পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

অহংকার : বিতারিত শয়তানের ধ্বংসের কারণ


"এবং যখন আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।" -(সূরা বাকারাহ্, আয়াত: ৩৪)



আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম (আ:) এর এই বড় মর্যাদার কথা বর্ণনা করে মানুষের উপর তাঁর বড় অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন এবং তাদেরকে হযরত আদম (আ:) এর সামনে ফিরিশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়ার সংবাদ দিয়েছেন । এর প্রমাণস্বরূপ বহু হাদীস রয়েছে ।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে, ইবলিশ ফিরিশতাদের একটি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো যাদেরকে জ্বীন বলা হয় । তারা অগ্নিশিখা দ্বারা সৃষ্ট ছিল । এই গোত্রটি ছাড়া অন্যসব ফিরিশতা আলো দ্বারা সৃষ্টি ছিলো ।

প্রথমে জ্বীনেরা পৃথিবীতে বাস করতো, তারা বিবাদ, বিসম্বাদ ও কাটাকাটি-মারামারি করতে থাকলে আল্লাহ্ তা'আলা ইবলিশকে ফিরিশতাদের সেনাবাহিনী দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দেন । ইবলিশ ও তার সঙ্গীরা তাদেরকে মেরেকেটে সমুদ্র দ্বীপে এবং পর্বত প্রান্তে তাড়িয়ে দেয় । এতে ইবলিশের অন্তরে এই অহংকারের সৃষ্টি হয়ে গেল যে, সে ছাড়া আর কারও দ্বারা এ কার্য সাধন হয়নি । তার অন্তরের এ পাপ ও আমিত্বের কথা একমাত্র আল্লাহই জানতেন । যখন বিশ্বপ্রভু বললেন: 'আমি যমীনে খলীফা বানাতে চাই' তখন ফিরিশতারা আরজ করেছিলেন: 'আপনি এদেরকে কেন সৃষ্টি করবেন যারা পূর্বসম্প্রদায়ের মতো ঝগড়া, ফাসাদ ও রক্তারক্তি করবে?' তখন আল্লাহ্ উত্তরে বলেন: 'আমি জানি যা তোমরা জানোনা, অর্থাৎ ইবলিশের অন্তরে যে ফখর ও অহংকার আছে তার জ্ঞান আমরই আছে, তোমাদের নেই ।'

অতঃপর হযরত আদম (আ:) এর মাটি উঠিয়ে আনা হলো । তা ছিলো খুবই মসৃণ ও উত্তম । তা খামীর করা হলে আল্লাহ্ তা'আলা এর দ্বারা হযরত আদম (আ:) কে স্বহস্তে সৃষ্টি করেন ।অতঃপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত এ রকমই পুতুলের আকারে ছিলো । ইবলিশ আসতো ও তার উপর লাথি মেরে দেখতো যে, ওটা কোন ফাঁপা জিনিসের মতো শব্দকারী মাটি । অতঃপর সে মুখের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে পিছনের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসতো । আবার পিছন দিয়ে ঢুকে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতো । অতঃপর সে বলতো- প্রকৃতপক্ষে এটা কোন জিনিসই নয়, আমি যদি এর উপর বিজয়ী হই তবে একে ধ্বংস করে ছাড়বো ।

অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা এর মধ্যে ফুঁ দিয়ে রূহ দিয়ে দিলেন । ওটা যেখান পর্যন্ত পৌঁছল রক্ত-গোশত হতে থাকলো । যখন রূহ নাভি পর্যন্ত পৌঁছল তিনি (আদম আ.) স্বীয় শরীরকে দেখে খুশী হয়ে গেলেন এবং তৎক্ষণাৎ উঠার ইচ্ছা করলেন । যখন রূহ সমস্ত শরীরে পৌঁছে গেল এবং হাঁচি এলো তখন তিনি বলেন: 'আলহামদুলিল্লাহী রব্বিল আলামিন' আল্লাহ্ পাক উত্তরে বলেন: 'ইয়ার হামকুল্লাহ্'  ।

তারপর ইবলিশের সঙ্গী ফিরিশতাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: 'আদম (আ:) কে সিজদাহ্ করো' । সবাই সিজদাহ্ করলো, কিন্তু ইবলিশের অহংকার প্রকাশ পেয়ে গেল, সে অমান্য করলো এবং বললো: 'আমি তার চেয়ে উত্তম, তার চেয়ে আমি বয়সে বড়, তার চেয়ে আমি বেশি শক্তিশালী, সে সৃষ্টি হয়েছে মাটি দ্বারা, আমি সৃষ্টি হয়েছি আগুন দ্বারা এবং আগুন মাটি অপেক্ষা শক্তিশালী । তার এ অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে স্বীয় রহমত হতে বঞ্চিত করে দেন এবং এজন্যই তাকে ইবলিশ বলা হয় ।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে, অবাধ্যতার পূর্বে যে ফিরিশতাদের মধ্যে ছিলো তাঁর নাম আযাযীল, ভূ-পৃষ্ট ছিলো তার বাসস্থান । বিদ্যা ও জ্ঞানে সে খুব বড় ছিলো । এজন্যই তার মস্তিষ্ক অহংকারে ভরপুর ছিলো ।

হযরত কাতাদাহ (রহ:) বলেন যে, এই অহংকারের পাপই ছিলো সর্বপ্রথম পাপ যা ইবলিশ হতে প্রকাশ পেয়েছে । বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না ।

- তথ্যসূত্র: তাফসীর ইবনে কাছীর

কোন মন্তব্য নেই