পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

আত্মতৃপ্তির ভয়াবহতা

অত্যন্ত করুণাময়, বিশেষ দয়ালু আল্লাহর নামে।
উজব (عُجْب) শব্দের অর্থ ‘আত্মতৃপ্তি’, ‘আত্মগরিমা’, Self-conceit, Self-importance. [অভিধান: আল-মাওরিদ]

আজব (عَجَب) অর্থ ‘অবাক হওয়া’, ‘আশ্চর্যান্বিত হওয়া’ বা ‘তাজ্জব হওয়া’।

নিজের কাজে বা মতে নিজেই অবাক হওয়া, পরিতৃপ্ত থাকা বা আত্মগরিমায় ভোগাকে উজব বলা হয়। [অভিধান: লিসানুল আরাব][মুখতারুস সিহাহ]

উজব, আত্মতৃপ্তি বা আত্মগরিমা হলো অহংকারের একটি দিক। অহংকার সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায় যে, নিজেকে অন্য কোন মানুষ থেকে কোন দিক থেকে উন্নত, ভালো, উত্তম বা বড় মনে করা, অথবা কাউকে কোনোভাবে নিজের চেয়ে হেয় মনে করাই হলো কিবর, তাকাব্বুর বা অহংকার। এটি মূলত মানসিক অনুভূতি, তবে কাজের মধ্যে অনেক সময় তার কিছু প্রভাব থাকে।


মহান আল্লাহ (ﷻ) বলেন, লুকমান (আলায়হিস সালাম) তাঁর পূত্রকে উপদেশ দিলেন,
“অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে পদচারণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” [সূরা লুকমান, আয়াত ১৮ অনুবাদ]

আল্লাহর রসূল (ﷺ সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“যার অন্তরে অণু পরিমানও অহংকার বিদ্যমান, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”

তখন এক ব্যক্তি বলেন, “মানুষ তো ভালোবাসে যে তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক ...”

আল্লাহর রসূল (ﷺ সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
“আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালবাসেন। অহংকার (কিবর্‌) হচ্ছে সত্যকে অপছন্দ করা ও মানুষদেরকে হেয় করা।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৭]

সুতরাং অহংকার ধ্বংসের পথ। আর সবচেয়ে নোংরা অহংকার হলো নিজের ধার্মিকতা বা ভালো হওয়ার অহংকার - “উজব”। ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির কারণে বা কোন বিশেষ ধর্মীয় দলের অনুসারী হওয়ার কারণে নিজেকে অন্য কারো চেয়ে বেশি ধার্মিক মনে করা অথবা, নিজের ধার্মিকতায় সন্তুষ্টি বোধ করাই “উজব”। বস্তুত এর চেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা আর কিছুই নেই।

উজবের বড় কারণ হলো নিজের পাপ ও দুর্বলতার দিকে লক্ষ্য না করে অন্য মানুষের পাপ-অন্যায়ের দিকে দৃষ্টি দেয়া।

আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের তুলনায় আসলেই কিছু গ্রহণযোগ্য ভালো আমল করতে পেরেছি কিনা তার ঠিক নেই, যা কিছু করেছি তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়েছে কিনা তারও ঠিক নেই, মৃত্যু পর্যন্ত এ আমল ধরে রাখতে পারবো কিনা তারও ঠিক নেই, এরপরও একজন ঈমানদার কিভাবে নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি ধার্মিক বলে চিন্তা করতে পারে?! ধ্বংসের জন্য এর চেয়ে বড় পথ আর কিছুই হতে পারে না।

এজন্য হাদীস শরীফে “উজব”-কে পাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
“তোমরা যদি পাপ না করতে তাহলে আমি তোমাদের জন্য পাপের চেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়ের ভয় পেতাম - সেটা হলো উজব, সেটা হলো উজব।” [হাসান হাদীস, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ: ৬৫৮]
উজব বা আত্মতৃপ্তির একটি প্রকাশ হলো সকল মানুষের মধ্যে ত্রুটি দেখা এবং নিজে বা নিজের মতাবলম্বী ছাড়া সকলেই খারাপ পথে চলছে বলে দাবি করা।

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
“যদি কোন ব্যক্তি বলে (যদি শুনো যে, কেউ বলেছে): ‘মানুষেরা ধ্বংস হয়ে গেল’, তবে সেই সবচেয়ে বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত।” [সহীহ মুসলিম: ২৬২৩]

অহংকার, আত্মতৃপ্তি বা আত্মগরিমার আরেকটি প্রকাশ হলো ব্যক্তিগত, দলগত বা গোষ্ঠীগতভাবে অন্যান্য মানুষদের উপহাস করা, অবজ্ঞা করা। যদি সত্যিই কেউ বাহ্যিকভাবে উপহাস বা অবজ্ঞার যোগ্য হয়, তাকেও উপহাস করা যায় না; কারণ হতে পারে আল্লাহর কাছে সে উত্তম।

মহান আল্লাহ (ﷻ) বলেন,
“ওহে যারা ঈমান এনেছো! কোনো লোকদল যেন অপর লোকদলকে উপহাস-বিদ্রূপ না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে বেশি ভালো। কোনো নারী যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে বেশি ভা্লো। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপাধি দিয়ে ডেকো না। ঈমানের পর পাপী নাম পাওয়া খুবই খারাপ বিষয়। আর যারা তাওবা করে না, তারাই অন্যায়কারী।” [সূরা হুজুরাত, আয়াত ১১ অনুবাদ]

“উজব” ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর ওলী, আওলাদে রসূল, নবীগণের সন্তান, আল্লাহর সন্তান ও আল্লাহর খাঁটি আবিদ-ইবাদতকারী বলে দাবি করত। এ সকল বিষয়ে তারা তাদের বংশ, কাশফ, কারামত, ইলহাম, ইলকা ইত্যাদির দোহায় দিতো। খৃষ্টানরা এ বিষয়ে বেশি অগ্রসর ছিলো। যে কোন পাঠক খৃষ্টান সাধু ও পাদরিদের লেখা কাহিনী পড়লে এ জাতীয় অগণিত দাবি দেখবেন।

মহান আল্লাহ (ﷻ) তাদের এ সকল দাবিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করে বলেন:
“তুমি কি দেখ নি, যারা নিজেদের পরিশুদ্ধতা দাবি করে! বরং আল্লাহ যাকে চান পরিশুদ্ধ করেন আর তাদেরকে সূতা পরিমাণ জুলুমও করা হবে না। দেখো, কিভাবে তারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়। আর প্রকাশ্য পাপ হিসেবে এটিই যথেষ্ট!” [সূরা নিসা, আয়াত ৪৯-৫০ অনুবাদ]

এ জাতীয় উজব বা দ্বীনদারিতার আত্মগরিমা প্রকাশক সকল বিষয় কুরআন ও হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও দ্বীনদারিতা বোধক নাম বা উপাধি ব্যবহার নিষেধ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ (ﷻ) বলেন,
“অতএব তোমরা নিজেদের আত্মপ্রশংসা বা পরিশুদ্ধতা-পবিত্রতা বর্ণনা করো না; কার তাকওয়া আছে তা তিনি অধিক জানেন।” [সূরা নাজম, আয়াত ৩২ অনুবাদ]

যে নামের অর্থ দ্বারা ব্যক্তিকে সৎকর্মশীল, পূণ্যবান বা নেককার বুঝা যায় সে নাম রাখতে রসূলুল্লাহ (ﷺ) আপত্তি করতেন।

মুহাম্মাদ বিন ‘আমর বিন ‘আত্বা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “আমি আমার মেয়ের নাম ‘বার্‌রা’ রেখেছি...”
উম্মুল মু’মিনীন - সালমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কন্যা যায়নাব (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
“রসূলুল্লাহ (ﷺ) এই নাম রাখতে নিষেধ করেছেন - আমার নাম রাখা হয়: বার্‌রা (পুণ্যবতী)। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: ‘তোমরা নিজেদের আত্মপ্রশংসা করো না। আল্লাহ অধিক অবগত আছেন তোমাদের মধ্যে পুণ্যবান-পুণ্যবতী কে।’ তখন তাঁরা বলেন, ‘আমরা তার নাম কী রাখবো?’ তিনি (ﷺ) বলেন: ‘তার নাম রাখো যায়নাব’।” [সহীহ মুসলিম: ২১৪২]

উল্লেখযোগ্য যে, সুন্দর দেখতে একটি আরবীয় গাছের নাম “যায়নাব”। এ গাছের নামে আরবে মেয়েদের নাম “যায়নাব” রাখার প্রচলন ছিল। এ সকল নাম সৌন্দর্য প্রকাশ করে, কিন্তু ভালো আমল প্রকাশ করে না। এজন্য তিনি (ﷺ) এমন নাম রাখার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি ভালো আমল প্রকাশক নাম রাখতে নিষেধ করেন।

অতিরঞ্জিত উপাধি ব্যবহার সুন্নাহ বিরোধী কাজ। যেখানে সাধারণ “বার্‌রা” বা পুণ্যবতী নাম পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (ﷺ) রাখতে দেন নি, সেখানে বিভিন্ন গলভরা উপাধিগুলো তাঁর কাছে কত বেশি অপছন্দনীয় তা চিন্তা করুন। বস্তুত উপাধিপ্রাপ্ত ও তার অনুসারীদের মধ্যে অনিরঞ্জিত উপাধি “উজব” সৃষ্টি করে। সুন্নাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ও আমাদের রুচিকে সুন্নাত অনুসারে সংশোধন করা দরকার।

যে সকল বিষয়ে মানুষ আত্মতৃপ্তিতে ভোগে তার কিছু উদাহরণ:
অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উপর নিজের আত্মগরিমা। নিজের জ্ঞানের পরিধিকে বড় মনে করা ও এর উপর সন্তুষ্ট থাকা নিজের ধ্বংস বয়ে আনে!

নিজের ইবাদত ও ধার্মিকতায় আত্মতৃপ্তি ও গরিমা। ইবাদত যথেষ্ট করছি মনে করা এবং অন্যের চাইতে নিজেকে বেশি ধার্মিক ভাবা!

নিজের উঁচু বংশের কারণে অন্যের চেয়ে নিজেকে উত্তম মনে করা! অনেকের মাঝে এটা নিয়ে জঘন্য রকমের বড়াই থাকে।

নিজের রূপ ও সৌন্দর্যের উপর তৃপ্তি ও গরিমা দেখা যায়। বর্তমান যুগের “সেলফি” ট্রেন্ডে এই উজব খুব বেশি লক্ষ্যনীয়। এছাড়া ছেলে ও মেয়ে উভয়ের অশালীন বেপর্দা পদর্শনীর পেছনে যথেষ্ট উজব রয়েছে।

প্রাপ্ত ধন-সম্পদের উজব অনেক মানুষের রয়েছে। তারা মনে করে নিজের মালিকানায় থাকা সম্পদ আয়ে তাদের নিজের অনেক ক্রেডিট আছে!

স্বাস্থ্য ও সুঠাম দেহ নিয়ে আত্মতৃপ্তি! সমাজের মানুষের অন্যতম প্রধান সমস্যা এটি। নিজের ভাল শরীর নিয়ে অনেকে বাহবা পেতে চায়। বডি বিল্ডিং প্রদর্শনীর কথা ভেবে দেখুন কত হাস্যকর ও অহেতুক। একটি মশার কামড়ে বলিয়ানদের কী বেহাল অবস্থা হয়, তবে এই শরীর নিয়ে কিসের এত অহংকার ও তৃপ্তি?

এরপর রয়েছে বুদ্ধিমত্তা, চাতুরতা ও স্মার্টনেস নিয়ে আত্মগরিমা! এগুলো অহংকার বৃদ্ধি এবং অন্যকে হেয় করার অন্যতম উৎস।

পদমর্যাদা, নেতৃত্ব, দল, বন্ধুবান্ধব, অনুসারী, ‘ফেইসবুক ফলোওয়ার’ ইত্যাদি নিয়ে লোকদের জঘন্য আত্মতৃপ্তি আছে।

সবশেষে উল্লেখ করছি নিজের রায়, মতামত, অপিনিয়ন নিয়ে উজব! এগুলো নিয়ে প্রচুর মানুষ এমনকি অনেক বাহ্যত ধার্মিক মানুষদেরও আত্মগরিমা দেখা যায়। অন্যের ভিন্ন মতামত বেশ কিছু ক্ষেত্রে সহনীয় পর্যায়ের হলেও আত্মগরিমায় ভোগা লোকেরা ভিন্ন মত ও ভিন্ন মতের মানুষকে বেশ হেয় করে থাকে!

মহান আল্লাহ (ﷻ) আমাদেরকে এ সকল উজব থেকে রক্ষা করুক। আমীন।

আল্লাহর প্রদত্ত সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এর উপর। আল্লাহর হামদ-প্রশংসার মাধ্যমে এই আহ্বান শেষ করছি।


লিখেছেন: আরাফাত হুসাইন 

কোন মন্তব্য নেই