পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ইসলামই আমার একমাত্র উপায়

তখন (৫/৬ বছর বয়সে) মাত্র বুঝতে শুরু করেছি। অর্থাৎ স্মরণ শক্তি স্থির হতে শুরু করলো মাত্র । কাকার সাথে আমি আর আমার (৩/৪ বছর বয়সের) ছোট বোন প্রায়ই শুক্রবারে মসজিদে যাওয়ার আবদার করতাম। কাকা মাঝেমাঝে আমাকে নিয়ে যেতেন, আবার কখনো দু'জনকেই নিয়ে যেতেন।

আবার পরিবারের বড়দের (দাদা, চাচাদের) লুঙ্গি পড়ে মসজিদে যাওয়া দেখে আমিও লুঙ্গির জন্য আবদার করলাম। যখন আমার জন্য লুঙ্গি আনলো তখন কেবল তা পড়েই নামাজ পড়তাম।

সকাল বেলায় মক্তবে যাওয়া ছিলো বাধ্যতামূলক। তাই ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ ছিলো না। এছাড়া মক্তবের হুজুর দাদাকে খুব ভয় পাইতাম। তাই কান ধরে উঠা-বসা করার ভয়ে  প্রায় সময়ই মক্তবে যেতে যেতে (হাটতে হাটতে) ফজর নামাজ আদায় করতাম।

উপরের সবকটিই ঘটনাই আমার ছোটবেলায় ঘটেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কিছু ফিতরাত থেকে, কিছু পরিবেশ থেকে, আর কিছু ওস্তাদের ভয়ে ঘটেছে। তবে এসব ঘটনার কোনটিই আমি ইসলামকে ভালোবেসে করেনি এবং তখন তা প্রয়োজনও পড়েনি। আর তখন ইসলামের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা সৃষ্টি না হওয়াটা স্বাভাবিক হওয়ার কারণেই ঐ বয়সে আল্লাহ্ আমার উপর ইসলামের বিধান ফরয করেননি।

কিন্তু পরবর্তীতে যখন বিভিন্ন ইসলামিক বিধান আমার উপর ফরয, ওয়াজিব শুরু হতে থাকলো তখন কিন্তু ইসলামের প্রতি ভালোবাসার বেশ প্রয়োজন পড়লো। কিন্তু সেরকম কোন ভালোবাসা না থাকায় মধ্যবর্তী অনেকটা সময় চলে গেল হেয়ালিপনায়। হয়ে গেল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের (সা:) প্রতি নানারকম অবাধ্যতা। কিন্তু আমার প্রভুর বিশেষ দয়া ও পরম ক্ষমাশীলতার ঘোষণায় এখন ইসলামের প্রতি কিছুটা হেলে পড়া অনুধাবন করছি। তবে এখন আর সেই বাচ্চাকালের মতো ইসলাম শেখা নয়। যখন আমার বাবা-চাচাই ছিলো আদর্শ, যখন হুজুরের শাস্তি থেকে বাঁচাই ছিলো সফলতা। এখন আমার প্রভু আমাকে কিছুটা জ্ঞান দিয়েছেন, কিছুটা সাহস দিয়েছেন। তাই বাবা-চাচার দুই-এক ওয়াক্ত নামাজ আর সপ্তাহে একবার মসজিদে যাওয়া আমার পছন্দ নয়, হুজুরকে খুশি করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহর দেওয়া বিধান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতে হয় এই বুঝটা এখন গড়ে উঠেছে (আলহামদুলিল্লাহ)।

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় আর মুখভর্তি দাড়ি দেখেই সমাজের অনেকে ধরে নিয়েছে ইসলামিক বিষয়ে খুব সিরিয়াস হয়ে গেছি, ইসলামকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি। যদিও এগুলো প্রত্যেক মুসলিমের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু শয়তানের দীর্ঘ পরিশ্রমে মুসলিম হতে এখন নিজেকে মুসলিম দাবি করাই যথেষ্ট হয়ে গেছে। অথচ ইসলাম যে শুধু দাবি করার বিষয় নয় তা একটু খেয়াল করলেই বুঝা যায়। আর না হয়তো সে সময় মক্কার মুশরিকরা তাদের মিথ্যা প্রভুগুলোকে বর্জন না করেও মুসলিম হতে পারতো। কিন্তু তা হয় নি। তবে এর পরিবর্তে একমাত্র যে রব্ব এর দাসত্ব পেয়েছি তা যে কতো বড় নিয়ামাহ্ তা এ দাবিকৃত মুসলিমদের পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব নয়। কারণ যখন আমি আমার রব্বের উপর আস্থা রেখে কোন কাজ শুরু করি তখন মনে হয় কল্যাণ নিশ্চিত। এতে যদি হেরেও যাই, তবে তাই আমার জন্য কল্যাণকর।  এছাড়া দৈনিক পাঁচবার আপন রব্ব এর সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার সকল চাওয়া-পাওয়াগুলোও সেরে ফেলতে পারি। যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই তাদের মাথা সবসময়ই বোঝা হয়ে থাকে।  অথচ আমি এমন মহান এক রব্ব পেয়েছি, যার সাথে আমার সুখ-দুঃখগুলো শেয়ার করতে পারি, যার কাছে একান্ত কিছু চাইতে পারি। এছাড়া কেবল তাঁর আনুগত্য করারর মধ্যেই আমার প্রকৃত সফলতা। আর এই সুযোগটির সন্ধান ইসলামই আমাকে এনে দিয়েছে।

আসলে নিজেকে তখন খুবই ভাগ্যবান মনে হয় যখন দেখি সমবয়সী কেউ তার সৃষ্টিকর্তার দেওয়া বিধানের সাথে অহংকার করে অন্যায় করেই চলছে। সে বুঝতে চায়না তার রব্ব তাকে কেন সৃষ্টি করেছে! অথচ সে তার রব্ব এর নিকট কেবল তাঁরই ইবাদাত করার ওয়াদা দিয়ে এসেছে। আর তার রব্ব এর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলামই কেবল একজন মানুষকে যাবতীয় অন্যায় থেকে বিরত রাখতে পারে এবং তার প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বাঁচাতে পারে। এই ইসলাম এনে দেয় একটি পবিত্র জীবনব্যবস্থা, যেখানে থাকে না কোন হারানোর আশংকা। আবার এই ইসলাম দেখিয়ে দেয় একটি অনন্ত জীবনের রাস্তা, যা কখনো শেষ হবার নয়।

এই বিষয়গুলো ভাবতে গেলেই অন্তরে একটি আশার সঞ্চার হয়, মনে হয় আমি তাকে পেয়ে গেছি যে কিনা আমাকে আমার প্রভুর নৈকট্য লাভের পথ দেখাবে। আর এটাই ইসলাম, যা যুগেযুগে নবীগণ (আকাইহিস সালাম) প্রচার করে গেছেন। 

যখন দেখি পাশের লোকগুলো দুনিয়ার হিসেব মেলাতে গিয়ে হাহাকার করে উঠছে, তখন মনে হয় ইসলাম আমায় কতইনা সহজ করে দিয়েছে। সে আমার চিন্তাগুলোকে আমার প্রভুর নিকট সপে দিয়েছে, সে আমাকে আমার পালনকর্তার উপর আস্থা রেখে ভয় না করার সাহস দিয়েছে, এমনকি আমার চরম একাকীত্বের সময়গুলোতেও সঙ্গ দিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। এরকম বহু বিষয়ে ইসলামের মধ্যস্থতা আমাকে তার প্রতি কৃতজ্ঞ করে তুলেছে। যদিও ইসলামের প্রতি আমার এই কৃতজ্ঞতা খুবই সামান্য।

মাঝেমধ্যে উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোর কথা সামনে আসতেই নিজের অজান্তে শরীরটা শিহরিত হয়ে উঠে। তখন মনে হয় ঐ মানুষগুলো কতোটাইনা ত্যাগ করেছে। তাদের ত্যাগের পরিমাণ ভাবতেই অন্তরটা ভীত হয়ে পড়ে। হতে পারে এই ভীত হওয়ার ভালোবাসাটাই এখন পর্যন্ত আমার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু তাদেরকে পুরোপুরি অনুসরণ করতে অনেকটা পথই বাকি রয়েছে। তবে তাদের এই আদর্শ আর ত্যাগ প্রতিনিয়ত আমাকে অনুপ্রাণিত করে, আমাকে শেখায় কিভাবে ইসলামকে ভালোবাসতে হয়।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় আমার মতো বহু ছেলেই গাড়ি চাপায়, সন্ত্রাসির গুলিতে, পুলিশের গুলিতে, এমনকি বন্ধুদের হাতেও মারা যায়। যে মৃত্যুর জন্য সে কখনোই প্রস্তুত ছিলোনা। কিন্তু মৃত্যু একমাত্র জিনিস যা পরবর্তীতে আফসোস করারও সুযোগ দেয়না। তবে প্রত্যেকের কর্মফল অনুযায়ী আখিরাতে খুশি হওয়ার কিংবা আফসোস করার সুযোগ রয়েছে। তখম তা আর পরিবর্তন করার কোন সুযোগ থাকবে না। তাই ভাবতেই ভয় হয় আমি যদি আমার রব্ব কে খুশি করার কোন চেষ্টাই না করি, তবে আমি কাকে খুশি করে চলছি? নিশ্চয়ই আমি শয়তানকে খুশি করে যাচ্ছি! আর যে শয়তানের স্থান জাহান্নাম নির্ধারিত, তার উত্তরসূরী হিসেবে আমার স্থান কোথায় হবে তা কি চিন্তার বিষয় নয়?

