মধ্যবিত্ত স্বামীর উচ্চবিত্ত স্ত্রী


আমাদের অনেক বোনদের স্বামীর ব্যাপারে একটা অভিযোগ থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে, বড়লোক পরিবার থেকে মধ্যবিত্ত স্বামীর সংসারে এলে এই অভিযোগ বেশি শুনা যায়। বড়লোক পরিবারের হওয়ায় তারা অঢেল ধন-সম্পদের মাঝে বড় হয়, যখন যা চায় তা-ই হাতের নাগালে পেয়ে যায়, অভাব-অনটন কি জিনিস তা বুঝতে পারে না কখনোই। কিন্তু, বিয়ের পরে মধ্যবিত্ত স্বামীর সংসারে পা দেওয়ার পরে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে, ভিন্ন এক দুনিয়ায় প্রবেশ করেন। এখানে যখন যা মন চায়, তা পাওয়া যায় না সাধারণত। অঢেল ধন-সম্পদের ছড়াছড়ি থাকেনা। আর, অভাব-অনটন ওভাবে না থাকলেও, টানাপোড়ন জিনিসটা ঠিকই থাকে। নুন আনতে পানতা হয়তো ফুরোয় না, প্রতি মাসে শপিং, জামা কেনার আহ্লাদটা মেটানো তখন কঠিন হয়ে পড়ে।

এমন অবস্থার মুখোমুখি হলে, আমাদের বোনেরা স্বামীদের বলে থাকেন, 'তোমার সংসারে এসে কি পেয়েছি আমি বলতে পারো? জানো আমার বাপের বাড়িতে আমি কেমন ছিলাম?'

অভিযোগটা অবান্তর না৷ বাবার বাড়িতে যে মেয়েটা রাজকন্যার হালতে বড় হয়েছে, সেই মেয়েটার জন্যে স্বামীর সংসারে এসে টানাপোড়নের ঘানি টেনে নিয়ে যাওয়াটা দুঃসাধ্যই বটে। কিন্তু, তাই বলে কি স্বামীকে কথা শোনানো উচিত? বাপের বাড়ির তুলনা টেনে কথা বলা উচিত?

আমরা যদি নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দিকে তাকাই, আমরা দেখি, আমাদের উম্মুল মুমীনীনদের অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত বনেদি, অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং ধনী পরিবারের। কিন্তু, তারা যখন নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংসারে এলেন, অভাবের ঘানিটাকেই তারা সকলে বরণ করে নিয়েছিলেন। একবেলার খাবার থাকলে, পরের বেলার খাবার নবিজীর ঘরে মজুদ থাকতো না। দুই তিনটা খেঁজুর খেয়ে তারা দিনানিপাত করতেন৷ খেঁজুর পাতার ছাঁটাইয়ে ঘুমোতে হতো তাদের। কিন্তু, তারা কখনোই নবিজীকে বলেন নি, 'বাপের বাড়িতে আমি এরকম এরকম ছিলাম। এখানে এসে পড়েছি দুনিয়ার কষ্টে'।

একটা হাদিস থেকে জানা যায়, একদিন ভোরবেলা, ফজরের সালাত পড়ে ঘরে এসে নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আ'য়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, 'খাওয়ার কিছু আছে?'
আ'য়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'না, আজ খাওয়ার মতোন কিছুই নেই'।

খাওয়ার মতোন ঘরে কিছু নেই শুনে নবিজী বললেন, 'কিছুই নেই? আচ্ছা থাক। আমি তাহলে রোজা রেখে দিলাম'।

চিন্তা করুন কি অভাবের সংসার ছিলো নবিজীর! সকালে এসে খাওয়ার মতো কিছু না থাকায় রোজা রেখে দিয়েছেন। আর, আ'য়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কে ছিলেন? আবু বাকার রাদিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা। মক্কার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ীর আদরের মেয়ে। সেই তিনিই বলছেন, 'আজ ঘরে খাওয়ার মতোন কিছু নেই'।

অভিযোগ অনুযোগ নয়। সরল স্বীকারোক্তি।

স্বামীর সংসারে আপনার জন্য যা নির্ধারণ হয়েছে, তা-ই আপনার রিযক। বাবার সংসারে যা ছিলো, তাও রিযক। দুটোই নির্ধারণ করেছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালা। বাবার সংসারে যে রিযক পেয়েছেন, তাতে সন্তুষ্ট, স্বামীর সংসারের রিযকের বেলায় যখন অসন্তোষ প্রকাশ করেন, বোন আমার, তা প্রকারান্তরে তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ। উম্মুল মুমীনীনদের দিকে তাকান। কিরকম মাটির জীবন তারা বেছে নিয়েছিলেন আয়েশের জীবন থেকে এসে।

স্বামী যদি চেষ্টা না করে, আপনার হক আদায় না করে, অন্য খাতে খরচ করে, অন্য জায়গায় বিলাসিতা করে, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু, স্বামী যদি তার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে যায় আপনার হক আদায় করতে, সেই চেষ্টায় যেটুক হয়, সেটুকুতে তৃপ্ত হওয়াই একজন সত্যিকার স্ত্রীর গুণাবলী। স্বামীর সেই চেষ্টার অপারগতাকে খোঁচা কিংবা খোঁটা দিলে নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য, বিভেদ আর দূরত্ব তৈরি হওয়া ছাড়া উত্তম কিছুই হবেনা। আর, মুমীনদের মাঝে বিভেদ তৈরি করতে পারলে শয়তান জিতে যায়।

Post a Comment

Previous Post Next Post