পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

যাদু টোনা ও ইসলামে এর অবস্থান

(এই নোটের পুরোটাই Open Islamic Education Program) কর্তৃক আয়োজিত আত-তাওহীদ কোর্সটির পাঠ্যবই, কালিমা তায়্যিবা থেকে নেয়া। বইটার সংকলক আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নাসীল শাহরুখ ভাই। বইটার ১৩ তম অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে শুধু প্রাসঙ্গিক অংশটা হুবহু তুলে দেয়া হল......)

যাদুটোনা, জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্যগণনা তাওহীদ পরিপন্থী বিষয়

এই বিষয়গুলো প্রকৃতি ও বিধানের দিক থেকে সমগোত্রীয়। এদের মধ্যে একটি মিল এই যে এগুলোতে গোপন বা অপ্রকাশ্য উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও এ ধরনের কাজে দুষ্ট জিনদের সহায়তা গ্রহণ করা হয়। যারা এগুলো চর্চা করে, তারা কিছু শিরকপূর্ণ ও কুফরী কাজ করলে দুষ্ট ও শয়তান জিনেরা তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয় এবং তাদেরকে এ বিষয়ে সহায়তা করে থাকে। এজন্য এই কাজগুলোকে শিরক ও কুফরের অন্তর্ভুক্ত এবং তাওহীদের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লাহ পাক বলেন:

আর যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে সমবেত করবেন। সেদিন বলবেন, “হে জিনের দল, মানুষের অনেককে তোমরা বিভ্রান্ত করেছিলে” এবং মানুষদের মধ্য থেকে তাদের সঙ্গীরা বলবে, “হে আমাদের রব, আমরা একে অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছি এবং আমরা পৌঁছে গিয়েছি সেই সময়ে, যা আপনি আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।” তিনি বলবেন, “আগুন তোমাদের ঠিকানা, তোমরা সেখানে স্থায়ী হবে। তবে আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত।” নিশ্চয় তোমার রব বিজ্ঞ, সর্বজ্ঞ। ( ৬:১২৮)

এখানে মানুষ ও জিনের পরস্পরের মাঝে যে সম্পর্ক এবং একে অপরের সহযোগিতা ও স্বার্থসিদ্ধির যে বিবরণ এসেছে, তা এই যে মানুষের মাঝে একদল লোক যাদুটোনা, ভাগ্যগণনা জাতীয় বাতিল ও নিষিদ্ধ বিষয় চর্চার জন্য জিনদের সাহায্য নেয়, তারা শয়তান জিনদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য নানাপ্রকার শিরকী ও কুফরী কাজ করে, জিনদের ইবাদত করে, ফলে শয়তান জিনেরা তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে এই সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয় চর্চায় সাহায্য করে, আর এগুলোর চর্চার মাধ্যমে এই সমস্ত ভণ্ডরা মানুষের দুর্বল ঈমান ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মানুষের কাছ থেকে প্রচুর টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়, এভাবে মানুষের একদল জিনদের একদলের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিল করে নেয়। তবে এ সবকিছুর পরিণতি হল জাহান্নাম।

যাদুটোনা ও এর বাস্তবতা

যাদুটোনা হল শয়তান জিনদের সহায়তায় অর্জিত একপ্রকার অপকর্ম যার প্রভাবে মানুষের মাঝে রোগ, মানসিক বিকৃতি, স্বামী কিংবা স্ত্রীর প্রতি বিরূপ মনোভাব, ভুল দেখা বা শোনা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। যাদুটোনা চর্চাকারীরা এগুলো অর্জনের জন্য শয়তান জিনদের সাহায্য চায় এবং তাদের ইবাদত করে এবং তাদের নির্দেশ
অনুযায়ী বিভিন্ন শিরকী ও কুফরী কাজ করে, ফলে এই শয়তান জিনেরা তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে সহায়তা করে থাকে।

যাদুটোনার প্রভাব

যাদুটোনার এই প্রভাব সত্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য পৃথিবীতে রোগ-শোক, ব্যথা-বেদনা, বিপদ-আপদ রেখেছেন, মানুষকে একে অপরের ক্ষতি করার ক্ষমতা দিয়েছেন, এসবের দ্বারা তিনি মানুষের ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা করে থাকেন। তেমনি তিনি এসমস্ত বিপদ-আপদ রোগশোক থেকে মুক্তির ব্যবস্থাও রেখেছেন। একইভাবে আল্লাহ পাক মানুষকে পরীক্ষার জন্য যাদুটোনা নামক শয়তানী বিদ্যার অস্তিত্বকে অনুমোদন করেছেন। আল্লাহ যাকে চান এর দ্বারা পরীক্ষা করেন, ফলে সে যাদুর দ্বারা আক্রান্ত হয়। আর আল্লাহ পাক না চাইলে যতই যাদুটোনা করা হোক বান্দার কোন ক্ষতি হবে না। আর শরীয়তের মধ্যেই যাদুটোনার প্রতিকারও রয়েছে, যার বিবরণ সামনে আসবে। মোটকথা যাদুর প্রভাব সত্য এবং এটা দুনিয়ার জীবনে মানুষের পরীক্ষার অংশ। যাদুটোনা মূলত জিনদের জগতের সাথে জড়িত শয়তানী কর্মকাণ্ড, যারা এগুলো চর্চা করে, তারা শিরক ও কুফরে লিপ্ত। আল্লাহ পাকের অনুমতি না থাকলে যাদু কারও ওপর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। আর আল্লাহ পাক যেমন যাদুটোনার অস্তিত্বকে অনুমোদন করেছেন, তেমনি তিনি এর প্রতিকারও শিখিয়েছেন।

যাদুটোনার বিধান

যাদুটোনা শেখা কিংবা চর্চা করা কুফর, যা একজন ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডীর বাইরে নিয়ে যায়, সে অমুসলিম, কাফির, মুশরিকে পরিণত হয়, পৃথিবীর জীবনে যাদুটোনা চর্চাকারীর জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর আখিরাতে সে তার কুফর ও শিরকে কারণে চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। যাদুটোনা যে কুফর বা অবিশ্বাস, তা আল্লাহ পাক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় খোদ আল কুরআনে ব্যাখ্যা করেছেন:

আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা মানুষকে যাদু শেখানোর মাধ্যমে কুফরী করেছে। আর [তারা অনুসরণ করেছে] যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, “আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা [আমাদের কাছ থেকে যাদু শেখার মাধ্যমে] কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা নিশ্চয় জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা বুঝত। আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে [তাদের জন্য] প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। (২: ১০২-০৩)


এই দুই আয়াতে উল্লিখিত যাদুটোনা কুফর হওয়ার ব্যাপারে কয়েকটি দলীল রয়েছে:১) বরং শয়তানরা মানুষকে যাদু শেখানোর মাধ্যমে কুফরী করেছে - এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে যাদুটোনা শিক্ষা দেয়া কুফর।২) আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, “আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা [আমাদের কাছ থেকে যাদু শেখার মাধ্যমে] কুফরী করো না। - এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে যাদুটোনা শেখা কুফর।৩) এবং তারা নিশ্চয় জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। - আর আখিরাতে যার কোন অংশই নেই সে হচ্ছে অমুসলিম, কাফির। ৪) যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত - অর্থাৎ তাদের ঈমান ছিল না।

Writer: Hamida Mubasshera

1 টি মন্তব্য: