পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

নারীর জান্নাত যে পথে


লিখেছেনঃ সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : আলী হাসান তৈয়ব



প্রেক্ষাপট:

চারদিক থেকে ভেসে আসছে নির্দয় ও পাষন্ড স্বামী নামের হিংস্র পশুগুলোর আক্রমণের শিকার অসহায় ও অবলা নারীর করুণ বিলাপ। অহরহ ঘটছে দায়ের কোপ, লাথির আঘাত, অ্যাসিডে ঝলসানো, আগুনে পুড়ানো, বিষ প্রয়োগ এবং বালিশ চাপাসহ নানা দুঃসহ কায়দায় নারী মৃত্যুর ঘটনা। কারণ তাদের পাঠ্য সূচি থেকে ওঠে গেছে বিশ্ব নবির বাণী ‘‘তোমরা নারীদের প্রতি কল্যাণকামী হও।’’ ‘‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আমি আমার স্ত্রীদের নিকট উত্তম।’’


আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا ٣٦ ﴾ [الاحزاب: ٣٦]

‘‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।’’[1]

রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেন :

«كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى، قالوا : يا رسول الله ومن يأبى؟ قال : من أطاعني دخل الجنة، ومن عصاني فقد أبى».

‘‘আমার প্রত্যেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করবে। সাহাবারা প্রশ্ন করলেন, কে অস্বীকার করবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, যে আমার অনুসরণ করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হল, সে অস্বীকার করল।’’[2]


নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ব :

আল্লাহ তাআলা বলেন :

﴿ ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖ وَبِمَآ أَنفَقُواْ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡۚ﴾ [النساء: ٣٤]

‘‘পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’’[3]

হাফেয ইবনে কাসির অত্র আয়াতের তাফসিরে বলেন, ‘‘পুরুষ নারীর তত্ত্বাবধায়ক। অর্থাৎ সে তার গার্জিয়ান, অভিভাবক, তার উপর কর্তৃত্বকারী ও তাকে সংশোধনকারী, যদি সে বিপদগামী বা লাইনচ্যুত হয়।’’[4]

এ ব্যাখ্যা রাসূলের হাদিস দ্বারাও সমর্থিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি যদি আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে নারীদের আদেশ করতাম স্বামীদের সেজদার করার জন্য। সে আল্লাহর শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন, নারী তার স্বামীর সব হক আদায় করা ব্যতীত, আল্লাহর হক আদায়কারী হিসেবে গণ্য হবে না। এমনকি স্বামী যদি তাকে বাচ্চা প্রসবস্থান থেকে তলব করে, সে তাকে নিষেধ করবে না।’’[5]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿فَٱلصَّٰلِحَٰتُ قَٰنِتَٰتٌ حَٰفِظَٰتٞ لِّلۡغَيۡبِ بِمَا حَفِظَ ٱللَّهُۚ﴾ [النساء: ٣٤]

‘‘সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযতকারীনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযত করেছেন।’’[6]

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এ আয়াতের তাফসিরে বলেন, ‘সুতরাং নেককার নারী সে, যে আনুগত্যশীল। অর্থাৎ যে নারী সর্বদা স্বামীর আনুগত্য করে… নারীর জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূলের হকের পর স্বামীর হকের মত অবশ্য কর্তব্য কোনো হক নেই।’[7]

হে নারীগণ, তোমরা এর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখ। বিশেষ করে সে সকল নারী, যারা সীমালঙ্ঘনে অভ্যস্ত, স্বেচ্ছাচার প্রিয়, স্বামীর অবাধ্য ও পুরুষের আকৃতি ধারণ করে। স্বাধীনতা ও নারী অধিকারের নামে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, যখন ইচ্ছা বাইরে যাচ্ছে আর ঘরে ফিরছে। যখন যা মন চাচ্ছে তাই করে যাচ্ছে। তারাই দুনিয়া এবং দুনিয়ার চাকচিক্যের বিনিময়ে আখেরাত বিক্রি করে দিয়েছে। হে বোন, সতর্ক হও, চৈতন্যতায় ফিরে আস, তাদের পথ ও সঙ্গ ত্যাগ করে। তোমার পশ্চাতে এমন দিন ধাবমান যার বিভীষিকা বাচ্চাদের পৌঁছে দিবে বার্ধক্যে।

নারীদের উপর পুরুষের কর্তৃত্বের কারণ :

পুরুষরা নারীদের অভিভাবক ও তাদের উপর কর্তৃত্বশীল। যার মূল কারণ উভয়ের শারীরিক গঠন, প্রাকৃতিক স্বভাব, যোগ্যতা ও শক্তির পার্থক্য। আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য এবং ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও অবয়বে সৃষ্টি করেছেন।

দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ নেককার স্ত্রী :

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘পুরো দুনিয়া উপকৃত হওয়ার সামগ্রী, আর সবচে’ উপভোগ্য সম্পদ হল নেককার নারী।’’[8]

বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘চারটি গুণ দেখে নারীদের বিবাহ করা হয়- সম্পদ, বংশ মর্যাদা, সৌন্দর্য ও দীনদারি। তবে তোমার হাত ধুলি ধুসরিত হোক, তুমি ধার্মিকতার দিক প্রাধান্য দিয়েই তুমি কামিয়াব হও।’’[9]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘চারটি বস্তু শুভ লক্ষণ। যথা : ১. নেককার নারী, ২. প্রশস্ত ঘর, ৩. সৎ প্রতিবেশী, ৪. সহজ প্রকৃতির আনুগত্যশীল-পোষ্য বাহন। পক্ষান্তরে অপর চারটি বস্তু কুলক্ষণা। তার মধ্যে একজন বদকার নারী।’’[10]

এসব আয়াত ও হাদিস পুরুষদের যেমন নেককার নারী গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি উৎসাহ দেয় নারীদেরকে আদর্শ নারীর সকল গুনাবলী অর্জনের প্রতি। যাতে তারা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় নেককার নারী হিসেবে গণ্য হতে পারে।

প্রিয় মুসলিম বোন, তোমার সামনে সে উদ্দেশেই নেককার নারীদের গুণাবলী পেশ করা হচ্ছে। যা চয়ন করা হয়েছে কুরআন, হাদিস ও পথিকৃৎ আদর্শবান নেককার আলেমদের বাণী ও উপদেশ থেকে। তুমি এগুলো শিখার ব্রত গ্রহণ কর। সঠিক রূপে এর অনুশীলন আরম্ভ কর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘ইলম আসে শিক্ষার মাধ্যমে। শিষ্টচার আসে সহনশীলতার মাধ্যমে। যে কল্যাণ অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তাকে সুপথ দেখান।’’[11]


নেককার নারীর গুণাবলি :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَٱلصَّٰلِحَٰتُ قَٰنِتَٰتٌ حَٰفِظَٰتٞ لِّلۡغَيۡبِ بِمَا حَفِظَ ٱللَّهُۚ﴾ [النساء: ٣٤]

ইবনে কাসির রহ. লিখেন,فالصالحات শব্দের অর্থ নেককার নারী, ইবনে আব্বাস ও অন্যান্য মুফাসসিরের মতে قانتات শব্দের অর্থ স্বামীদের আনুগত্যশীল নারী, আল্লামা সুদ্দি ও অন্যান্য মুফাসসির বলেন حافظات للغيب শব্দের অর্থ স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের চরিত্র ও স্বামীর সম্পদ রক্ষাকারী নারী।’’[12]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, আপন লজ্জাস্থান হেফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে তাকে বলা হবে, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর।’’[13]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমাদের সেসব স্ত্রী জান্নাতি, যারা মমতাময়ী, অধিক সন্তান প্রসবকারী, পতি-সঙ্গ প্রিয়- যে স্বামী গোস্বা করলে সে তার হাতে হাত রেখে বলে, আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি দুনিয়ার কোনো স্বাদ গ্রহণ করব না।’’[14]

