পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

বিয়ের আগে যেসব বিষয়ে চিন্তা করে নেয়া উচিত

অনেকে বলেন, বিয়ের আগে প্রস্তুতি বা চিন্তাভাবনার আবার কি আছে? কিন্তু এখনকার সময়ে চারপাশে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় বিয়ের মাধ্যমে বন্ধনের সংখ্যা যেমন বেশি তেমনি ভাঙ্গনের ঘটনাও অনেক বেশি। বেশি বয়সে বিয়ে হওয়ায় অনেকেরই ব্যক্তিজীবনের অনেক স্বভাব, আচার-ব্যবহার আর চরিত্র আর পরিবর্তন হয় না বলে দু'জনের পার্থক্যগত ব্যবধান বাড়তেই থাকে -- একসময় তা বিবাহবিচ্ছেদে রূপ দেয়। যে মানুষ দু'জন অনেক আশা-স্বপ্ন নিয়ে বন্ধন গড়ছেন, তাদের বিয়ে ভেঙ্গে যাক -- এটা শয়তান ছাড়া আর কেউ চায় না। অবশ্য অনেক সময় অমিলের বিয়ের কারণে অন্যায়, অত্যাচার ও পাপের মাত্রা বেড়ে যেতে থাকে তাই বিচ্ছেদ অনেক ভালো সমাধান।

তবে আমরা তো মুসলিম ভাইবোনদের মাঝে সুন্দর বিয়ে হোক সেটাই চাই। তাই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে চিন্তা করে নিজেদেরকে গুছিয়ে নেয়া, চিন্তাগুলোকে সাজিয়ে নেয়া, নিজের চাওয়া ও পাওয়াগুলো নিরীক্ষা করে আগালে স্বাস্থ্যকর একটি দাম্পত্য সম্পর্ক গঠনে সুবিধা হবে বলে বিশ্বাস করি। এখনকার সময়ে যারা বলে যে বিয়ের আগে চিন্তাভাবনা করার তেমন কিছু নেই, তারা নিরেট মূর্খ এবং আকাট অপদার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়।


বিয়ের ব্যাপারটা যদিও অনেক অনেক বিষয় মিলে হয়, তাতে দু'জন মানুষ এবং দু'টি পরিবারের বন্ধন হয় বলা যায়, তাই অনেক কিছুই খেয়াল করা প্রয়োজন। বিয়েতে মানুষের জীবনের, সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা আলাদা বিষয় গুরুত্ব পেয়ে যায় -- কিন্তু সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নয় বরং ছোট ছোট কিছু বিষয় তুলে ধরবো যেগুলো চিন্তা করলে আপনার জন্য চিন্তা করতে সুবিধা হবে ইনশা আল্লাহ।

১) আপনার চাওয়া ও আকাঙ্খা নিয়ে আলাপ করে নিন: মানুষ হিসেবে আমাদের অনেকেরই অনেক চাওয়া আছে, যার সবগুলোতেই একজন মানুষ কম্প্রোমাইজ করতে পারে না। আপনি আপনার সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর সাথে সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করুন। আপনি কোন বিষয়ে ছাড় দিতে পারবেন না আর কোন বিষয়গুলো আপনার পছন্দ তা বলুন। হয়ত পছন্দের সবই আপনি তার কাছ থেকে পাবেন না, অন্তত তিনি চেষ্টা করবেন। আর যেসব বিষয় রাতারাতি অর্জন করা যায় না এবং আপনি তাতে ছাড় দিতে পারবেন না -- এমন বিষয় থাকলে নিষ্পত্তি করে নিন। নয়ত বিয়ের পর এইসব নিয়ে সাংসারিক জটিলতা শুরু হবে।
২. দু'জনের সম্মিলিত উদ্দেশ্য নিয়ে আলাপ করুন: একজন মানুষের সাথে আপনি আপনার গোটা জীবনটা শেয়ার করতে যাচ্ছেন। আপনি আপনার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে আলাপ করুন। তিন-চার বছর পর আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান। আলাপ করুন আপনি ক'জন সন্তান পেতে চান। জীবনে কোন কাজগুলো আপনার পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম হিসেবে নিজের কোন দক্ষতাগুলো আপনি দ্বীন প্রচারে ব্যবহার করতে চান, তা নিয়ে অপরজনের সাথে আলাপ করুন। উদ্দেশ্য নিয়ে এই আলাপ দু'জনকে জানতে ও পরস্পরের প্রতি ধারণা পরিস্কার করতে সাহায্য করবে।

৩. সুন্দর উপায়ে কথা বলা এবং দ্বন্দ্ব নিরসন করা শিখুন: আপনার সুন্দর করে, গুছিয়ে আর সুন্দর শব্দ দিয়ে বলা কথাগুলা জীবনসঙ্গীর জন্য খুবই স্বস্তিকর হবে। প্রিয়জনকে কিছু সুন্দর অনুভূতি কি উপহার দিতে চাননা? সৌজন্যতা শিখুন। অনুশীলন করুন। অনেকসময় আপনার মন খারাপ থাকলে দেখবেন আপনার প্রিয় মানুষটার একটু কথাই আপনার হৃদয়কে আনন্দে উদ্বেল করবে। আপনার মুখের কথা বলে দেয় আপনার হৃদয়ের কথাগুলো, তাই অন্তরকে পরিচ্ছন্ন আর ঝলমলে রাখুন। প্রিয়জনদের সাথে কথাবার্তায় আন্তরিকতা নিয়ে আসুন। বিষয়টাতে নজর দিন। সুন্দর কথা বলা মানুষের জীবনের এক অভাবনীয় কল্যাণ। বিষয়টাকে অবজ্ঞা করবেন না। হতে পারে আপনার চাঁছাছোঁলা কথার তীব্রতা আর ধার আপনার জীবনসঙ্গীর জন্য কষ্টের কারণ হবে। হয়ত তিনি আপনার উপরে আগ্রহ হারাবেন। সেই খারাপ পরিস্থিতি আমরা নিশ্চয়ই চাইনা...
৪. জীবনসঙ্গীর দ্বীনদারী সম্পর্কে জেনে নিন: যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তার সম্পর্কে ভেবে নেয়ার জন্য এই বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যাপারে আপনার অবহেলা, আপনার উপেক্ষা আপনাকে সীমাহীন আফসোসের দিকে ঠেলে দিবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যে মানুষ আল্লাহকে ভয় করে না, সে আর কাউকে সমীহ করে না। যে আল্লাহকে ভয় করে না, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে স্যাক্রিফাইস করে না জীবনে সে কখনই তার 'কমফোর্ট জোনের' বাইরে সংসারের জন্য বা আপনার জন্য তেমন কিছুই করতে আগ্রহী হবে না। অন্যদিকে যে মানুষটা আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেকে বদলে দিয়েছেন, নিজের পছন্দকে ত্যাগ করে আল্লাহর পছন্দকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, এমন মানুষ ইনশা আল্লাহ আপনার জীবনের জন্য কল্যাণকর হবে।

দ্বীনদারী দেখার অনেক উপায় থাকতে পারে, আছে। অভিজ্ঞ এবং স্কলাররা সেই বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, যে মানুষটির সাথে আপনার বিয়ের আলাপ শুরু হয়েছে, তার জীবনে আল্লাহর দ্বীনকে চিনতে পেরে তিনি কতটুকু বদলেছেন নিজেকে, তা দেখে নিবেন। ধরুন কোন মানুষ হয়ত ছোট থেকেই দ্বীনের উপরে ছিলেন একটু-আধটু, তবুও যখন তিনি বুঝতে শিখলেন, তিনি অবশ্যই ইসলামকে নতুন এক মাত্রায় চিনবেন এবং সেই উপলক্ষে তার জীবনেও পরিবর্তন আসতে বাধ্য। তবে এখনকার সময়ে আমাদের সমাজে যারাই ইসলামকে জীবনবিধান হিসেবে মেনে নিয়েছেন, তারা অনেক বেশি কষ্ট-যন্ত্রণার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং তাদের জীবনেও অজস্র পরিবর্তন এসেছে।
আপনার সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী পুরুষ হলে খোঁজ নিয়ে জেনে নিতে পারেন তিনি মসজিদে নামাজে নিয়মিত কিনা। কর্মস্থলে, ইউনিভার্সিটিতে ফরজ নামাজে কেউ নিয়মিত হলে পরিচিতরা তার সেই পরিচয় পেয়ে যান। একইভাবে একটা মুসলিমাহ মেয়ের হিজাব বা নিকাব একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তিনি এটা কীভাবে দেখেন তা জেনে নিবেন। ছেলে হলে দাড়ি রাখা সম্পর্কে তার মতামত শুনে নিতে পারেন। আপনার সম্ভাব্য সঙ্গীর মতামত জেনে নিতে পারেন মিউজিক সম্পর্কে, কনসার্ট, সুদী ব্যাংকিং, মেয়েবন্ধু বা ছেলেবন্ধু থাকার বিষয়ে, সেলেব্রিটি ও নায়ক-নায়িকা-মুভি নিয়ে। এছাড়া ইসলামী জীবনব্যবস্থা নিয়ে তিনি কী চিন্তা করেন, নিজে তিনি কীভাবে ইসলামের জন্য অবদান রাখতে চান সেইসম্পর্কে জেনে নিবেন।
ব্যক্তিগত আলাপের সুযোগ হলে জেনে নিতে পারেন তিনি কুরআন কতটুকু মুখস্ত পারেন। কুরআন নিয়ে তার স্বপ্ন কী এবং তার জন্য কতখানি কী করেছেন তিনি জীবনে। নামাজ এবং কুরআন নিয়ে ঢিলেমি থাকা কোন মুসলিমের উচিত নয়। এছাড়া মুসলিমদের বিয়ে সম্পর্কে তার পরিকল্পনা, মোহরানা, বিয়ে নিয়ে তার ধারণা। ছেলে হলে স্ত্রীর প্রতি তার কর্তব্য সম্পর্কে এবং মেয়ে হলে স্বামীর প্রতি তার কর্তব্য সম্পর্কে ইসলাম কী বলে তা তিনি জানেন কিনা তা জেনে নিবেন। দ্বীনদারী দেখেই বিয়ে করা উচিত। আল্লাহ আপনার দু'হাত কল্যাণে ভরে দিবেন ইনশা আল্লাহ।

লিখেছেন - সাফওয়ান

1 টি মন্তব্য: