পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

কুরআনের একটি সাম্প্রদায়িক আয়াত, এবং


সেদিন শাহবাগ মোড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমি, সাজিদ, রূপম, মিলু, তারেক, শাহরিয়ার আর মিশকাত।

প্রথমেই বলে রাখি, আমাদের মধ্যে সাজিদ হলো এক্স-এথেইষ্ট।আগে নাস্তিক ছিলো, এখন আস্তিক। রূপম আর শাহরিয়ার এখনো নাস্তিক।মার্কস-ই হলো তাদের ধ্যান-জ্ঞান। মিলু এগনোষ্টিক। স্রষ্টা কি সত্যিই আছে, নাকি আদৌ নাই- সেই ব্যাপারে কোন সমাধানে মিলু এখনো আসতে পারে নি। তারেক, মিশকাত আর আমি, আমরা মোটামুটি কোনদিকে যাইনি এখনো।
সপ্তাহের প্রতি রোববারে আমরা এখানে আড্ডা দিই।আড্ডা না বলে এটাকে ‘পাঠচক্র’ বলাই যুতসই। সপ্তাহান্তে এখানে এসে আমরা পুরো এক সপ্তাহে কে কি পড়েছি, পড়ে কি বুঝেছি, কি বুঝিনি এসব আলোচনা করি। ভারি ইংরেজিতে যেটাকে ‘বুক রিভিউ’ বলা হয় আর কি!
আজকের আলোচক দু’জন। শাহরিয়ার আর সাজিদ। শাহরিয়ার আলোচনা করবে প্লেটো’র ‘রিপাবলিক’ এর উপর, আর সাজিদ আলোচনা করবে আল কোরআনের উপর।
দুজনই তুখোঁড় আলোচক। ‘রিপাবলিক’ নিয়ে শাহরিয়ারের আলোচনা বেশ জম্পেশ ছিলো। রিপাবলিকে প্লেটো নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শিষ্টাচার, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, রাষ্ট্রের গঠন,উপাদান, পরিবার, নারী-পুরুষের মনস্তত্ত্ব, সমাজে নারী-পুরুষের মূল্যায়ন ইত্যাদির উপর যে সবিস্তর আলোচনা করেছিলেন, শাহরিয়ার খুবই চমৎকারভাবে তার সার সংক্ষেপ আমাদের সামনে তুলে ধরলো।মনে হচ্ছিলো- প্লেটোই যেন আমাদের সামনে আঙুল উঁচিয়ে উঁচিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোন জিনিসটার কি ব্যাখ্যা, কি কাজ,কি ধর্ম।
শাহরিয়ারের আলোচনা শেষ হলে সাজিদ তার আলোচনা শুরু করে। সেও আল কোরআন নাজিল হবার কারন, এতে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার, নারী-পুরুষ এবং এতদসংক্রান্ত যে বিষয়গুলো আছে- তার একটি চমৎকার সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরলো।
আলোচনা শেষ করার আগে সাজিদ এই বলে শেষ করলো যে,- ‘আল কোরআন নাজিল হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য।এটি যে শুধু মুসলিমদের জন্য,তা নয়।আমাদের সুশীলীয় পরিভাষায় যেটাকে অসাম্প্রদায়িক বলে আর কি।’
এতটুকু বলে সাজিদ থেমে গেলো।
দু’জনের আলোচনাই বেশ প্রফুল্ল ছিলো।কিন্তু গন্ডগোল পাকালো রূপম।সাজিদ আল কোরআনকে অসাম্প্রদায়িক কিতাব বলেছে- এটা সে মেনে নিতে পারেনি।
বলে নিই, রূপম সাজিদের ক্লাশমেট। তাই দুজনের মধ্যকার সম্পর্কটি আমি-তুমি বা আমি-আপনি নয়, তুই তুকারির সম্পর্ক।
রূপম খুবই অবজ্ঞার সুরে, সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বললো,- ‘কোরান অসাম্প্রদায়িক, এইটাও আমাকে শুনতে হলো, হা হা হা হা।’
সাজিদ বললো,- ‘হ্যাঁ। অবশ্যই।’
এরপর রূপম বললো,- ‘কোরআনের সাম্প্রদায়িক আয়াত মনে হয় তুই এখনো পড়িস নি।তাই জানিস না।’
– ‘আমি না পড়ে থাকলে তুই পড়ে আমাকে শোনা’- সাজিদ বললো।
রূপম ইংরেজিতে সূরা আলে-ইমরানের ১১৮ নং আর আল মায়েদার ৫১ নং আয়াতটি পড়ে শোনালো।সাথে অনুবাদ করেও পড়লো। সে বললো,-
‘O you, who believe! do not take for intimate friends from among others than your own people’
‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহন করো না।’
দেখ! কোরানই তোদের বলছে, আমাদের,মানে অমুসলিমদের বন্ধুরূপে না নিতে।আর তুই বসে বসে এখানে কোরানকে অসাম্প্রদায়িকতার সার্টিফিকেট দিচ্ছিস।হাস্যকর না? এটা অসাম্প্রদায়িকতার নতুন সংজ্ঞা বুঝি? অমুসলিমদের বন্ধু বানাবা না, খবরদার! – হা হা হা।’
আমি একটু চিন্তায় পড়লাম। অবজ্ঞার সুরে বললেও রূপমের কথা একেবারে ফেলে দেবার মতো নয়।
অপেক্ষা করছি সাজিদের উত্তরের জন্য।
সাজিদ একটু ঝেড়ে কেশে নিলো। এরপর বলতে শুরু করলো-
‘দেখ রূপম! কোরআন নাজিল হয়েছে হজরত মুহাম্মদ সাঃ এর উপর।এখন কোরআনের আয়াতগুলোকে আমাদের বুঝতে হবে ঠিক সেভাবে, যেভাবে মুহাম্মদ সাঃ বুঝিয়েছেন। প্লেটো’র রিপাবলিক তুই তোর মন মতো ব্যাখ্যা করতে পারিস না বা বুঝে নিতে পারিস না।তোকে ঠিক সেভাবেই বুঝতে হবে, যেভাবে প্লেটো বুঝিয়েছে। এইটুকু তো কমন সেন্সের ব্যাপার, তাই না?’
রূপম বললো,- ‘হুম।’
– ‘এখন কোরআনকে আমরাও সেভাবেই বুঝবো, যেভাবে মুহাম্মদ সাঃ আল্লাহ তা’আলার থেকে বুঝেছেন। প্রথমে তুই যে আয়াতের কথা বললি, সেই আয়াতে আসি।অই আয়াতে আল্লাহ আমাদের বলেছেন- অমুসলিমদের বন্ধু হিসেবে গ্রহন না করতে।
এখানে আল্লাহ তায়ালা ‘বন্ধু’ শব্দটার জন্য যে এ্যারাবিক ওয়ার্ডটি ব্যবহার করেছেন, তা হলো – আউলিয়া।রাইট?’
রূপম বললো,- ‘হতে পারে।আমি আরবি বুঝি না।’
রূপমের আরবি বুঝার কথাও না। সে হিন্দু ফ্যামিলি থেকে উঠে আসা। ব্লগে মুক্তমনা তথা নাস্তিকদের লেখা-যোখা পড়ে কোরআন নিয়ে যা একটু জানে। সাজিদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো- ‘আরিফ, মোবাইল খুলে কোরআনের এপ্স থেকে আয়াতটি তিলাওয়াত করে শোনা।’
আমি শুনালাম। রূপম বিশ্বাস করলো যে, সেই আয়াতে ‘বন্ধু’ শব্দের জন্য আরবি ‘আউলিয়া’ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে।
সাজিদ বললো,- ‘শুনলি?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘এখন, আমরা এটাকে ব্যাখ্যা করবো। এ্যারাবিকে ‘আউলিয়া’ শব্দটির জন্য দুটি অর্থ করা যায়। এক- বন্ধু, দুই- অভিভাবক। আমরা এখানে সেই অর্থটা নেবো, যেটা রাসূল সাঃ থেকে প্রমান হয়ে আসবে।
তার আগে দুটি বিষয় ক্লিয়ার করি। ‘আউলিয়া’ শব্দের জন্য ‘বন্ধু’ আর ‘অভিভাবক’ দুই অর্থ করা গেলেও, এই দুই শব্দের মধ্যে একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে।বন্ধু মানে বন্ধু। এই যেমন, তুই আমার বন্ধু।আমি তোর সাথে এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছি, খাচ্ছি।অনেক রাত একসাথে ঘুমিয়েছি।ক্লাশ করি একসাথে ইত্যাদি। আবার, আমার বাবা-মাও আমার বন্ধু।কিন্তু, তুই আর আমার বাবা-মা কি একই রকম বন্ধু? নাহ। পার্থক্য আছে।তারা আমার অভিভাবক, বন্ধু। তোর সাথে বন্ধুত্বের যে ডেফিনিশন, তাদের সাথে সামথিং মোর দ্যান দ্যাট,রাইট?’
রূপম মাথা নাড়লো।
সাজিদ আবার বলতে লাগলো-
‘আমার বাবা-মা আমার যাবতীয় সিক্রেট জানে।আমার দূর্বলতা কোথায় জানে।তুই জানিস?’
– ‘নাহ।’
– ‘এবার মুহাম্মদ সাঃ এর জীবনীতে যা। তুই সেখানে দেখবি- তিনি অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করেছেন। অমুসলিমদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। তাদের সাথে খেয়েছেন, কাজ করেছেন, কতো কি।মানে, এখন আমি যা যা তোর সাথে করি,সেরকম। তাই না?’
