পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

নারী-পুরুষের ফ্রি মিক্সিং

আমার খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড, তবে আমার ডিপার্টমেন্টের নয়। ওর কয়েকটা ছেলে বন্ধু ছিল। ছেলেগুলো অবশ্য ভালোই, ফটকা ধরনের না। তারপরও আমার ব্যাপারটা পছন্দ হতো না। যে যতই বলুক না কেন, আমার কেন যেন বিশ্বাস হতে চাইত না যে ছেলে-মেয়ে শুধুই ফ্রেন্ড হতে পারে। অন্য কোনো আবেগ একটুও কাজ করে না। যাইহোক, অনেকদিন ওকে মানা করেছিলাম। কিন্তু ও শোনেনি। ও আমাকে উলটো বুঝাত যে, মেয়েরা অনেক হিংসা করে, হেল্প করতে চায় না, নোট দিতে চায় না। কিন্তু ছেলেরা এমন না। ওরা অনেক হেল্পফুল। নোট না থাকলেও অন্যের কাছ থেকে জোগার করে দেয়। আমি বলতাম, ‘তোমার হয়তো ওদের প্রতি অন্যরকম কোনো ফিলিংস নেই। কিন্তু ওদের তো থাকতে পারে।’ কিন্তু ও আমার কথা হেসেই উরিয়ে দিয়েছে, বলেছে: ‘অসম্ভব! ওরা জানে যে আমি একজনকে পছন্দ করি।’


ওর কথা শুনে মনে হয়েছিল, ও মনে হয় ঠিকই বলছে। আমার মনই ছোট; খালি আজেবাজে কথা চিন্তা করি। আমার ফ্রেন্ডটা হিজাব পড়ত তবে ফেইস খোলা থাকত। একদিন দেখি সে মুখ ঢাকা শুরু করেছে। এমনকি ক্লাসেও নাকি সে মুখ ঢাকে। খুবই বিস্মিত হলাম, খুশিও হলাম। পড়ে অবশ্য এর শানে নযুল জানতে পেরেছিলাম। তার এক ধার্মিক ফ্রেন্ড তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, রিলেশন আছে জানার পরও! আমি অবশ্য সেই ছেলেটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করি। কারণ সে ছাত্র অবস্থায় বিয়ে করতে চেয়েছে, তার নিয়ত খারাপ হলে সে কখনোই এমনটি করত না। কিন্তু আমার ওই ফ্রেন্ডের অন্য একটা পছন্দ থাকায় সে এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল।

আসলে এতে আমি ছেলেটার কোনো দোষ দেখি না। ছেলে-মেয়ে একসাথে থাকলে, পড়াশুনা করলে বা কর্মক্ষেত্রে কাজ করলে সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক আর না হওয়াটা অস্বাভাবিক। আমাদের দেশের সিস্টেমটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, একটা ছাত্র বা ছাত্রী মেধাবী হলে কলেজ লেভেল পর্যন্ত আলাদা থাকা সম্ভব হলেও ভার্সিটি লেভেলে গিয়ে তাদেরকে একসাথে হতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য সমস্যাটা ভার্সিটিতে নয় বরং অধিকাংশের ক্ষেত্রে এর আগেই শুরু হয়—কোচিং বা স্যারের বাসায় ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়তে গিয়ে। বিষয়টা সত্যি দুঃখজনক।

এখনকার সময়ের অনেক ব্যায়বহুল ইংলিশ মিডিয়াম ও কিছু বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়াশুনা করে। পরিবার থেকেও এরা নৈতিকতা সম্পর্কে তেমন কোনো শিক্ষা পায় না। আমি বলছি না সবাই, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ছেলে-মেয়ে ভালো থাকে না। বয়ঃসন্ধিকালের এই সংকটময় মুহূর্তে ফ্রি মিক্সিং যে কত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তা চিন্তা করতেও ভয় হয়। ক্লাস এইটে পড়া আমার এক কাজিনের কাছে মাঝে মাঝে শুনতে হয়, তার অমুক ক্লাসমেটের এত নাম্বার বয়ফ্রেন্ড চলছে, অমুক অমুক ছেলেদের সাথে একসাথে পার্টিতে নেচেছে...আরও কত কী!

একটা ছেলে বা মেয়ে মাস্টার্স পাস করার আগে তাদেরকে বাচ্চা মনে করা হয়। বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তাই করে না। আর ওদিকে ফ্রি মিক্সিংকে ফ্যামিলি থেকে খুব পজিটিভ বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অথচ সন্তানদের রুচির বিকৃতি ও মানসিক অবক্ষয়ের দিকে বাবা-মা কোনো নজরই দেয় না। আর ওদিকে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এদের অনেকেই ড্রাগের দিকেও ঝুঁকে পড়ছে।

আর সমস্যাটা যে কেবল অবিবাহিতদের ক্ষেত্রেই হয়, তা কিন্তু নয়। অনেক বিবাহিতরাও বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এধরনের সমস্যায় পড়ে। নারী বা পুরুষ কলিগের সাথে একত্রে কাজ করতে গিয়ে অন্য ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন আগে একটা আর্টিকেলে এই কমন সমস্যাটাকে একটা ঘটনার মাধ্যমে তুলে ধরে মনোবিশেষজ্ঞের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, আজকাল অনেক বিবাহিত পুরুষদেরই কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন নারী কলিগদের সাথে কাজ করতে হয়। দেখা যায় ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ভালোলাগা শুরু হতে থাকে এবং সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। প্রথমে শুধু চ্যাট, এরপর স্কাইপে কথাবার্তা এবং সবশেষে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা। আর ওদিকে স্ত্রী বেচারি স্বামীর পথপানে চেয়ে না খেয়ে বসে থাকে। স্বামীরও স্ত্রীর জন্য খারাপ লাগে, তবে তার কেবলই মনে হয় তার স্ত্রী অনেক ব্যাকডেটেড, তার সাথে স্ত্রীর মিলে না। আর অন্যদিকে তার কলিগ কত স্মার্ট, কত আধুনিক, তার জন্য সেই আপ্রোপ্রিয়েট। আর এভাবেই পরকীয়া প্রেম চলতে থাকে। কেউ কেউ হয়তো স্ত্রীকে তালাক দিয়ে কলিগকে বিয়ে করে আর কেউ কেউ এভাবেই কাঁটিয়ে দেয় বাকি জীবন। পরিণতিতে পরিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শুরু হয় পারিবারিক অশান্তি। আমি বলছি না, সবার ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটবে। তবে এই চিত্রটা সত্যি খুব কমন হয়ে উঠছে। আপনারা একটু খেয়াল করলেই লক্ষ্য করবেন যে গত বিশ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে ডিভোর্সের হার কত আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এর অন্যতম একটি কারণ শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।

ইসলামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলাম জানে যে নারী-পুরুষ অবাধ মেলামেশার পরিণতি কোথায় গিয়ে গড়াতে পারে, তাই গোড়াতেই একে দমন করেছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে নারী-পুরুষ উভয়ের দৃষ্টি সংযত রাখতে বলেছেন। কুরআনে এসেছে, ‘মুমিনদেরকে বলুন , তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে । এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে । নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন । ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, "তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে।" [আন নূর, আয়াত: ৩০-৩১]

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোন ফিতনা রেখে যাইনি।" [বুখারী ও মুসলিম]

সত্যি বলতে নারী যেমন পুরুষদের জন্য ফিতনা, তেমনি পুরুষেরাও নারীদের জন্য ফিতনা। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যিয়াহ বলেছেন, 'নারী পুরুষের মেলামেশা হচ্ছে দাহ্য কাঠের সাথে আগুনের সম্পর্কের মত।' [আল-ইসতিক্বামাহ, ১/৩৬১]

শুধু ইসলামেই নয় অনেক বিশিষ্ট জনও একথার স্বীকার করেছেন যে নারী-পুরুষের মধ্যে ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ সম্ভব নয়। আইরিশ কবি Oscar Wilde বলেছেন, 'নারী এবং পুরুষের মাঝে কেবলই বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকা অসম্ভব। যা থাকতে পারে তা হল আকাংখা, দুর্বলতা, ঘৃণা কিংবা ভালবাসা; কোনভাবেই বন্ধুত্ব না।'

নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক মেলামেশা, ভালো জানা, ভালো লাগা, ভালোবাসা...এরূপ বিভিন্ন মাত্রার সম্পর্ক যে আরও কতদূর যেতে পারে তা আমাদের ভালোভাবেই জানা হয়ে গেছে। আর অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের সাথে তাল রাখতে গিয়ে আমাদের আর কত দূর যেতে হবে তা চিন্তা করতেও দুঃখ লাগে। সত্যি বলতে, এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য অন্যতম যে পদক্ষেপটি নেওয়া যেতে পারে তা হলো নারী-পুরুষ কম্বাইন্ড এডুকেশন ও ওয়ার্কিং সিস্টেমকে বন্ধ করা। কথাটা হয়তো আপনাদের কাছে খুবই সেকেলে এবং অবাস্তব সম্মত মনে হবে। তবে আমি সত্যি বলছি, যারা কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাঙ্গনে আবেগ তাড়িত সম্পর্কে জড়ায় অথবা যারা যুদ্ধ করে এর থেকে মুক্ত থাকে, তারা উভয়ই একধরনের টর্চারের মধ্য দিয়ে যায়, যা তাদের কর্মদক্ষতা, প্রতিভার বিকাশে অনেক সময়ই একটা বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কর্মক্ষেত্রেও নারী-পুরুষের সেপারেশনটা এমন হওয়া উচিত যেন কাউকে ব্যক্তিগতভাবে জানা, চেনা বা ভালোলাগার কোনো সুযোগ তৈরি না হয়। আপনার যদি ইসলামি বিধান সম্পর্কে ধারণা থাকে তবে আপনি অবশ্যই আমার সাথে একমত হবেন। আমি এমন অনেক ভাইকে চিনি যারা শুধুমাত্র ফ্রি মিক্সিং থেকে বাঁচার জন্য লাখ টাকার চাকরি ছেড়ে ছাপোষা জীবন যাপন করছে। আমাদের উচিত আমাদের নিজেদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ফিতনা মুক্ত এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা যেখানে তাদের পরিপূর্ণ মেধার বিকাশ ঘটা সম্ভব।

লেখিকাঃ সানজিদা শারমিন


1 টি মন্তব্য: