পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

মালাকাত আইমানুহুম - মারিয়া কিবতিয়া (রা)


.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আল্লাহ্‌র বান্দা এবং রাসূল মুহাম্মদ এর পক্ষ থেকে কিব্‌ত প্রধান মুকাওকিসের প্রতি-
.
সালাম তার উপর যে হিদায়াতের অনুসরণ করবে। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ্‌ আপনাকে দ্বিগুণ সওয়াব দান করবেন। কিন্তু যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে কিবতীগণের পাপ আপনার উপরেই বর্তাবে। 
.
হে কিবতীগণ! একটি বিষয়ের দিকে আসো -যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান। তা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো মুসলিম।’ 

হুদাইবিয়া সন্ধির পর রাসূল (সা.) বিভিন্ন অঞ্চলের সম্রাট ও গভর্নরদের চিঠি পাঠানো শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি এই পত্রটি পাঠান মিশরের বায়জেন্টাইন গর্ভনর জুরাইজ বিন মাত্তার নিকট। তার পদবী ছিল ‘মুকাওকিস’। জুরাইজ চিঠিটি খুব সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন। তিনি তা হাতির দাঁতের তৈরি একটি বাক্সে রাখলেন এবং তাতে সীলমোহর লাগিয়ে তা যত্ন সহকারে রাখতে একজন দাসীকে নির্দেশ দিলেন। তারপর রাসূল (সা.) এর পত্রের জবাবে লিখলেন-
.
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ্‌র প্রতি কিব্‌ত প্রধান মুকাওকিসের পক্ষ থেকে-
আপনি আমার সালাম গ্রহণ করুন। অতঃপর আপনার পত্র আমার হাতে এসেছে। পত্রে উল্লেখিত কথাবার্তা ও দাওয়াত আমি উপলব্ধি করেছি। এখন যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে সে বিষয়ে আমার ধারণা রয়েছে। আমার ধারণা ছিল যে, শাম রাজ্য থেকে উনি আবির্ভূত হবেন। 
আমি আপনার প্রেরিত লোকের যথাযোগ্য সম্মান ও ইজ্জত করলাম। আপনার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ দুটি দাসী প্রেরণ করলাম। কিবতীদের মধ্যে যারা বড় মর্যাদার অধিকারিণী। অধিকিন্তু, আপনার পরিধানের জন্য কিছু পরিচ্ছদ এবং বাহন হিসেবে একটি খচ্চর পাঠালাম উপহার হিসেবে। আপনার খিদমতে পুনরায় সালাম পেশ করলাম।[১] 
.
আজকের লিখা মুকাওকিসের পত্রের “আমার গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ দুটি দাসী প্রেরণ করলাম” এই অংশ থেকে শুরু। উল্লেখিত দাসী দুইজনের নাম হচ্ছে মারিয়া এবং শিরীন। রাসূল (সা.) নিজের জন্য মারিয়া (রা.) কে রাখেন এবং শিরীনকে হাস্‌সান বিন সাবিত (রা.) এর কাছে দিয়ে দেন। দুইজনই সম্ভ্রান্ত বংশের নারী ছিলেন। সমালোচকরা প্রশ্ন করতে পারেন যে, সম্ভ্রান্ত হলে তারা আবার দাসী কী করে হয়?
বনী ইসরাইলে নিজ সন্তানকে প্রার্থনালয়ে সেবার জন্য উৎসর্গ করে দেয়ার প্রথা ছিল। কুর’আনে এর উল্লেখও রয়েছে। মরিয়াম (আ.) এর মা হিন্না বিনতে ফাকুয আল্লাহ্‌র নিকট দুয়া করেছিলেনঃ 
“হে আমার পালনকর্তা! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত।” [ সূরা আলি ইমরান (৩):৩৫] 
.
