পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ইসলামে সম্পত্তি বণ্টন

আল্লাহ্ সুবহানহুয়া তা'আলা বলেন:
আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেন। এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু কেবল কন্যা দুয়ের অধিক হলে তাদের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ। আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্যে অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ, আর নিঃসন্তান হলে এবং পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মাতার জন্যে এক-তৃতীয়াংশ। তার ভাই-বোন থাকলে মাতার জন্যে এক-ষষ্ঠাংশ, এ সবই সে যা অসিয়ত করে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের কে নিকটতর তা তোমরা জানোনা। এটা আল্লাহর বিধান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।

আর তোমাদের স্ত্রীদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্র্ধাংশ তোমাদের জন্যে যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। তাদের সন্তান থাকলে তোমাদের জন্যে তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ। তাদের কৃত অসিয়ত এবং ঋণ পরিশোধের পর। আর তাদের জন্যে তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর তোমাদের যদি সন্তান থাকে তবে তাদের জন্যে তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ। তোমরা যা অসিয়ত করবে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষ বা নারীর মিরাশ বণ্টন করা হবে, সে যদি পিতা-মাতা ও সন্তানহীন হয় এবং তার এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকের জন্যে এক-ষষ্ঠাংশ আর তারা একের অধিক হলে এক-তৃতীয়াংশের অংশিদার হবে, কৃত অসিয়ত পূরণ এবং ঋণ পরিশোধের পর কারো কোন রকম কমতি করা ছাড়া। এটা আল্লাহর নির্দেশ। এবং আল্লাহই সর্বজ্ঞ সহনশীল। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১১-১২)

এবাবে আল্লাহ তায়ালা মিরাস সম্পর্কে এমন সস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রদান করেন যে, এ ব্যাপারে কোনরূপ নতুন চিন্তাভাবনা কিংবা সংস্কার ও পরিমার্জনের অবকাশ রাখেননি। এ বিধানে কোন হকদার বঞ্চিত করা হয়নি। কারো পে হতে কোনরূপ পপাতিত্ব ও জুলুমের অভিযোগ তোলার সুযোগ রাখা হয়নি। প্রত্যেকের অংশ যেন ন্যায়ের নিক্তিতে পরিমাপকৃত।

ইসলামের উত্তরাধিকার নীতির বৈশিষ্ট্য :

ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সরাসরি আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক প্রদত্ত। এর বিধি-বিধান কুরআন মজীদে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে ।

ক. মৃতের রেখে যাওয়া সমুদয় সম্পত্তিই মিরাশের অন্তর্ভুক্ত। মৃত ব্যক্তি সাধারণত দু’ধরনের সম্পত্তি রেখে যায়।

এক. ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র। যেমন : পোশাক-আশাক, তৈজসপত্র, অস্ত্রশস্ত্র ও অলঙ্কারাদি ইত্যাদি।

দুই. বিষয় সম্পত্তি যেমন টাকা পয়সা ও ব্যবসায়ের মালামাল, মৃতের দাফন-কাফন, ঋণ পরিশোধ ও অসিয়ত আদায়ের পর যে সম্পদ অবশিষ্ট থাকে তা তৈজসপত্রই হোক আর জমি-জমাই হোক সবই উত্তরাধিকার সম্পত্তিরূপে গণ্য এবং কোনো রকমের ব্যতিক্রম ছাড়া সবই ওয়ারিসদের মধ্যে নিয়মানুসারে অবশ্যই বণ্টনীয়।

খ. মিরাস কেবল নিকটাত্মীয়ের হক। যতক্ষণ পর্যন্ত মৃতের কোন নিকটাত্মীয় জীবিত থাকে ততণ পর্যন্ত আত্মীয় বা অনাত্মীয় কেউ তার সম্পত্তির অধিকারী হয় না।

গ. মিরাস নারী-পুরুষের ছোট বড় নির্বিশেষে সকলের হক।

ঘ. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে ওয়ারিসের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

উত্তরাধিকার লাভের শর্তাবলী :

উত্তরাধিকার লাভের শর্ত তিনটি :

ক. মুরিসের (ওয়ারিসগণ যার উত্তরাধিকার লাভ করে তার) মৃত্যু।

খ. মুরিসের মৃত্যুকালে ওয়ারিসের জীবিত থাকা।

গ. ওয়ারিস কোন্ সূত্রে উত্তরাধিকার পাবে তা জ্ঞাত হওয়া।

ওয়ারিসদের বিবরণ :

