পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

'আমরাই অসুস্থ জাতি' (শেষ পর্ব)


আল্লাহ বলছেন,
وَ لَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا
'তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে গীবত না করে'।

এবার চলুন দেখি গীবতের সংজ্ঞা কি? মুসলিম শরিফের হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,গীবত কাকে বলে, তোমরা জান কি? সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ই ভালো জানেন। তিনি বললেন, তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গীবত। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যে দোষের কথা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে তবে তুমি অবশ্যই তার গীবত করলে। আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে সেটা হচ্ছে "নামিমাহ অর্থা মিথ্যে অপবাদ দেওয়া। যা গীবতের থেকেও জঘন্যতম পাপ।

আমরা যদি কারী অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলি যা শুনলে সে কষ্ট পাবে। কথাটা সত্যি হলেও আমাদের বলা উচিত হবে না। কারন আল্লাহ তায়ালা নিষিদ্ধ করেছেন। এর উদাহরণ স্বরুপ একটা দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, পবিত্র কুরআনের বিভৎস রকমের দৃশ্য গুলোর মধ্যে এটি একটি।

আল্লাহ তায়ালা বলছেন, اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে বা ভালবাসবে? ইউহিব্বু বলেছেন মানে ভালবাসবে? কি ভালবাসতে?

اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡہِ مَیۡتًا
তোমাদের ভাইয়ের গোসত খেতে! যে কি না মৃত? আচ্ছা এই কথা যারা মনযোগ দিয়ে পড়েছেন, নিশ্চয়ই মনের ভেতর একটা ধাক্কা লেগেছে? প্রতিটি সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষ এই দৃশ্যটা কল্পনার করার পরে গাঁ ঘিনঘিন করে উঠেছে। আল্লাহ বলেছেন,তোমাদের মধ্যে কেউ কি চাইবে ভাইয়ের গোসত খেতে? শুধু ভাইয়ের নয়, মৃত ভাইয়ের শরীর থেকে গোসত খেতে! শুধু খেতে চাওয়া নয়, اَیُحِبُّ বলেছেন ভালবেসে স্বাদ আস্বাদন করে খেতে!!

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এই দৃশ্য দেখানোর পরে আমাদের মনের অবস্থা কি হবে সেটা তিনি জানেন। তাই তিনিই বলছেন فَکَرِہۡتُمُوۡہُ তোমরা সেটা ঘৃণা করবে! এই ভাবনাটাই আমরা ঘৃণা করি, খাওয়া তো দুরের কথা তাই নয় কি?

কেন আল্লাহ এই দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরলেন?কেন আমাদের কল্পনায় দৃশ্যটা নিয়ে আসলেন? কারন আমরা যখন কারো গীবত করি,তখন কি আমরা মজা করেই করি। উপভোগ করি। রসালো গল্পগুলো। গীবত সত্য হলেও এই কাজটা আমার জন্য এই বিভৎস রকম দৃশ্যের মতই জঘন্য। এই দৃশ্য কল্পনা করলেই আমাদের ভেতরে ঘৃণা আসে কিন্তু আমরা যখন গীবত করি,তখন গীবতকারীর প্রতি কিংবা নিজেদের প্রতি এমন ঘৃণা আসে না। কুরআনের ভয়ংকর দৃশ্যগুলোর একটি আমাদের কল্পনায় এনে দিয়ে শিক্ষা দিলেন যে,আমরা দ্বীনি মজলিস, মসজিদ, অফিস, চেম্বার বা বাসায় বসে গীবতের পাপটি অবলিলায় করে আসলে এটি জঘন্যতম পাপ। আপনি আমি নিজে সচেতন হওয়াটাই যথেষ্ট নয়।

আপনার সামনে কেউ যদি আপনার মৃত ভাইয়ের শরীর থেকে গোসত খেতে থাকে আপনি তখন কি করবেন? সেখানে চুপচাপ বসে থাকবেন? আপনি মনে হয় এটা বলবেন, ওরা খাচ্ছে খাক,আমি তো খাচ্ছি না,বসে বসে একটু ফেসবুক চালাই,দ্বীনি কোন আর্টিকেল পড়ি? কখনোই না, আপনি যদি তাদের থামাতে না পারেন অন্তত সেখানে থেকে উঠে চলে যাবেন!

হ্যাঁ গীবতের মজলিসেও আপনার এই ভূমিকা থাকবে। আপনি পারলে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে সবাইকে গীবত করা থেকে এই পাপ থেকে সবাইকে বাঁচাবেন। আর যদি মুখ ফুটে বলা আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হয় তাহলে কোন অজুহাত দেখিয়ে সেখান থেকে উঠে অন্য কোথাও চলে যাবেন।এই ঘৃণ্য কাজের নিরাপদে থাকবেন না।

এরপরে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, وَ اتَّقُوا اللّٰہَ আল্লাহকে ভয় করো?? এই কথা বলার কারণ হল আল্লাহকে ভয় করা ছাড়া কেউ এই পাপ থেকে বাঁচতে পারে না। একমাত্র আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহর ভয় মানুষকে এই গীবতের পাপ থেকে বাঁচাতে পারে।

সর্বশেষ বলেছেন, اِنَّ اللّٰہَ تَوَّابٌ رَّحِیۡمٌ নিঃসন্দেহে আল্লাহ তওবা কবুল করেন এবং তিনি অত্যন্ত করুণাময়। আল্লাহ তাআলা এই কথা দিয়ে কেন শেষ করছেন। কারণ বাস্তবতা হচ্ছে আমরা জীবনের শুরু থেকে এই পর্যন্ত কেউ নির্দোষ নই, আমারও এই ভুল হয়েছে, আপনার ওই ভুল হয়েছে এবং বহুবার হয়েছে। বহু মানুষকে নিয়ে হয়েছে। এ কথা দিয়ে শেষ করার উদ্দেশ্য হল আমরা যখন আল্লাহর দেওয়া উদাহরণ নিয়ে চিন্তা করে গীবতের যে অপরাধের কথা উপলব্ধি করি। যখন আমরা আমাদের জীবনে কতবার গীবত করেছিস এই কথা ভাবি ভেবে ভেবে আমাদের ভেতরে অনুশোচনা জাগে, চোখে পানি চলে আসে। তখন যেন কেউ আমরা হতাশ হয়ে না যাই, হায়! আমি তো অনেক মানুষের নামে গীবত করে ফেলেছি এখন আমার কি হবে?

কারন,একবার রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পাশে উপবিষ্ট সাহাবায়ে কিরাম'কে বললেন, 'তোমরা কি জানো, গরীব কে?' সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বললেন, 'আমাদের মধ্যে তো গরীব তাদেরকে বলা হয়,যাদের কাছে ধন-সম্পদ,টাকা-পয়সা না থাকে'। তখন রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'প্রকৃত পক্ষে আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে গরীব সে,যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত, সবকিছু নিয়ে উঠবে, কিন্তু তার এ কর্মগুলো থাকবে যে, সে দুনিয়াতে কারো সাথে মন্দ আচরন করেছে ,কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে,কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে, কাউকে খুন করেছে ইত্যাদি, তাই এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তার কিছু নেকী একে দিবে, কিছু নেকী ওকে দিবে। এভাবে দিতে দিতে বান্দার হক আদায়ের পূর্বে যদি তার নেকী শেষ হয়ে যায়, তাহলে এই হকদারদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে'। (মুসলিম)

সবকিছু জেনে একজন মুমিনের হৃদয় ক্ষত বিক্ষত হয়। তখন যেন কেউ আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে, অত্যান্ত মমতার সাথে আশ্বাস দেয়। যে চিন্তা করো না তোমার রব তো নিষ্ঠুর নয়। তিনি অত্যন্ত দয়ালু অকল্পনীয় রকম ক্ষমাশীল। অতএব এই কাজটি থেকে ফিরে এসো এবং তারই কথা ভেবে ভেবে এখন থেকে তওবা করো ক্ষমা চাও তিনি ক্ষমা করবেন। ইনশাআল্লাহ।
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂
লেখাঃ ডা. সাঈদ (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

কোন মন্তব্য নেই