খ্রিষ্টানদের কাজই ছিল ইহুদীদের প্রথাগুলোকে বিকৃত করা। ইহুদীরা শুধু উপাসনালয়ের জন্য উৎসর্গ করলেও খৃষ্টানরা নিজ সন্তানদের দাসী হিসেবে ধর্ম-যাজকদের উপহার দিত। যাতে করে তারা দাসী হিসেবে সেবা করতে পারে। যাজকরা চাইলে তাদের ভিন্ন কাজেও ব্যবহার করতে পারতেন। সম্ভবত মারিয়া এবং শিরীন উচ্চ বংশের হয়েও এ কারণেই পিতামাতা কর্তৃক দাসী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। 
.
“দাসী” শব্দটা শুনে যারা আঁতকে উঠেছেন এবং এটা ইসলাম কর্তৃক আবিষ্কৃত বর্বর(!) কোন প্রথা কিনা সেটা নিয়ে ভাবনায় হারিয়ে যাচ্ছেন তাদের কিছু ইতিহাস পাঠ জরুরী। সাধারণত সবাই দাসী বলতে ইংরেজি “Concubine” কে বুঝে থাকে। মূলতঃ Concubine বলতে এমন কাউকে বুঝানো হয় যার নিচু সামাজিক মর্যাদার কারণে তাকে বিয়ে করা সম্ভব হয় না কিন্তু শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়।[২] বাংলায় এদের রক্ষিতা কিংবা যৌনদাসী বলা হয়। এ প্রথার শুরু প্রাচীন চীনে। সেখানে একজন পুরুষ তার সামাজিক পদ-মর্যাদা অনুযায়ী যত খুশি তত রক্ষিতা রাখতে পারতো।[৩] গ্রীসে রক্ষিতাদের মর্যাদা এতোটাই নীচে ছিল যে তারা মালিকের স্ত্রীদের সাথে একই ছাদে থাকতে পারত না।[৪] 
ইহুদী ও খৃষ্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে শত্রুপক্ষের কুমারী নারীদের দাসী বানাতে বলা হয়েছে-
.
“সমস্ত মিদিয়নীয় পুরুষদের হত্যা করো। সমস্ত মিদিয়নীয় স্ত্রীদের হত্যা করো যাদের কোন পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক ছিল। কিন্তু যেসব যুবতী নারীরা কোন পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেনি তাদের বাঁচিয়ে রাখো।[৫] 
.
শুধু তাই না বাইবেল অনুসারে, একজন পিতা চাইলে তার কন্যাকে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দিতে পারে। আর একবার দাসী হিসেবে বিক্রি করা হলে সে কোন ভাবেই মুক্তি পাবে না। ইসলাম এই বর্বর প্রথাগুলোকে সংশোধন করেছে।[৬] বাইবেল অনুসারে, সুলাইমান (আ.) এর ৭০০ জন স্ত্রী এবং ৩০০ জন রক্ষিতা ছিল।[৭] হিন্দু ধর্মগ্রন্থেও দাসীদের কথা উল্লেখ রয়েছে।[৮] 
.
ইসলামে একজন মালিক চাইলে তার দাসীকে শুধু পরিচারিকা হিসেবে ঘরে রাখতে পারে। আবার চাইলে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। আল্লাহ্‌ বলেন-
“যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না। কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে সীমালংঘনকারী হবে। [সূরা মুমিনুন (২৩): ৫-৭] [৯]
.
যদি কোন নারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং বন্দী হয়, তবে সে দাসী হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে তার দাসত্বের মূল কারণ হচ্ছে কুফর। যাতে সে সৃষ্টির উপাসনা থেকে স্রষ্টার উপাসনার দিকে যেতে পারে। এছাড়া রাসূল (সা.) এর যুদ্ধনীতি ছিল যে, যেসব নারী ও শিশুরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তাদের আক্রমণ না করা। জিযিয়া কর দেয়ার শর্তে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামিক রাষ্ট্রে বসবাস করতে দেয়া। তাই দাস-দাসীতে পরিণত করার প্রশ্নই আসছে না এখানে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি নারী আর শিশুদের আক্রমণ না করতে সাহাবীদের নির্দেশ দিতেন। 
ইসলাম দাসীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে অনেক শর্ত ও বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। যেমনঃ গর্ভবতী নারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না।[১০] দুই বোন কিংবা মা-কন্যার সাথে একসাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না।[১১] যদি নারীর সাথে স্বামীও বন্দী হয় তবে তার সাথে মিলিত হওয়া যাবে না।[১২] দাসীকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দিলে তার গুপ্তাঙ্গের দিকে তাকানোও যাবে না।[১৩] 
.
যুদ্ধে বন্দীদের কথা শুনলেই এই আধুনিক সময়ে আমাদের মাথায় ভেসে আসে- কিছু নারী যুদ্ধক্ষেত্রে ছোটাছুটি করছে, বিজিত সৈন্যরা অট্টহাসি দিয়ে তাদের ধাওয়া করছে। যদিও এটা আমাদের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন কিন্তু সত্যি হচ্ছে যে, পরাজিত হলে নারীরা যে দাসীতে পরিণত হবে সেটা মেনে নিয়েই তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আসতো। এমনকি তারা খুব সুন্দর করে সেজে আসতো যাতে তাদের ভাগ্যে ভালো কেউ জোটে। ইতিহাসবিদ স্যামুয়েল বার্ডার লেখেন-
.
“প্রাচীনকালে যেসব নারীরা তাদের পিতা কিংবা স্বামীর সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতো, তারা খুব সুন্দর জামা আর অলঙ্কার পড়তো। যাতে বন্দী হলে তারা বিজিতের দৃষ্টি খুব সহজেই কাড়তে পারে।”[১৪] 
ইসলামে দাসীর কনসেপ্ট একেবারেই আলাদা। প্রথমত প্রশ্ন আসতেই পারে, ইসলাম এই দাসী করার প্রথাটাকেই একেবারে বিলুপ্ত করেনি কেন? এরকম প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে কারণ আমরা আধুনিক কালের সমাজব্যবস্থা দিয়ে প্রাচীনকালকে পরিমাপ করি। সেসময়ে সব নারীদের ভাগ্য খাদিজা (রা.) এর মতো ছিল না যে নিজেই ব্যবসা করে তারা জীবিকা নির্বাহ করবে। যুদ্ধে বন্দী নারীদের হাতে দুইটি পথ খোলা ছিল- হয় পালিয়ে গিয়ে পতিতা হয়ে বেঁচে থাকা নতুবা বন্দী হয়ে অধীনস্থের পতিতা হয়ে যাওয়া। ইসলাম নারীদের জন্য এসব থেকে অনেক মর্যাদার সন্ধান দিয়েছে। 
.
ইসলামে একজন নারী দাসী হলেও তাকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হয়। তার সন্তানেরা নিজ স্ত্রীদের মতোই উত্তরাধিকার লাভ করে। মালিক চাইলে দাসীকে বিয়ে করতে পারে। দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে এবং এর ফলে উক্ত নারী সন্তান জন্ম দিলে তাকে অন্য কারো নিকট বিক্রি করা যাবে না। তাকে তখন “উম্ম ওয়ালদ” বলা হবে। আর সন্তান জন্মের মাধ্যমে সে মুক্ত হয়ে যাবে। কোন দাসী যদি মুক্তি চায় তবে আল্লাহ্‌ তায়ালা তাকে মুক্ত করে দিতে মুসলিমদের উৎসাহিত করেছেন। শুধু তাই না মুক্ত করার সময় তাদের একবারে নিঃস্ব অবস্থায় না ছেড়ে কিছু অর্থ দান করতেও বলেছেন। পূর্বে একজন নারীর সাথে যেমন অনেক পুরুষ মিলিত হতে পারতো, ইসলাম এমন জঘন্য রীতিকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে-
.
“তোমাদের অধিকারভুক্তদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে তোমরা লিখিত চুক্তি কর যদি জান যে, তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে। (মুক্ত করার সময়) আল্লাহ তোমাদেরকে যে অর্থ-কড়ি দিয়েছেন, তা থেকে তাদেরকে দান কর। তোমাদের দাসীরা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের সম্পদের লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য কারো না। যদি কেউ তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করে, তবে তাদের উপর জোর-জবরদস্তির পর আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আল কুর’আন, সূরা নূর(২৪):৩৩] 
প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই প্রথাটির উপর যখন অন্য ধর্মগুলো কেবল কাঠিন্যই আরোপ করেছে, তখন ইসলামের এই বিধানগুলো নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। ইসলামী নীতিমালায় সমাজে দাস-দাসী বৃদ্ধি পাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বরং ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। 
.
ইসলাম দাস-দাসীদের বিনা কারণে প্রহার করাও হারাম করেছে। সাহাবী আবু মাসউদ (রা.) একবার এক দাসকে প্রহার করছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে একটি কণ্ঠ বলে উঠলো, “হে আবু মাসউদ! মনে রেখো তোমার এই দাসের উপর যতোটা না কর্তৃত্ব রয়েছে, আল্লাহ্‌র তোমার উপরে তার চেয়ে অনেক বেশী কর্তৃত্ব রয়েছে।” আবু মাসউদ (রা.) পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন কণ্ঠটি রাসূল (সা.) এর। তিনি ভীত হয়ে বললেন, “আমি আল্লাহ্‌র জন্য তাকে মুক্ত করে দিলাম।” তখন রাসূল (সা.) বললেন, “তুমি যদি তা না করতে তবে জাহান্নামের আগুন তোমার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যেতো।”[১৫] 
শুধু তাই না, স্ত্রীর সাথে যেমন স্বামীর জোর করে সহবাস অনুত্তম, দাসীর সাথেও জোরে করে সহবাস করাটাকে অনুত্তম বলা হয়েছে।[১৬] 
অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের আর্মিরা আমাদের বোনদের যে লাঞ্ছনার শিকার করেছে তা নাকি ইসলামসম্মত ছিল! বরং ইসলাম অনুযায়ী, তাদের সবকিছুই ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের জুলুম। আর ইন শা আল্লাহ্‌ আমাদের রব, যিনি ন্যায় বিচারক, জালিমদেরকে এসবের প্রতিদান দুনিয়া আর আখিরাতে দান করবেন।
কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় সকল স্কলারই একমত যে, রাসূল (সা.) এর দুইজন দাসী ছিল।[১৭] একজনের নাম মারিয়া (রা.), অপরজনের নাম রায়হানা (রা.)। কেউ কেউ আবার বলেছেন, রাসূল (সা.) প্রথমে তাদের দাসী হিসেবে গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে মুক্ত করে বিয়ে করেছেন। মারিয়া (রা.) কে নিয়ে ইসলাম বিদ্বেষীরা একটি মিথ্যা ঘটনা প্রচার করে থাকে। সেটা নিয়ে আলোচনার পূর্বে সূরা আত-তাহরীমের প্রথম তিনটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এখন এটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও পরবর্তীতে পাঠকরা এর গুরত্ব বুঝতে পারবেন। আল্লাহ্‌ বলেনঃ
.
১) “হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্যে যা হালাল করছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়। 
২) আল্লাহ তোমাদের জন্যে কসম থেকে অব্যহতি লাভের উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাদের মালিক। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। 
৩) যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন, তখন স্ত্রী বললেনঃ কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেন, যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন। 
৪) তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখো আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তু ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী।”
.
সহীহ বুখারীতে এ আয়াতসমূহের প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি ঘটনা বর্ণিত রয়েছে। রাসূল (সা.) মিষ্টি ও মধু ভালোবাসতেন। তিনি যয়নাব বিনতে জাহশ (রা.) এর ঘরে মধু পান করতেন। এ কারণে তিনি তার ঘরে কিছুটা বিলম্ব করতেন। এই জন্যেই আয়েশা (রা.) ও হাফসা (রা.) পরামর্শ করেন যে, তাদের মধ্যে যার কাছেই রাসূল (সা.) প্রথমে আসবেন, তিনি যেন রাসূল (সা.) কে বলেন যে, “আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের[১৮] গন্ধ আসছে। সম্ভবত আপনি মাগাফীর খেয়েছেন।” তাই রাসূল(সা.) তাদের নিকটে আসলে তারা এ কথাই বললেন। রাসূল (সা.) মুখে দূর্গন্ধ থাকাটাকে খুবই অপছন্দ করতেন। তাই তিনি বললেন, “আমি যয়নাবের ঘরে মধু খেয়েছি। আমি শপথ করছি যে, আর কখনো মধু খাবো না।” তিনি তাঁর এই শপথের কথা অন্য কারো নিকট প্রকাশ করতে নিষেধ করলেন। কারণ সবাই যদি জানতে পারে রাসূল (সা.) নিজের জন্য মধু হারাম করেছেন, তাহলে প্রত্যেকেই নিজের জন্য মধু হারাম করে নিবে। 
৩য় আয়াতে “নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি কথা গোপনে বললেন” বলতে রাসূল (সা.) এর এই মধু পান না করার শপথের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর দু’জন স্ত্রী বলতে বোঝানো হয়েছে আয়েশা (রা.) এবং হাফসা (রা.) কে।[১৯] 
.
রাসূল (সা.) নিষেধ করলেও একজন স্ত্রী তা অপরজনের নিকট প্রকাশ করে দেয়। আল্লাহ্‌ তায়ালা আয়াত নাযিল করে রাসূল (সা.) কে এ কথা অবহিত করেন। রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে উক্ত স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে যে স্ত্রী কথাটি প্রকাশ করেছেন তিনি খুবই অবাক হন এবং জানতে চান যে, কে রাসূল (সা.) কে এ ব্যাপারে জানিয়েছেন? তখন রাসূল (সা.) জবাব দেন, “যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন।”
যেহেতু নবীদের স্ত্রীদের নিকট এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়, তাই আল্লাহ্‌ তায়ালা আয়াত নাযিল করে তাদেরকে তিরস্কার করেন এবং সংশোধনের নির্দেশ দেন। 
.
এই চারটি আয়াতের প্রেক্ষাপট নিয়ে আরেকটি ঘটনা সীরাত ও তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাটি মারিয়া (রা.) কে কেন্দ্র করে। তাফসীরে ইবনে জারিরে রয়েছে, হাফসা (রা.) এর ঘরে তার পালার দিনে রাসূল (সা.), মারিয়া (রা.) এর সাথে মিলিত হন। এতে হাফসা (রা.) দুঃখিতা হন যে, তার ঘরে তার পালার দিনে তারই বিছানায় রাসূল (সা.) কিনা মারিয়া (রা.) এর সাথে মিলিত হলেন! রাসূল (সা.) তখন হাফসা (রা.) কে সন্তুষ্ট করার জন্য বললেন, “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে দিলাম। তুমি এ কথা কাউকে জানিয়ো না।” কিন্তু হাফসা (রা.) এ ঘটনাটি আয়েশা (রা.) কে জানিয়ে দিলে আল্লাহ্‌ তায়ালা এ আয়াতসমূহ নাযিল করেন।
এ ঘটনা সম্পর্কে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, “এটি একটি গারীব উক্তি। সম্পূর্ণ সঠিক কথা হলো যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হবার কারণ ছিল রাসূল (সা.) এর নিজের উপর মধুকে হারাম করা।”[১৯] 
.
রাসূল (সা.) এক স্ত্রীর পালা অন্যকে দিবেন এটা তাঁর নীতির বিরুদ্ধে ছিল। আয়েশা (রা.) কে তিনি সবচেয়ে ভালোবাসলেও অন্য কোন স্ত্রীর পালা আয়েশা (রা.) কে দিতেন না। একবার অন্য এক স্ত্রীর পালার দিনে আয়েশা (রা.) তাঁর নিকটে আসলে তিনি বলেন, “ আয়েশা! আমার কাছ থেকে দূরে থাকো! আজকে তোমার দিন না।”[২০] 
.
এটা খুব আশ্চর্যের যে, ইসলাম বিদ্বেষীরা সহীহ বুখারীর একটি সহীহ বর্ণনাকে উপেক্ষা করে গারীব উক্তিকে আঁকড়ে ধরছে কুৎসা রটানোর জন্য। এমনকি তারা গারীব ঘটনাটিতেও নিজেদের কথা যুক্ত করে। তাদের ভার্সন অনুযায়ী- রাসূল (সা.) মিথ্যা বলে হাফসা (রা.) কে বাবার বাড়ী পাঠিয়ে দেন। তারপর হাফসা (রা.) এর ঘরে প্রবেশ করে হাফসা (রা.) এর দাসী মারিয়া (রা.) এর সাথে মিলিত হন। এদিকে হাফসা (রা.) বাবার বাড়ী থেকে যখন নিজ গৃহে প্রবেশ করে রাসূল (সা.) কে নিজ দাসীর সাথে দেখতে পান তখন প্রচণ্ড রেগে যান। রাসূল (সা.) তাকে শান্ত করেন এবং এ ঘটনাটি কাউকে বলতে নিষেধ করেন। কিন্তু হাফসা (রা.) এ ঘটনাটি প্রকাশ করে দিলে সব স্ত্রীকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য রাসূল (সা.) সকল স্ত্রীর সাথে এক মাস দেখা করবেন না বলে শপথ করেন। 
এ গল্পটি চূড়ান্ত পর্যায়ের মিথ্যাচার। এ গল্পের সমর্থনে সহীহ হাদীস দূরে থাকুক কোন জাল হাদীসও নেই। এখানে বলা হয়েছে, হাফসা(রা.) এর দাসী ছিলেন মারিয়া (রা.)। অথচ মারিয়া (রা.) ছিলেন রাসূল (সা.) এর দাসী যাকে কিনা মিশরের মুকাওকিস উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। 
এক মাস দেখা না করার যে শপথের কথা বলা হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা। ইতিহাসে এটি “ঈলার ঘটনা” নামে পরিচিত। আমরা জানি, রাসূল (সা.) অত্যন্ত সাদা-সিধে জীবনযাপন করতেন। আয়েশা (রা.) এর ভাষায়- টানা তিনদিন নবী পরিবারে খাবার জুটেছে কখনো এমনটা হয়নি। তিনি আরো বলেছেন- মাসের পর মাস চুলোয় আগুন জ্বলতো না। শুকনো খেজুর আর পানিতেই দিন কাটতো। উম্মুল মুমিনীনরা সবসময় দুনিয়ার চেয়ে আখিরাতকেই বেশী প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু তারাও মানুষ ছিলেন। তাই সংসারের খরচ বাড়াতে তারা বারবার রাসূল (সা.) কে বারবার পীড়াপীড়ি করতেন। এ নিয়ে কিছুটা মনমালিন্যের প্রেক্ষিতে তিনি এক মাস স্ত্রীদের সাথে দেখা করবেন না বলে শপথ করেন।[২০] এ ঘটনার সাথে মধু নিয়ে শপথ করার ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই। 
.
মারিয়া (রা.) কে নিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম, তাকে নিয়েই শেষ করি। রাসূল (সা.), মারিয়া(রা.) কে খুব পছন্দ করতেন। তিনি রাসূল (সা.) কে একটি ছেলে সন্তান উপহার দিয়েছিলেন। এ জন্য তাকে বলা হয় “উম্ম ওয়ালাদ”। ছেলে সন্তান জন্মানোর খবর রাসূল (সা.) এর নিকট পৌঁছালে তিনি বলেন, “তার সন্তান তাকে মুক্ত করে দিয়েছে।”[২১] ছেলেটির নাম ছিল ইব্রাহীম (রা.)। তিনি কেবল ষোল মাস বেঁচেছিলেন। তার মৃত্যুতে কিছু মুনাফিক বলাবলি করেছিল, “মুহাম্মদ আল্লাহ্‌র নবী হলে তার ছেলে এভাবে মারা যেতো না।”। অথচ ইব্রাহীম (রা.) এর জন্মের বহু আগেই সূরা আহযাবে আল্লাহ্‌ বলেছেন-
.
“মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।” [ সূরা আহযাব(৩৩):৪০]
এখানে আরবী “رجل” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি। সুতরাং ইব্রাহীম (রা.) যদি বয়ঃপ্রাপ্ত হতেন, তবে কুর’আনের এই আয়াত ভুল প্রমাণিত হতো। তাই শিশু ইব্রাহীম (রা.) এর মৃত্যুই প্রমাণ করে কুর’আন আল্লাহ্‌র বাণী আর মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ্‌র রাসূল। 
ইব্রাহীম (রা.) যেদিন মারা যান, সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। সবাই বলাবলি শুরু করলো, “ইব্রাহীমের মৃত্যুর কারণে সূর্যগ্রহণ হয়েছে।” রাসূল (সা.) যদি সত্যিই ভণ্ড নবী হতেন তবে তার জন্য এটা খুব সুবর্ণ সুযোগ ছিল। উনি বলতে পারতেন, “আমি আল্লাহ্‌র নবী! আমার ছেলের মৃত্যুতে যদি সূর্যগ্রহণ না হয়, তবে কার মৃত্যুতে হবে?” কিন্তু তিনি এই কুসংস্কারকে চিরতরে বিনষ্ট করে বললেন, “সূর্য ও চন্দ্র মহান আল্লাহ্‌র দু‘টি নিদর্শন। কারো মৃত্যুর কারণে এগুলোর গ্রহণ হয় না।” 
.
রাসূল (সা.), ইব্রাহীম (রা.) এর মৃত্যুতে কেঁদেছিলেন আর করেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, “চোখ অশ্রুসিক্ত, হৃদয় ব্যথিত। তবুও আমরা এমন কিছু বলি না যা আমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করে।”
যারা ইসলামে বর্বর দাস-প্রথা নিয়ে বিশাল সব লেখা লেখেন তারা কি জানেন মৃত্যুর আগে সবাইকে উদ্দেশ্য করে রাসূল (সা.) বারবার কি বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন- 
“সলাত এবং তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসী (এদের ব্যাপারে যত্নবান হও)।” 
.
=====
লেখকঃ শিহাব আহমেদ তুহিন [ফেসবুক id: Shihab Ahmed Tuhin]
#সত্যকথন
.
====
তথ্যসূত্রঃ
[১] আর রাহেকুল মাখতুমঃ আল্লামা শফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহ.) – পৃষ্ঠা ৪০৬
[৩] Shi Fengyi (1987): Zhongguo gudai hunyin yu jiating -Marriage and Family in ancient China. Wuhan: Hubei Renmin Chubanshe, p. 74.
[৪] James Davidson. Courtesans and Fishcakes: The Consuming Passions of Classical Athens. pp. 98–99.
[৫] Holy Bible- Book of Numbers: Chapter 31, verse 17-18 
[৬] Holy Bible- Book of Exodus: Chapter 21, verse 7
[৭] Holy Bible- 1 kings : Chapter 11, verse 3
[৮] Mahabharata 4:72
[৯] এছাড়া দেখুন, আল কুর’আন- সূরা নিসা ৪:২৪, সূরা আযহাব ৩৩:৫০, সূরা মাআরিজ ৭০:৩০
[১০] সুনান আবু দাউদ, ৩/১৬১
[১১] মুয়াত্তা মালিক, ২/১৪৪-৪৫, রেওওয়ায়েত ৩৩ -৩৫
[১২] কিতাবুস সিয়ারুস সাগীর (ইংরেজী অনুবাদ),অধ্যায় ২, অনুচ্ছেদ ৪৫, পৃষ্ঠা ৫১,
[১৩] সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৪১১৩ 
[১৪] Oriental Customs Or, an Illustration of the Sacred Scripture, Williams and Smith, London, 1807 vol.2 p.79, no. 753
[১৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ৪০৮৮ 
[১৭] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া- হাফিজ ইবনে কাসির(রহ.) [পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৭-৫০২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন]
[১৮] মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে। 
[১৯] তাফসীর ইবনে কাসীর, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৫৫৯ 
[২০] সীরাতে আয়েশা-সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভী(রহঃ), পৃষ্ঠা ১৪৯
[২১] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া- হাফিজ ইবনে কাসির(রহ.) [পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৭-৫০২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন]

অফিসিয়াল ওয়েব সাইট ঃ shottokothon.com  এবং response-to-anti-islam.com

ফেসবুক পেজঃ fb.com/shottokothon1

কোন মন্তব্য নেই