ওয়ারিস মূলত তিনপ্রকার : ১. যাবিল ফুরুয ২. আসাবা ৩. যাবিল আরহাম

যাবিল ফুরুয : কুরআন মজীদে যে সমস্ত ওয়ারিসের জন্যে মিরাসের নির্দিষ্ট অংশ উল্লেখ করা হয়েছে তাদের যাবিল ফুরুয বলা হয়। যাবিল ফুরুযের সর্বমোট সংখ্যা হয় ১২ জন। চারজন পুরুষ এবং আটজন মহিলা। আটজন মহিলা হলো : ১. কন্যা ২. পুত্রের কন্যা ৩. স্ত্রী ৪. আপন বোন ৫. বৈমাত্রেয় বোন ৬. বৈপিত্রেয় বোন ৭. মাতা ৮. দাদি ও নানি।

উপরোক্ত ওয়ারিসদের যাবিল ফুরুয বলা হয়। এদের অংশ দেবার পর অবশিষ্ট সম্পত্তির মালিক হবে আসাবা শ্রেণীর ওয়ারিসগণ। যাবিল ফুরুযের অবর্তমানে আসাবাগণ সমুদয় সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়।

যাবিল আরহাম : মৃত ব্যক্তির যদি যাবিল ফুরুয ও আসাবা শ্রেণীর কোন আত্মীয় না থাকে তখন যাবিল আরহাম শ্রেণীর আত্মীয়গণের মধ্যে যথা নিয়মে তার সম্পত্তি বণ্টন করা হবে।

ত্যজ্য সম্পত্তির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়দি :

ত্যজ্য সম্পত্তির সাথে সম্পৃক্ত বিষয় ৩টি :

ক. মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া অর্থ সম্পদে সর্বপ্রথম তার গোসল ও দাফন কাফনের ব্যবস্থা করা।

খ. দাফন কাফনের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

রসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন :

মুমিনের আত্মা তার ঋণের সঙ্গে ঝুলে থাকে, যে পর্যন্ত না তা তার প থেকে পরিশোধ করা হয়। (মুসনাদে ইমাম আহমদ)

গ. দাফন কাফন ও ঋণ পরিশোধের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিছু অবশিষ্ট না থাকলে অসিয়ত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তবে তার এক-তৃতীয়াংশ দ্বারা মৃত ব্যক্তির কৃত অসিয়ত পূরণ করতে হবে। অসিয়ত পূরণ করার আগে তা ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন করা যাবে না। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে :

ওয়ারিসদের মধ্যে মৃতের সম্পত্তি বণ্টন করা হবে সে যা অসিয়ত করে তা পূরণ এবং তার ঋণ পরিশোধের পর।

কন্যা সন্তানদের অবস্থা ও অংশ :

পিতার মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী স্বত্ব লাভ করার ব্যাপারে কন্যা সন্তানের তিন অবস্থা। যথা :

প্রথম অবস্থা : কন্যা যদি একজন হয় এবং পুত্র না থাকে তাহলে কন্যা পিতার সকল সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। ইরশাদ হয়েছে আর কন্যা মাত্র একজন হলে তার জন্যে অর্ধাংশ। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১১)

দ্বিতীয় অবস্থা : কন্যা যদি দুই বা ততোধিক হয় এবং পুত্র সন্তান না থাকে তাহলে কন্যারা পাবে পিতার সমস্ত সম্পত্তির অংশ। উক্ত অংশ সকল কন্যাদের সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। ইরশাদ হয়েছে :

কন্যা দুয়ের অধিক হলে তাদের জন্যে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১১)

মেয়ে সন্তান দুইয়ের অধিক হলে এই আয়াত তাদের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ ধার্য করেছে। কিন্তু দুই তৃতীয়াশ সম্পদে শুধু দুই মেয়ের জন্যে সাব্যস্ত করাটা হাদিস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

তৃতীয় অবস্থা : কন্যার সাথে যদি পুত্র থাকে তাহলে প্রত্যেক পুত্র কন্যার দ্বিগুণ অংশ পাবে। আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেন এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১১)

পৌত্রীর (ছেলের কন্যা) অবস্থা ও অংশ :

পৌত্রী বলতে পুত্রের কন্যা প্রপৌত্রের কন্যা এভাবে যত নিচের হোক অধঃস্তন পুত্রের কন্যাকে বুঝায়। তারা যথাক্রমে একের অবর্তমানে অপরজন পৌত্রী হিসেবে মিরাস লাভ করবে। উত্তরাধিকার স্বত্ব লাভের ৬টি অবস্থায় অংশ তারা মীরাস পাবে। যথা :

প্রথম অবস্থা : কোন ব্যক্তির মৃত্যুকালে তার ঔরসজাত কোন কন্যা সন্তান যদি না থাকে এবং পৌত্রী যদি মাত্র একজন হয়, তাহলে সে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সকল সম্পত্তির অংশ পাবে।

দ্বিতীয় অবস্থা : মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত কন্যাদের অবর্তমানে পৌত্রী যদি দুই বা ততোধিক থাকে, তাহলে তারা পাবে অংশ এবং উক্ত অংশ পৌত্রীগণ নিজেদের মধ্যে সমান সমান ভাবে ভাগ করে নিবে।

তৃতীয় অবস্থা : মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত একজন কন্যা যদি থাকে তাহলে পৌত্রীগণ পাবে এক ষষ্ঠাংশ।

চতুর্থ অবস্থা : মৃত ব্যক্তির যদি দুই বা ততোধিক কন্যা সন্তান থাকে তাহলে পৌত্রী কোন অংশ পাবে না। দুই কন্যা বর্তমানে থাকায় তারাই সর্বোচ্চ অংশ পাবে।

পঞ্চম অবস্থা : মৃত ব্যক্তির দুই বা ততোধিক কন্যা বর্তমান থাকা অবস্থায় যদি পৌত্রীদের সহিত তাদের সহোদর ভাই, চাচাত ভাই অথবা তাদের নিম্ন শ্রেণীর এক বা একাধিক পুরুষ সন্তান অর্থাৎ পৌত্রীদের ভাইপো, ভাইপো পুত্র ইত্যাদি থাকে তাহলে মৃত ব্যক্তির কন্যাদ্বয়ের অংশ দেবার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা পুরুষ নারীর দ্বিগুণ হারে বন্টন করা হবে।

ষষ্ঠ অবস্থা : মৃত ব্যক্তির যদি কোন পুত্র সন্তান জীবিত থাকে তাহলে পৌত্রী কোন অংশ পাবে না।

স্ত্রীর অবস্থা ও অংশ :

স্বামী যদি মৃত্যু বরণ করেন তাহলে স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে স্ত্রীর হক সর্বাবস্থায় সংরতি থাকবে। সে কখনই স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না। স্ত্রীর মীরাস লাভের দুই অবস্থা।
ক. স্বামী তার মৃত্যুকালে স্ত্রীর সঙ্গে তারই গর্ভজাত কিংবা তার অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান (পুত্র, কন্যা, নাতি, নাতনী ও তাদের বংশধর) রেখে গেলে।

খ. স্বামী নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে।

প্রথম অবস্থায় স্ত্রী পরিত্যক্ত সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ এবং দ্বিতীয় অবস্থায় চার ভাগের এক ভাগ লাভ করবে।

উল্লেখ্য মৃত ব্যক্তি যদি একাধিক স্ত্রী রেখে যায় তবে তারা সকলে মিলেই চার ভাগের এক ভাগ বা আট ভাগের এক ভাগ পাবে এবং তা নিজেদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে নেবে।

আপন বোনের অবস্থা ও অংশ :

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার আপন বোনেরও হক রয়েছে। মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে সহোদর বোন পাঁচ অবস্থায় অংশ পেয়ে থাকে।

প্রথম অবস্থা : সহোদর বোন একজন হলে অংশ পাবে।

দ্বিতীয় অবস্থা : সহোদর বোন দুই বা ততোধিক হলে তারা সবাই মিলে পাবে অংশ এবং উক্ত অংশ প্রত্যেক সমান সমান ভাগ করে নিবে।

তৃতীয় অবস্থা : বোনের সাথে ভাই থাকলে বোন আসাবা হয়ে যাবে। এ অবস্থায় বোনের দ্বিগুণ পাবে ভাই।

চতুর্থ অবস্থা : মৃত ব্যক্তির কন্যা বা পৌত্রীগণ বর্তমান থাকলে বোন আসাবা হবে। অর্থাৎ কন্যা বা পৌত্রীগণের নির্ধারিত অংশ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা বোন পাবে।

পঞ্চম অবস্থা : মৃত ব্যক্তির পুত্র বা পৌত্র বা তা নিম্নের কেউ অথবা পিতা জীবিত থাকলে ইসলামী আইনবিদগণের সর্বসম্মতভাবে বোন ওয়ারিস হবে না।

