেকটি কাতার পরিপূরণ হয়ে যাবে!


রাসুল সাঃ বলেছেন " মুসলিম এবং কাফেরের পার্থক্যকারী হচ্ছে সালাত " এবং " যে সালাত ত্যাগ করল সে কাফের হয়ে গেল "

কিন্তু আজকে অধিকাংশ মানুষ সালাত ত্যাগ করে মুসলিম দাবী করছে। আপনি যদি আমাদের দেশের সব মুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন আপনি ইসলামকে কত ভালবাসেন,রাসুলকে কেমন ভালবাসেন,তখন প্রায় সবাই উত্তর দিবে আমি ইসলামকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসি,রাসুলের (সাঃ) জন্য আমার জীবন দিতে পারি।

এটা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য,তবে এই ভালবাসার বাস্তবতা খুঁজতে গেলে আপনাকে বারবার হতাশ হতে হবে।কারণ একটু আগেই যে মানুষটি ইসলামকে ভালবাসার কথা বলে গেল সেই মানুষটির ৫ ওয়াক্ত সালাত পড়তে খুব কষ্ট হয়,যেই যুবকটি রাসুল (সাঃ) কে ভালবেসে জীবন দেওয়ার কথা বলে গেল তাকে যদি বলেন রাসুলের (সাঃ) এর আদর্শ জীবনে ধারণ করেন,টাকনুর নিচে কাপড় পড়া ছেড়ে দেন,দাঁড়ি রাখেন,তখন তিনি নির্দ্বিধায় বলবেন যুগের সাথে তো তাল মিলিয়ে চলতে হবে,আর এই ছোটকাট সুন্নত পালন না করলে কিছু হবে না! তখন আর কিছুই বলার থাকেনা। আপনি দেখবেন কোরআনের জন্য জীবন দেওয়ার মত শত শত মানুষ এদেশে আছে কিন্তু কোরআনটা খুলে দেখার মত,একটু বুঝে পড়ার মত কিংবা সেটা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার মত খুব বেশী মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবেনা!অথচ আল্লাহ বলেছেন...

" আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি? " (সুরা ক্বামার-১৭,২২,৩২,৪০)

এবার বলুন কোরআন কি আলমারির সবচেয়ে উপরের তাকে রেখে,মাঝে মধ্যে বের করে জমে থাকা ধুলাবালি মুছে দুয়েকটা চুমো দিয়ে আগের অবস্থানে রেখে দেওয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে নাকি সেটা বুঝে পড়ে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার জন্য?

তাইতো খুব দুঃখের সাথে বলতে হয় কোরআনকে আমরা অনেক ভালবাসি,কোরআনের জন্য আমরা জীবন দিতে পারি! মুসলিমদের আদর্শ বলতে আজকে আর কিছুই বাকি নেই।মুসলিম যুবক যুবতিদের চারিত্রিক অবক্ষয় বলতে গেলে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে।

রাসুলের আদর্শকে বাদ দিয়ে তারা এখন ইহুদী-ক্রিষ্টানদেরকে আদর্শ বানিয়ে নিয়েছে। টাকনুর নিচে প্যান্ট পড়ে, ক্লিন শেভ করে, মুখটাকে মহিলাদের গালের মত করে,দাঁড়ি এবং চুলের বিভিন্ন কাটিং দিয়ে তারা নিজেকে স্মার্ট দাবী করছে।দিনের অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে তারা আড্ডা,গান,মিউজিক,নাটক কিংবা মুভিতে! পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার সময় তাদের হয়ে ওঠেনা,দাঁড়ি রাখার সুযোগও তাদের আসেনা।আর,কোরআন কি বলেছে সেটা জানার আগ্রহ ও কখনওই হয়না! কোরআন বুঝাতো দুরের কথা অনেক মুসলিম পরিবারের সন্তানরা এখন কোরআন তেলাওয়াত ই করতে পারেনা (ইন্নালিল্লাহ)।

সপ্তাহে একবার মসজিদে গিয়ে, কোরবানির সময় বড় একটা গরু কোরবানি দিয়ে কিংবা বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে শবে বরাত, শবে কদর পালন করেই এরা মুসলিমের দায়িত্ব শেষ করতে চায়। বাস্তব কথা হল আমরা ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেছি,ইসলাম আমাদের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি।

আমরা ইসলামকে ভালবাসার দাবী করছি,কিন্তু ইসলামকে জীবনে ধারণ করার কোন চেষ্টা আমরা করছিনা।আচ্ছা কেয়ামতের ময়দানে কি এই অযুহাতে পার পেয়ে যাব যে আমরা ইসলামকে ভালবাসতাম,আল্লাহ ও রাসুলকে ভালবাসতাম? আল্লাহ কি দেখবেন না আমরা কতটুকু ভালবাসতাম,ইসলামকে কতটুকু বুঝার চেষ্টা করেছিলাম আর কতটুকুই বা আমরা আমল করেছিলাম?শুধু ভালবাসার কথা কিংবা বিশ্বাসের কথা বললেই কি আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে??একটু চিন্তা করুন........... আল্লাহ কোরআনে সেটার ই উত্তর দিয়েছেন..

" মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা
হবে না? আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে।" -সুরা আনকাবূত (২-৩)

"তোমরা যা করতে তোমাদেরকে কেবল তারই প্রতিফল দেয়া হবে" -সুরা আত্-তূর (১৬)

সাহাবীরাও ইসলামকে ভালবেসেছিল,তবে তাদের ভালবাসা আমাদের মত মুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলনা।তারা বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছিল ইসলামকে কিভাবে ভালবাসতে হয়। তারা তাদের জীবনে সালাত কায়েম করতে পেরেছিল,টাকনুর নিচে কাপড় তারা কখনওই পড়তনা,দাড়িবিহীন কোন মুসলিমকে তারা কল্পনাও করতে পারতনা,পর্দাবিহীন কেউ চলাফেরা করতনা, কোরআনের শিক্ষা ও রাসুলের আদর্শকে তারা জীবনে ধারণ করতে পেরেছিল।

আল্লাহর প্রতি ছিল তাদের পূর্ণ আনুগত্য ও রাসুলের প্রতি ছিল পরিপূর্ণ অনুসরণ,সাথে ছিল আল্লাহর ভয় ও রহমতের অপূরন্ত
আশা। কবরের আযাব আর জাহান্নামের আযাবের কথা শুনলে তাদের চোখ ভিজে যেত অশ্রুতে,আর জান্নাতের নিয়ামতের কথা শুনলে তা লাভ করার আশায় চোখ ছলছল করে ওঠত! তাদের জীবনের প্রতিটি কাজ ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও রাসুলের আদর্শে পরিবেষ্টিত।

হ্যা আমিও ইসলামকে ভালবাসতে চাই, তবে সেভাবে যেভাবে আল্লাহ বলেছেন,যেভাবে নবী রাসুল ও সাহাবীরা ভালবেসেছেন। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।জীবনের প্রতিটি স্তরে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসুলের আদর্শকে ধারণ করে চলতে হবে,তবেই না ইসলামের প্রতি আমাদের ভালবাসা পরিপূর্ণ হবে। অন্যথায় এই ভালবাসা দিয়ে কীই বা হবে মুখে আওড়ানো বুলি ছাড়া?

______
লিখেছেন: মোহাম্মদ শাহজাহান (ছাত্র)

1 টি মন্তব্য:

  1. মাশাল্লাহ খুব সুন্দর লিখেছে, আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে হেদায়েত নসিব করুন আমি।

    উত্তর দিনমুছুন