আমাদের সবাই মাথা নাড়লাম। রূপমও মাথা নাড়লো।
– ‘তাহলে দেখা যাচ্ছে- অই আয়াতে ‘আউলিয়া’ অর্থে আমরা ‘বন্ধু’ শব্দটা নিতে পারবো না।কারন, আল্লাহ তায়ালা যদি ‘আউলিয়া’ শব্দটি দ্বারা ‘বন্ধু’ই বুঝাতেন, তাহলে রাসূল সাঃকখনোই অমুসলিমদের সাথে উঠা-বসা করতেন না।তাহলে প্রশ্ন, এখানে, ‘আউলিয়া’ শব্দের কোন অর্থ বুঝানো হয়েছে? হ্যাঁ, এখানে- ‘আউলিয়া’ শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়েছে ‘অভিভাবক’। আল্লাহ আমাদের বলেছেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা অমুসলিমদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহন করো না।’
একজন অভিভাবক হলো সেই, যে আমাদের যাবতীয় গোপন খবর জানবে, আমাদের শক্তি,আমাদের কৌশল, আমাদের দূর্বলতা জানবে।এখন আল্লাহ বলেছেন, অমুসলিমদের অভিভাবক হিসেবে নিয়ো না। মানে, অমুসলিমদের কাছে তোমরা তোমাদের সিক্রেট বলে দিয়ো না।কারন, এতে কোন একসময় হিতে বীপরিত হতে পারে।বিপদ হতে পারে।
– ‘কি রকম বিপদ’- তারেক জিজ্ঞেস করলো।
সাজিদ বললো,- ‘যেমন, ইসলামের প্রথম জিহাদ কোনটি? বদর যুদ্ধ।তাই না?’
– ‘হ্যাঁ।’ – আমি বললাম।
– ‘সেই যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা কতো ছিলো? মাত্র ৩১৩ জন,আর প্রতিপক্ষের সৈন্য সংখ্যা ছিলো প্রায় এক হাজার না কতো। তাই তো?’
– ‘হু’
– ‘ধর, সেই যুদ্ধের আগে মুসলিমরা যদি অমুসলিমদের কাছে গিয়ে বলতো- জানো, আমরা না মাত্র ৩১৩ জন নিয়ে ওদের সাথে লড়বো।
এইটা কি ঠিক হতো?? নাহ, হতো না। কেউ না কেউ এই খবর প্রতিপক্ষের কানে পৌঁছিয়ে দিতো।তখন কি হতো? প্রতিপক্ষের মনে সাহস বেড়ে যেতো। তারা যুদ্ধে শারীরিকভাবে জেতার আগেই মনস্তাত্ত্বিকভাবে জিতে যেতো। এটা কি শুভ হতো? আজকের দিনে কোন দেশ কি এই ফর্মূলা এপ্লাই করবে? আমেরিকা কি তার সামরিক শক্তির কথা চীন বা রাশিয়ার কাছে শেয়ার করে? করে না। ঠিক একইভাবে আল্লাহও বলছেন- ওদের তোমরা অভিভাবক হিসেবে নিয়ো না।
এটা একটা সেইফটি। এখানে বন্ধু বানাতে নিষেধ করেনি, নিষেধ করেছে অভিভাবক না বানাতে।’
আমরা চুপ করে আছি। রূপমও কিছু বলছে না।
এবার সাজিদ বললো,- ‘রূপম, ফাষ্ট ইয়ার থেকেই আমি তোর বন্ধু। আমাদের বন্ধুত্বের আজকে চার বছর চলছে।এই চার বছরের বন্ধুত্বে তুই কোনদিন আমাকে তোর ব্যাংক এ্যাকাউণ্ট নম্বর দিয়েছিস? হা হা হা। দিস নি। তোর ক্রেডিট কার্ডের গোপন নাম্বার কোনদিন আমায় বলেছিস? বলিস নি। এমনকি কোনদিন তোর ফেইসবুক পাসওয়ার্ডটিও তো দিলি না ব্যাটা। হা হা হা। কেন দিলি না? কারন, আমি তোর বন্ধু, তোর অভিভাবক নই।
এখন কি আমি তোকে বলতে পারি- রূপম, তুই ব্যাটা আস্ত একটা সাম্প্রদায়িক ফ্রেন্ড, বলতে পারি? হা হা হা।’
সাজিদ রূপমের মুখের দিকে চেয়ে আছে কোন একটি উত্তরের আশায়। রূপম কিছু না বলে পিক করে হেসে দিলো। মনে হচ্ছে সাজিদের কথায় সে খুব মজা পেয়েছে।

=====================================
লেখকঃ আরিফ আজাদ



রিলেটেড সার্চ: সাম্প্রদায়িক কি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িক, সাম্প্রদায়িক মানে কি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনুচ্ছেদ।

কোন মন্তব্য নেই