আসলে পরকালীন চিন্তা থেকেই ইসলামের প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। যখনই জাহান্নামের কঠিন শাস্তি আর জান্নাতের অসীম নিয়ামতের কথা সামনে আসে তখনই মনে হয় ইসলামই আমার একমাত্র উপায়। যে আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারে এবং জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে (আমীন)।

পরকালীন মুক্তির পাশাপাশি ইসলামের আরো একটি আলাদা গুণ রয়েছে। সে কখনোই তার অনুসারীদের নিরাশ করে না। এমনকি ইসলামের প্রকৃত অনুসারীরাও কখনো নিরাচ হয়নি। আর তা প্রতিটি ইসলামপ্রেমী মুসলিমের জন্য বড় পাওয়া। তাইতো নবী মুহাম্মদ (সা:) ও তার সাহাবীগণ শিশু ইসলামকে বড় করতে গিয়ে নানা কষ্টের শিকার হয়েও থেমে যাননি। বরং তাঁরা শত্রুর তরবারীর নিচে থেকেও ভাবতেন আল্লাহই ফয়সালা করবেন। তাই সেই কঠিন মূহর্তগুলো ছিলো তাদের ভালোবাসা প্রমাণের সুবর্ণ সুযোগ। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা দুনিয়া থেকেই জান্নাতের টিকেট নিয়ে পরকালে পারি জমিয়েছেন। তাদের পৃথিবীতে সম্পদশালী হওয়ার কোন ইচ্ছে ছিলোনা। তবে তাদের চাওয়া ছিলো এর চেয়ে বড়। তাই তারা পৃথিবী থেকে কয়েকগুণ বড় জান্নাত পেয়ে গেছেন (সুবহানআল্লাহ্)।

আসলে উনাদের ভালোবাসা আর আমাদের ভালোবাসার মধ্যে অনেক তফাত রয়েছে। আমরা মুখে বললেও কর্মক্ষেত্রে তার উল্টোটাই বেশি করি। তাইতো ইসলামকে ভালোবাসি কথাটা চিৎকার করে বলার সাহস রাখা ছেলেটাও হলিউড, বলিউড আর বাংলা ছিনেমার নাটক দেখা ছাড়তে পারে না। একটা ছেলে সহসা রসূলের (সা:) জন্য জীবন দিয়ে দেয়ার সাহস দেখায় কিন্তু রসূলের (সা:) সতর্কতা উপেক্ষা করে আবার গাইরে মাহরাম মেয়ে নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। আসলে এসব ভালোবাসা দিয়ে নিজেকে বুঝানো যায়, রব্ব কে নয়! নিজের রব্ব এর জন্য প্রয়োজন খাঁটি একটি ভালোবাসা। যা আমাদের সালাফগণ দেখিয়ে গেছেন।

তবুও একজন পাপী হিসেবে যেহেতু আমার প্রভুই আমার শেষ ঠিকানা, সেহেতু তাঁর মনোনীত ধর্মই আমার একমাত্র মুক্তির আশা। আর ইসলামই যেহেতু আমার এই আশাকে পূরণ করার অঙ্গীকার দিয়েছে, তাই শেষ বেলায় এসে এতটুকুই বলবো- ইসলামকে এজন্যই ভালোবাসি যে, ইসলামই আমার পরকালীন মুক্তি এনে দিতে পারে এবং আমাকে আমার রব্ব এর সন্তোষভাজন করে দিতে পারে  (আমীন)।


সবশেষে আমার প্রভুর পক্ষ হতে অন্তর শীতলকারী একটিবাণী:

''জেনে রাখ! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নাই এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না। যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ দুনিয়া ও আখিরাতে, আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নাই; উহাই মহাসাফল্য।'' -[সূরা ইউনুস ১০, আয়াত ৬২-৬৪]


______
লিখেছেন: আরিফুল ইসলাম দিপু (ফার্মাসিস্ট)

1 টি মন্তব্য: