পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

নিউরাল বেসিস অফ হলি 'রেইনট্রি'


পর্ব-১
.
রেইনট্রির ঘটনার দায় কার সে আলোচনায় কোনো আগ্রহ নাই। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে সব কিছুর মূল খোঁজার অভ্যাস থেকে আগ্রহ জন্মালো ঘটনার পিছনের সাইন্স বের করার। চোখ বন্ধ করে বা বাহ্যিক কিছু আলামত দেখেই কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলে দেয়াটা সমীচীন নয়। রেইনট্রির ঘটনার বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আগে আমাদের জানা দরকার, কলা-বিজ্ঞানী আর সেক্যুলারদের দাবি অনুযায়ী নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নাই, কথাটার আদৌ বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি আছে কি?

.
বিজ্ঞানের মতে সেক্সচুয়াল বিহেভিয়ার প্যাটার্ন নারী ও পুরুষে ভিন্ন। একজন নারী ও পুরুষের মধ্যকার চিন্তা-ভাবনা, অ্যাকশন অনেকটাই আলাদা। নারী ও পুরুষের জৈবিক চাহিদা হলো ব্রেইনের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা ক্রিয়ার চরম অবস্থা। ব্রেইনের লিম্বিক সিস্টেমের এমিগডালা, হিপ্পোক্যাম্পাস ও লিম্বিক লোব মূলত জৈবিক ক্রিয়ায় ইনভল্ভ থাকে। জৈবিক চাহিদার উৎপত্তির জায়গা একই হলেও এক্টিভেশন ও রিঅ্যাকশন প্যাটার্ন নারী পুরুষে আলাদা হয়ে থাকে। ব্রেইনের এমিগডালা অংশ, যা সেক্স হরমোন ধারণ করে, নারীদের থেকে পুরুষে ১৬ শতাংশ বড় হয়ে থাকে। জৈবিক অনুভূতি জাগ্রত করার ক্ষেত্রে এমিগডালার এক্টিভেশন মূল ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ভিজ্যুয়াল জৈবিক উদ্দীপক (যেমন, নগ্ন ছবি অথবা পর্ন) প্রদর্শনে নারী ও পুরুষে আলাদা জৈবিক আগ্রহ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনুমিতভাবে পুরুষের ক্ষেত্রে আগ্রহ ও প্রতিক্রিয়া নারীদের থেকে অনেক বেশি। ২০০৪ সালের নেচার নিউরোসায়েন্স সাময়িকীতে একটা গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে গবেষকরা দেখিয়েছেন একই ধরণের ভিজ্যুয়াল জৈবিক উদ্দীপক ব্রেইনের এমিগডালা অংশকে নারীদের থেকে পুরুষদের অনেকগুন্ বেশি এক্টিভেট করে। এমনকি বিভিন্ন ধরণের উদ্দীপকের ক্ষেত্রে ব্রেইনের বিভিন্ন অংশ এক্টিভেট হওয়ার ক্ষেত্রেও নারী পুরুষে ভিন্নতা আছে।
.
উপরের বৈজ্ঞানিক তথ্য এটাই প্রমান করে, নারী ও পুরুষের চিন্তা চেতনায় অনেক পার্থক্য। মেয়ে ও ছেলে বন্ধুরা একই ধরণের হাস্যরস, খুনসুটি, কৌতুক, ছিনেমার গল্প একই সময়ে একই স্থানে বসে শুনলে বা করলেও এটা ভাবার অবকাশ নাই যে তাদের সবার ব্রেন এই কাজগুলোকে একই রকমভাবে ইন্টারপ্রেট করছে। ছেলেদের ভিজ্যুও-পার্সেপশনাল এবিলিটি, ইন্টারপ্রেটেশন ক্ষমতা ও প্যাটার্ন মেয়েদের থেকে আলাদা।
.
পর্ব-২
.
জৈবিক আকাঙ্খা জাগ্রত হয় সেক্স হরমোন নির্গমনের মধ্য দিয়ে, পুরুষের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরোন হরমোন আর নারীর ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন। টেস্টোস্টেরোন হরমোন পুরুষের যৌনতা, ডোমিনেন্স, এগ্রেসিভনেস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। যারা বলে ছেলে মেয়ে একসাথে বসে গল্প করার সাথে যৌনতার সম্পর্ক কি? এমনকি কেউ এমন প্রশ্ন করলে তাকে চূড়ান্ত অসামাজিক আবার ব্যাক ডেটেড মনে করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিন্তু উল্টো কথা বলে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েদের উপস্থিতি ছেলেদের টেস্টোস্টেরোনের মাত্রা ৭.৮% বাড়িয়ে দেয় এমনকি মেয়েটি দেখতে কদাকার হলেও। নারীর মাত্র ৫ মিনিটের উপস্থিতি পুরুষের লালায় টেস্টোস্টেরোনের মাত্র বাড়িয়ে দিতে পারে। 'Rapid endocrine responses of young men to social interactions with young women' শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে একটা ছেলে যখন একটা মেয়ের সাথে একাকী গল্পগুজব করে তখন সেই ছেলের লালায় টেস্টোস্টেরোনের পরিমান অন্য আরেকটি ছেলের সাথে একাকী সময় কাটানোর থেকে বেশি।
.
বন্ধুদের আড্ডায় যে ছেলেটিকে প্রাণবন্ত, ইম্প্রেসিভ ও অনেক খোলামেলা মনে হয়, যার কথা আপনাকে মুগ্ধ করে অথবা আপনি (মেয়ে) বুঝতে পারেন যে ছেলেটি আপনাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছে, ধরে নিতে পারেন এর পিছনে ছেলেটির হাই টেস্টোস্টেরোন লেভেল কলকাঠি নাড়ছে। 'Men with elevated testosterone levels show more affiliative behaviours during interactions with women' শিরোনামে আরেকটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ফিমেল ইন্টারএকশনের মাধ্যমে টেস্টোস্টেরোনের মাত্রা বেড়ে গেলে ছেলেদের বিহেভিওরাল পরিবর্তন আসে। কথায় মুগ্ধতা, চিত্তাকর্ষক আচরণ, নিজেকে মেলে ধরা ইত্যাদি দিকগুলো বেশি ফুটে উঠে। গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে ইন্ট্রাসেক্সচুয়াল কম্পিটিশনে ছেলেদের টেস্টোস্টেরোনের মাত্রা বাড়ার ফলে মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ আগের থেকে বৃদ্ধি পায়। এমনকি পরবর্তীতেও এর কার্যকারিতা বহাল থাকে ফলে দেখা যায় ছেলেরা আগের থেকে বেশি হাসছে, নিজেকে উপাস্থপনের ক্ষেত্রেও অতিরঞ্জন করছে , মেয়েদের প্রতি চোখাচোখির পরিমান বেড়ে যাচ্ছে। মজার বিষয় হলো কম্পিটিশনটা যখন ছেলেদের নিজেদের মধ্যে থাকে তখন কোনো ছেলের মধ্যে এই ধরণের পরিবর্তন চোখে পড়ে না।
.
অনেকে হয়তো ভাবছেন, সুন্দর হাসি বা ঢং করে কথা বলা বা আড্ডা জমিয়ে রাখা ছেলেদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরোনের মাত্রা বাড়লেও যারা একটু বদমেজাজি, রাগী তাদের মধ্যে এই সব জৈবিক হরমোনের কোনো প্রভাব নাই, তাই তাদের সাথে মেলা মেশায় সমস্যা নাই। আপনাকে হতাশ করে দেয়া এই স্টাডিতে 'The presence of a woman increases testosterone in aggressive dominant men' বলা হয়েছে যারা দীর্ঘদিন যাবৎ সঙ্গীহীন বা রোমান্টিক সম্পর্কে নাই তাদের এগ্রেসিভ আচরণ ও ডোমিনেন্সির মূলকারণ উচ্চ মাত্রার টেস্টোস্টেরোন।
.
মূলকথা ও অপ্রিয় সত্য হলো, নারীর উপস্থিতি পুরুষের জৈবিক হরমোনাল রেগুলেশনের মূল অনুঘটক। আজকে আমাদের আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার মূল উদ্ধার করতে গলদঘর্ম হওয়ার মূল কারণ নারী ও পুরুষের যে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে সেই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া। এর আগের আমরা জেনেছি নারীদের ক্ষেত্রে জৈবিক ক্রিয়ার মেকানিজম পরুষের থেকে আলাদা। একই ঘটনা, একই জিনিস একই সময়ে একই স্থানে ঘটলেও পুরুষের ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া নারীদের থেকে আলাদা। একটা মেয়ে যখন ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়, তখন মেয়েটার দৃষ্টিভঙ্গি একরকম থাকে আর অধিকাংশ ছেলেরা ব্যাপারটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়, এর পিছনে যে বৈজ্ঞানিক কারণ আছে তা ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা।শুধু আবেগ আর ট্রেন্ড ফলো না করে বাস্তবতা ও সত্যটাকে মেনে নিয়ে পথ চললে এসব দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে থাকা খুবই সম্ভব।
.
পর্ব-৩
.
আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, নারী ও পুরুষের হরমোনাল রেগুলেশন ও তাদের এক্টিভেশন প্যাটার্ন আলাদা। পুরুষের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার জন্য যেমন নারীর উপস্থিতি ভূমিকা পালন করে তেমনি নারীদের এস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন বেড়ে যাওয়ার পিছনেও অল্পবিস্তর হলেও পুরুষের উপস্থিতি ভূমিকা পালন করে। পার্থক্য হলো, পুরুষের বিহেভিওরাল সাইকোলজি নারী থেকে আলাদা।
.
এখন প্রশ্ন হলো, প্রাকৃতিকভাবে পুরুষের আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা, পারিপার্শিক পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হওয়া কি তাদের অনৈতিক কাজের বৈধতা দেয়? বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলো যে নারীর উপস্থিতি পুরুষের মনকে প্রভাবিত করে, এর মানে কি তাহলে পুরুষেরা স্বনিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাবে? এবং সব দায়ভার নারী ও চারপাশের পরিবেশের উপরে চাপাবে? অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ একটি বিষয়। মোটাদাগে বলতে হবে, অবশ্যই পুরুষেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে চলবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই 'নিয়ন্ত্রণের' মাত্রাটা কেমন হবে? এটা কে নির্ধারণ করবে? কেউ যদি চায় পুরুষ সবসময় ও যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে সেটা হবে অন্যায় ও অবিচারমূলক আবদার। একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থাই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। এমনকি আইন প্রয়োগ করেও এটা দূর করা সম্ভব নয়। স্ট্যাটিসটিক্স অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ সংগঠিত হওয়া দেশগুলোর আইন পরিস্থিতি বাকি বিশ্বের থেকে ভালো।
.
নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টি ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণের অন্য কোনো উপায় নেই। প্রভোকেটিভ আচরণ পরিহার করলে বিপরীত লিঙ্গের অতি আক্রমণাত্মক ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ দূর হতে পারে। বাস্তবতা হলো, ফেমিনিস্টরা যতই চিল্লা ফাল্লা করুকনা কেনো, তাদের কোনো ক্ষমতা বা প্রভাব নেই এই অবস্থা উত্তরণের ক্ষেত্রে। স্বাধীনতার নামে আমি যা খুশি তা করবো এবং এর ফলাফল ভোগ করবো না এটা সম্পূর্ণ বাস্তবতা বিবর্জিত। সাধারণত ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসীরা এই ধরণের অনৈতিক আচরণ থেকে দূরে থাকে। কোনো প্রচলিত আইন বা শাস্তির ভয়ে নয়, বিশ্বাসের জায়গা থেকে তারা এসব পরিহার করে। ধর্মীয় জীবন যাপনে অভ্যস্ততা আনতে পারলে সমাজে প্রচলিত অনেক অন্যায় ও অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

লেখকঃ সাইফুর রহমান

অফিসিয়াল ওয়েব সাইট ঃ shottokothon.com  এবং response-to-anti-islam.com

ফেসবুক পেজঃ fb.com/shottokothon1

কোন মন্তব্য নেই