সুনানে নাসাঈতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একদা জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল, কোনো নারী সব চেয়ে ভালো? তিনি বললেন, ‘‘যে নারী স্বামীকে আনন্দিত করে, যখন স্বামী তার দিকে দৃষ্টি দেয়। যে নারী স্বামীর আনুগত্য করে, যখন স্বামী তাকে নির্দেশ দেয়, যে নারী স্বামীর সম্পদ ও নিজ নফসের ব্যাপারে, এমন কোনো কর্মে লিপ্ত হয় না, যা স্বামীর অপছন্দ।’’[15]

হে মুসলিম নারী, নিজকে একবার পরখ কর, ভেবে দেখ এর সাথে তোমার মিল আছে কতটুকু। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পথ অনুসরণ কর। দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ অর্জনের শপথ গ্রহণ কর। নিজ স্বামী ও সন্তানের ব্যাপারে যত্নশীল হও।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘তোমার কি স্বামী আছে? সে বলল হ্যাঁ, রাসূল বললেন, তুমি তার কাছে কেমন? সে বলল, আমি তার সন্তুষ্টি অর্জনে কোনো ত্রুটি করি না, তবে আমার সাধ্যের বাইরে হলে ভিন্ন কথা। রাসূল বললেন, লক্ষ্য রেখ, সে-ই তোমার জান্নাত বা জাহান্নাম।’’[16]


উপরের আলোচনার আলোকে নেককার নারীর গুণাবলি :

১. নেককার : ভালো কাজ সম্পাদনকারী ও নিজ রবের হক আদায়কারী নারী।

২. আনুগত্যশীল : বৈধ কাজে স্বামীর আনুগত্যশীল নারী।

৩. সতী : নিজ নফসের হেফাযতকারী নারী, বিশেষ করে স্বামীর অবর্তমানে।

৪. হেফাযতকারী : স্বামীর সম্পদ ও নিজ সন্তান হেফাযতকারী নারী।

৫. আগ্রহী : স্বামীর পছন্দের পোশাক ও সাজ গ্রহণে আগ্রহী নারী।

৬. সচেষ্ট : স্বামীর গোস্বা নিবারণে সচেষ্ট নারী। কারণ হাদিসে এসেছে, স্বামী নারীর জান্নাত বা জাহান্নাম।

৭. সচেতন : স্বামীর চাহিদার প্রতি সচেতন নারী। স্বামীর বাসনা পূর্ণকারী।

যে নারীর মধ্যে এসব গুণ বিদ্যমান, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্য মতে জান্নাতী। তিনি বলেছেন, ‘‘যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, নিজ চরিত্র হেফাযত করে ও স্বামীর আনুগত্য করে, তাকে বলা হবে, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ কর।’’[17]

পরিশেষে স্বামীদের উদ্দেশে বলি, আপনারা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন, তাদের কল্যাণকামী হোন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমরা নারীদের কল্যাণকামী হও। কারণ, তাদের পাঁজরের হাড্ডি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, পাঁজরের হাড্ডির ভেতর উপরেরটি সবচে’ বেশি বাঁকা। যদি সোজা করতে চাও, ভেঙে ফেলবে। আর রেখে দিলেও তার বক্রতা দূর হবে না, তোমরা নারীদের ব্যাপারে কল্যাণকামিতার উপদেশ গ্রহণ কর।’’[18]


_________

[1] আহযাব:৩৬

[2] বুখারী

[3] নিসা : ৩৪

[4] ইবনে কাসির : ১/৭২১

[5] সহিহ আল-জামে আল-সাগির : ৫২৯৫

[6] নিসা : ৩৪

[7] ফতওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ : ৩২/২৭৫

[8] মুসলিম

[9] মুসলিম : ১০/৩০৫

[10] হাকেম, সহিহ আল-জামে : ৮৮৭

[11] দারে কুতনি

[12] ইবনে কাসির : ১ : ৭৪৩

[13] ইবনে হিববান, সহিহ আল-জামে : ৬৬০

[14] আলবানির সহিহ হাদীস সংকলন : ২৮৭

[15] সহিহ সুনানে নাসায়ী : ৩০৩০

[16] আহমাদ : ৪ : ৩৪১

[17] ইবনে হিববান, আল-জামে : ৬৬০

[18] বর্ণনায় বুখারী, মুসলিম, বায়হাকি ও আরো অনেকে।

কোন মন্তব্য নেই