পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

দাজ্জালের মহাযুদ্ধ ও তাকে হত্যা

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন,“পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষের মহাযুদ্ধ পাঁচটি। তার দুটি ইতিপূর্বে এই উম্মতের আগে বিগত হয়েছে। অবশিষ্ট তিনটি এই উম্মতের মাঝে সংঘটিত হবে। একটি হল তুর্কি মহাযুদ্ধ। একটি রোমানদের (খ্রিস্টিয়ানদের) সঙ্গে মহাযুদ্ধ। আর তৃতীয়টি হল, দাজ্জালের মহাযুদ্ধ। দাজ্জালের পর আর কোন মহাযুদ্ধ হবে না”। (আল ফিতান, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৪৮, আসসুনানুল ওয়ারিদাতু ফিল ফিতান)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিল ইসলামী খেলাফতের সর্বশেষ কর্ণধার তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের পর, ঈমানের দুর্বলতা আর ইহুদী খ্রিষ্টানদের উস্কে দেওয়া আরব জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে ১৯২৪ সালে তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন খেলাফত শাসনের বিলুপ্তির মাধ্যমে মুসলমানদের ইসলামী শাসননীতি খেলাফতের যা অবশিষ্ট ছিল তারও বিলুপ্তি ঘটে। কুস্তুন্তুনিয়া বা ইস্তাম্বুলের ভূমি থেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা ইসলামের পরাজয় ঘটে। কামাল পাশার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় কট্টর ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ নামক কুফরি মতবাদের জয় হয়, যা এখনও বিদ্যমান। রোমানদের (খ্রিস্টিয়ানদের) সঙ্গে এই উম্মতের যে মহাযুদ্ধ হবে তার নেতৃত্ব দিবেন ইমাম মেহেদী। আর দাজ্জালের সাথে যে মহাযুদ্ধ হবে তার নেতৃত্ব দিবেন ঈসা ইবনে মারিয়ম (আঃ)। যদিও মুসলিম জাতি নিজেদের অলসতা ও অবহেলার কারণে আগত এক অনিবার্য বাস্তবতার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে না, তবে কুফরি শক্তি ঠিকই এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং স্পষ্ট ভাষায় তার ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছে।

হযরত আবু জায়িরা বর্ণনায় বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর নিকট দাজ্জালের আলোচনা উত্থাপিত হলে তিনি বললেন,“তার আবির্ভাবের সময় মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। একদল তার অনুগামী হয়ে যাবে। একদল অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে পরিজনের সাথে ঘরে বসে থাকবে। একদল এই ফোরাতের তীরে এসে শক্তপায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। দাজ্জাল তাদের সাথে যুদ্ধ করবে আর তারা দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। এমনকি তারা শামের (সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন, প্যালেস্টাইন ও দখলকৃত প্যালেস্টাইন নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল) পশ্চিমাঞ্চলে লড়াই করবে। তারা একটি সেনা ইউনিট প্রেরণ করবে, যাদের মাঝে চিত্রা বা ডোরা বর্ণের ঘোড়া থাকবে। এরা ওখানে যুদ্ধ করবে। ফল এই দাঁড়াবে যে, এদের একজনও ফিরে আসবে না”। (মুসতাদরাকে হাকেম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৪১)

হযরত নাফে’ ইবনে উকবা (রাঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ আমার অবর্তমানে তোমরা তোমরা জাজিরাতুল আরবে যুদ্ধ করবে। ফলে আল্লাহ এই অঞ্চলটিকে বিজিত করবেন। তারপর তোমরা পারস্যে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাকেও বিজিত করবেন। তারপর তোমরা রোমানদের সাথে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাকেও বিজিত করবেন। তারপর তোমরা দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাকেও বিজিত করবেন”। (সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২২৫; সহিহ ইবনে হিব্বান, পৃষ্ঠা ৬৬৭২)

হযরত নাহীক ইবনে সারীম (রাঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিঃসন্দেহে তোমরা মুশরিকদের (মূর্তিপূজারীদের) সঙ্গে যুদ্ধ করবে। এমনকি এই যুদ্ধে তোমাদের বেঁচে যাওয়া মুজাহিদরা উর্দুন (জর্ডান) নদীর তীরে দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। এই যুদ্ধে তোমরা পূর্ব দিকে অবস্থান গ্রহণ করবে আর দাজ্জালের অবস্থান হবে পশ্চিম দিকে” । । (আল ইসাবা, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৭৬)

এখানে মুশরিকদের দ্বারা উদ্দেশ্য উপমহাদেশের মূর্তিপূজারী জাতি। তার মানে এটি সেই যুদ্ধ – “গাজওয়াতুল হিন্দ”, যেখানে মুজাহিদরা এই উপমহাদেশে আক্রমণ চালাবে, আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করবেন, ক্ষমা করে দেবেন, বেঁচে যাওয়া মুজাহিদরা জেরুজালেমে ফিরে যাবে এবং সেখানে ঈসা (আঃ) সাক্ষাত পাবে এবং ঈসা (আঃ) নেতৃত্বে দাজ্জালের বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে। ( সুনানে নাসায়ী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪২; আল ফিতান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪০৯ ও ৪১০)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেছেন, “সমুদ্রের শহীদান, আন্তাকিয়ার-আমাকের শহীদান ও দাজ্জালের শহীদান হল মহান আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠতম শহীদ”।
(আল ফিতান, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯৩)

এসব যুদ্ধের শহীদদের সম্পর্কে এক বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, “উক্ত যুদ্ধে যে এক তৃতীয়াংশ লোক শহীদ হবে, তাদের এক একজন বদরি শহীদদের দশজনের সমান হবে। বদরের শহীদদের একজন সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে। পক্ষান্তরে এই ভয়াবহ যুদ্ধগুলোর একজন শহীদ সাতশো ব্যক্তির সুপারিশের অধিকার লাভ করবে”।
(আল ফিতান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪১৯)

তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি শানগত মর্যাদা। অন্যথায় মোটের উপর বদরি শহীদদের মর্যাদা ইতিহাসের সকল শহীদের মাঝে সবচেয়ে উঁচু। রোমানদের (খ্রিস্টিয়ানদের) সঙ্গে এই উম্মতের যে মহাযুদ্ধ হবে তার নেতৃত্ব দিবেন ইমাম মেহেদী। এই মহাযুদ্ধের বিজয়ের পর তিনি আবারও নবুওয়াতের আদলে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন যার আমিরুল মুমিনিন হবেন তিনি নিজেই। আর এই মহাযুদ্ধের বিজয় কুস্তুন্তুনিয়া (ইস্তাম্বুল) বিজয়ের কারণ হবে। আর কুস্তুন্তুনিয়ার (ইস্তাম্বুলের) বিজয়, দাজ্জালের আবির্ভাবের কারণ হবে। আর দাজ্জালের সাথে যে মহাযুদ্ধ হবে তার নেতৃত্ব দিবেন ঈসা ইবনে মারিয়ম (আঃ)।

দাজ্জাল বিষয়ক হযরত হুজায়ফা (রাঃ) এর বর্ণিত এর সুবিস্তৃত হাদিসে হযরত ঈসা (আঃ) এর আগমনের ঘটনাটি নিম্নরূপ। আল্লাহর রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সত্তর হাজার ইহুদি দাজ্জালের পিছনে থাকবে, যাদের গাঁয়ে তারজানি চাদর জড়ানো থাকবে (তারজানি চাদরও তায়লাসানের মতো সবুজ চাদরকে বলা হয়)। অনন্তর জুমার দিন ফজর নামাজের সময় যখন নামাজের ইকামাত হয়ে যাবে, তখন যেইমাত্র মাহদি মুসল্লিদের পানে তাকাবেন, অমনি তিনি দেখতে পাবেন, ঈসা ইবনে মারিয়ম আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। তার পরিধানে দুটি কাপড় থাকবে। মাথার চুলগুলো এমন চমকদার হবে যে, মনে হবে তার মাথা থেকে পানির ফোঁটা ঝরছে”।

একথা শুনে আবু হুরায়রা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি তার কাছে যাই, তা হলে আমি তার সঙ্গে মু’আনাকা করব কি? উত্তরে রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “শোনো আবু হুরায়রা, তার এই আগমন প্রথমবারের মতো হবে না। তার সঙ্গে তুমি এমন প্রভাবদীপ্ত অবস্থায় মিলিত হবে, যেমনটি মৃত্যুর ভয়ে মানুষ আতঙ্কিত হয়। তিনি মানুষকে জান্নাতের মর্যাদা ও স্তরের সুসংবাদ প্রদান করবেন। এবার আমিরুল মুমিনীন তাকে বলবে, আপনি সামনে এগিয়ে আসুন এবং লোকদেরকে নামাজ পড়ান। উত্তরে ঈসা বলবে, নামাজের ইকামত আপনার জন্য হেয়েছে। কাজেই ইমামতও আপনিই করুন। এভাবে ঈসা ইবনে মারিয়াম তার পেছনে নামাজ আদায় করবে”।
(আসসুনানুল ওয়ারিদাতু ফিল ফিতান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১১১০)

হযরত মুজাম্মা’ ইবনে জারিয়া আনসারি (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, “ঈসা ইবনে মারিয়াম দাজ্জালকে ‘লুদ’ এর ফটকে হত্যা করবে।”
(মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২০; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২২৪৪)

‘লুদ’ বর্তমানে ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত। এটি তেলআবিব থেকে দক্ষিন-পূর্বে ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ছোট্ট একটি শহর। ১১৯৯ সালের জরিপ অনুযায়ী এই শহরের জনসংখ্যা ৬১ হাজার ১ শত। ইসরাইল এই শহরে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা সমৃদ্ধ বিমানবন্দর স্থাপন করেছে। হতে পারে, দাজ্জাল এখান থেকে বিমানযোগে পালানোর চেষ্টা করবে এবং এই বিমানবন্দরেই তাকে হত্যা করা হবে। মহান আল্লাহ তার শত্রু ও ইহুদীদের খোদা দাজ্জালকে হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম(আঃ) এর হাতে হত্যা করাবেন, যাতে সমগ্র বিশ্ব বুঝতে পারে যে, মানবতার বিষফোঁড়াগুলোকে নির্মূল করতে হলে সেগুলোকে কেটে দেহ থেকে আলাদা করা জরুরী আর এই কাজটি জিহাদেরই মাধ্যমে হয়ে থাকে।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুসলমানরা ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। মুসলমানরা ইহুদীদের হত্যা করবে। এমনকি ইহুদীরা পাথর ও গাছের আড়ালে লুকাবে। তখন পাথর ও গাছ বলবে, হে আল্লাহর বান্দা, এই যে আমার পেছনে এক ইহুদি লুকিয়ে আছে; তুমি এসে ওকে হত্যা করো। তবে ‘গারকাদ’ বলবে না। কেননা, সেটি ইহুদীদের গাছ”।
(সুনানে মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৩৯)

ইহুদীদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ জড় পদার্থগুলোকেও বাকশক্তি দান করবেন। তারাও ইহুদীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। ইসরাইল যখন গোলান পর্বতমালায় দখল প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন থেকেই তারা ওখানে ‘গারকাদ’ বৃক্ষ লাগাতে শুরু করেছে। এছাড়াও তারা স্থানে স্থানে এই গাছটি রোপণ করছে। সম্ভবত এই গাছের সঙ্গে তাদের বিশেষ কোন সম্পর্ক আছে।


মূলঃ মাওলানা আসেম ওমর
অনুবাদঃ মাওলানা মুহাম্মাদ মুহিউদ্দিন অবলম্বনে

কোন মন্তব্য নেই