বৈমাত্রেয়া বোনের অবস্থা ও অংশ :

মা দুইজন কিন্তু পিতা একজন হলে অর্থাৎ পিতার অন্য স্ত্রীর গর্ভের কন্যা সন্তানকে বৈমাত্রেয়া বোন বলা হয়। মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে অংশ পাবার ব্যাপার বৈমাত্রেয়া বোনের সাত অবস্থায় অংশ পায়। যথা :

প্রথম অবস্থা : বৈমাত্রেয়া বোন মাত্র একজন হলে পাবে অংশ।

দ্বিতীয় অবস্থা : বৈমাত্রেয়া বোন দুই বা ততোধিক হলে এবং মৃত ব্যক্তির কোনো সহোদর বোন না থাকলে বৈমাত্রেয়া বোনগণ সবাই মিলে অংশ পাবে এবং প্রত্যেকের অংশের পরিমাণ সমান সমান হবে।

তৃতীয় অবস্থা : মৃত ব্যক্তির একজন সহোদর বোন থাকলে এবং সেই সাথে বৈমাত্রেয়া বোন এক বা একাধিক থাকলে, বৈমাত্রেয়া বোনগণ পাবে অংশ।

চতুর্থ অবস্থা : মৃত ব্যক্তির দুই বা ততোধিক সহোদর বোন থাকলে, বৈমাত্রেয়া বোনগণ কোনো অংশ পাবে না। কারণ সহোদর বোন আত্মীয়তার দিক দিয়ে অধিক নিকটবর্তী।

পঞ্চম অবস্থা : দুই বা ততোধিক সহোদর বোনের বর্তমানে বৈমাত্রেয়া বোনের সঙ্গে যদি বৈমাত্রেয় ভাই থাকে, তাহলে সে বোনদের আসাবা করে দিবে। অর্থাৎ সহোদর বোনগণ তাদের অংশ নেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা বৈমাত্রেয়া ভাইবোনগণ পাবে এবং বোনের দ্বিগুণ হিসেবে ভাই পাবে।

ষষ্ঠ অবস্থা : মৃত ব্যক্তির কন্যা বা পৌত্রী বর্তমান থাকলে বৈমাত্রেয়া বোনগণ আসাবা হবে। অর্থাৎ কন্যা বা পৌত্রীগণ তাদের অংশ নেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা বৈমাত্রেয়া বোনগণ পাবে।

সপ্তম অবস্থা : মৃত ব্যক্তির পুত্র, পৌত্র বা তাদের অধস্তন, পিতা এবং দাদা জীবিত থাকলে বৈমাত্রেয়া বোনগণ কোন অংশ পাবে না। এ বিধান শুধুমাত্র বৈমাত্রেয়া বোনের েেত্রই নয় বরং সহোদর বোনদের েেত্রও প্রযোজ্য। এছাড়া সহোদর বোন যখন কন্যা বা পুত্রের কন্যার সাথে আসাবা হয়। তখনো বৈমাত্রেয়া বোনগণ কোনো অংশ পাবে না। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্কের দিক দিয়ে অধিক নিকটবর্তী। মৃত ব্যক্তির বৈমাত্রেয়া বোনগণ ব্যতীত যদি অন্য কোন ওয়ারিস না থাকে তাহলে সমস্ত সম্পত্তি বৈমাত্রেয়া বোনগণের প্রতি রদ হবে। অর্থাৎ বৈমাত্রেয়া বোনগণ সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে।

বৈপিত্রেয়া বোনের অবস্থা ও অংশ :

বৈপিত্রেয়া বোনরা তিন অবস্থায় অংশ পায় : যথা

প্রথম অবস্থা : বৈপিত্রেয়া বোন যদি মাত্র একজন হয় তাহলে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ পাবে।

দ্বিতীয় অবস্থা : বৈপিত্রেয়া বোন দুই বা ততোধিক হলে কিংবা বৈপিত্রেয়া বোনের সাথে বৈপিত্রেয়া ভাই থাকলে সবাই মিলে অংশ পাবে এবং উক্ত অংশ ভাইবোন সকলেই নিজেদের মধ্যে সমান সমানভাবে ভাগ করে নিবে। বৈপিত্রেয়া ভাই বোনের েেত্র নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সকলের অংশই সমান।

তৃতীয় অবস্থা : মৃত ব্যক্তির পুত্র, কন্যা, পৌত্র, পৌত্রী এবং নিম্নের কেউ জীবিত থাকলে কিংবা পিতা বা দাদা বর্তমান থাকলে বৈপিত্রেয়া বোন কোনো অংশ পাবে না।

মায়ের অবস্থা ও তার অংশ :

মা সর্বাবস্থায় তার সন্তানের সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে। মা কখনই বঞ্চিত হয় না। তার মোট তিন অবস্থা হতে পারে।

প্রথম অবস্থা : মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা, পৌত্র-পৌত্রী (যত নীচের দিকে) জীবিত থাকলে মা তার সমুদয় সম্পত্তির অংশ পাবে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : তার যদি সন্তান থাকে তবে তার পিতা মাতা প্রত্যেকে পাবে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক ষষ্ঠাংশ। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১১)

এমনিভাবে মৃত ব্যক্তির যদি একাধিক ভাইবোন থাকে, তা আপন বোন হোক কিংবা বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় সর্বাবস্থায় পাবে মা তার সম্পত্তির এক ষষ্ঠাংশ। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১২)

দ্বিতীয় অবস্থা : মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও পিতা মাতা কিংবা স্বামী ও পিতা মাতা জীবিত থাকলে স্ত্রীর বা স্বামীর অংশ প্রদানের পর যা অবশিষ্ট থাকে মা তার অংশ লাভ করবে।

তৃতীয় অবস্থা : মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা, পৌত্র-পৌত্রী একাধিক ভাই বোন না থাকলে, কিন্তু পিতামাতা জীবিত থাকে তাহলে মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর এবং মৃত ব্যক্তি নারী হলে স্বামীর অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তির অংশ পাবেন মাতা। মৃত ব্যক্তির পিতার স্থলে যদি দাদা জীবিত থাকেন তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রা.) এর মতে মাতা সমস্ত সম্পত্তির অংশ পাবেন। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ (র.) এর মতে এ অবস্থায় মাতা অবশিষ্ট সম্পত্তির অংশ পাবেন।

দাদি-নানির অবস্থা ও অংশ :

পৌত্র-পৌত্রী ও দৌহিত্র-দৌহিত্রীর সম্পত্তিতে দাদি এবং নানীর উত্তরাধিকার রয়েছে। তাদের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাসূল (সা.) এর হাদিস এবং উম্মতের ইজমা দ্বারা।

প্রথম অবস্থা : মৃত ব্যক্তির মা জীবিত থাকলে দাদী ও নানি কোনো অংশ পায় না।

দ্বিতীয় অবস্থা : পিতা জীবিত থাকলে দাদি বঞ্চিত নয় কিন্তু নানীর অংশ ছয় ভাগের এক ভাগ যথারীতি বহাল থাকে।

তৃতীয় অবস্থা : মৃতের পিতা মাতা, দাদা জীবিত না থাকলে দাদি ও নানি সম্পত্তির এক ষষ্ঠাংশ লাভ করবে।

ইসলাম মুসলিম উম্মাহকে অত্যন্ত সুন্দর বিজ্ঞানসম্মত ভারসাম্যপূর্ণ ও ইনসাফভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন উপহার দিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত মানব রচিত কোনো মতবাদ এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ ও ত্রুটিমুক্ত মিরাসি আইন কোনো জাতিকে উপহার দিতে পারেনি। পারিবারিক জীবনে অর্থনৈতিক দায়িত্বভার ও চাহিদার প্রতি ল্য রেখে এ আইনে নারীর অংশ পুরুষ থেকে কম রাখা হয়েছে। এটাই সুবিচারের দাবি। দূর সম্পর্কের যে সকল আত্মীয়-স্বজন সরাসরি মিরাস পায় না যাদের মধ্যে পুত্রের অবর্তমানে নাতি রয়েছে, মুরিস সে সকল আত্মীয়-স্বজনের জন্যে পুরো সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করে দিতে পারেন। এমন কি মিরাশ বণ্টনের সময় যদি কোনো অসহায় আত্মীয় স্বজন ইয়াতিম ও মিসকীন এসে হাজির হয় তাহলে তাদেরও কিছু দান করা হয় এবং সর্বোপরি তাদের সাথে সদাচরণ করা হয়। মহান আল্লাহ আমাদের তাঁরই দেয়া হেদায়েতের উপর আমল করার তওফীক দান করুন। (আমীন)

কোন মন্তব্য নেই