পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

মাযহাবী, ওয়াহাবি, আহলে হাদীস ও একটি পর্যালোচনা

মাযহাবগুলোর ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ এবং ফিক্বহশাস্ত্রের উন্নয়নের পর্যালোচনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, মহান ইমাম ও মাযহাবগুলোর প্রতিষ্ঠাগণের মতে,

(১) একক কিংবা সামষ্টিকভাবে কোন মাযহাবই ভুল-ভ্রান্তির উর্ধ্বে নয়।
(২) কোন একক মাযহাবের অনুসরণ মুসলিমদের উপর বাধ্যতামূলক নয়।

তবে তাকলীদ এর সর্বব্যাপী প্রভাব অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি মুসলিম মানসিকতার আমূল এক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এর প্রভাবে কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই সাধারণ মুসলিমদের ভিতর বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয় যে, চারটি মাযহাবই সকল ক্ষেত্রে ঐশী নির্দেশনায় পরিচালিত এবং যাবতীয় ভুল-ভ্রান্তি মুক্ত। এসব মাযহাবের প্রত্যেকটি আইনগত সিদ্ধান্তই সঠিক ও নির্ভুল। প্রত্যেক ব্যক্তিকে সর্বাবস্থায় চারটি মাযহাবের যেকোন একটি মেনে চলতে হবে। কোন মুসলিম নিজের মাযহাব পরিবর্তন করতে পারবে না। এসব ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি যদি চার মাযহাবের সবকটিকে নির্ভুল মনে না করে কিংবা এগুলোর কোন একটি অনুসরণের বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার করে, তবে সে একজন অভিশপ্ত ও ধর্মত্যাগী।

বিংশ শতাব্দীতে এ ধরণের ধর্মত্যাগী বিশেষায়িত করতে সর্বাধিক অপব্যবহৃত পরিভাষাটি হল ওয়াহাবি। প্রধানত ভারত ও পাকিস্তানে এই একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত আরেকটি পরিভাষা হলো আহলে হাদীস।

অথচ আব্দিল ওয়াহাবের (১৭০৩- ১৭৮৭ সাল) অনুসারীরা পবিত্র মক্কা ও মাদীনার কবরস্থানে সাহাবীগণ ও অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের কবরের উপর নির্মিত ইসলাম পরিপন্থী সকল সৌধ ধ্বংস করে ফেলেন। তৎকালীন সাধারণ মুসলিম, এমনকি অনেক আলিমদের মধ্যেও মৃত ব্যক্তির নিকট সুপারিশ কামনার প্রথা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছিল । আর এ কারণেই তখন থেকে 'অভিশপ্ত' ও 'ধর্মত্যাগী' ব্যক্তিকে বোঝাতে ওয়াহাবি শব্দটি ব্যবহৃত হতে থাকে।

আলি ইবনে আবি তালিব (রা:) বর্ণিত সহীহ মুসলিমে সংকলিত একটি হাদীসে নাবি (সা.) সকল প্রতিমা ও মূর্তি ধ্বংস এবং সকল উঁচু কবরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। (মুসলিম: ২১১৫)

একইভাবে আহলে হাদীস পরিভাষাটি ছিলি একটি সম্মানজনক ও প্রশংসাসূচক পদবি। হাদীসের অধ্যয়নে ইমাম মালিকের মতো যারা প্রচুর সময় ও শ্রম দিতেন, অতীতে তাদের এই খেতাব দেয়া হতো। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ভারত ও পাকিস্তানে একটি সংস্কার আন্দোলন এই নামটি গ্রহণ করে। তারা মূলত ফিক্বহশাস্ত্রের ভিত্তি হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এবং মাযহাবের অন্ধ অনুসরণের বিরোধিতা করেছিলেন।

উপরের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে মূল ধারার ওয়াহাবি ও আহলে হাদীসগণ ইসলামের শিক্ষা থেকে মোটেও বিচ্যুত নন। বরং যারা ভুল হোক শুদ্ধ হোক সর্বাবস্থায় চারটি মাযহাবের যেকোন একটির অনুসরণ অন্যের উপর বাধ্যতামূলক করে দেয় এবং প্রত্যেকটি মাযহাবের সকল সিদ্ধান্ত নির্ভুল বলে দাবি করে - তারাই আসলে সঠিক পথ থেকে সরে গেছেন।

তথ্যসূত্র: মাযহাব (অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত)
লেখক: ড. আবু আমীনাহ্ বিলাল ফিলিপ্স

কোন মন্তব্য নেই