পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

সঙ্কীর্ণ বস্তুবাদী দর্শনে 'প্রকৃতি' এবং 'ইসলাম'


নাস্তিক এবং সেকুলারিস্টরা অনেক সময় তাদের নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে প্রকৃতিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। তারা দাবি করে, মানুষ হিসাবে ভালো ও মন্দের পার্থক্য করার জন্য প্রকৃতির দিকে তাকানোই যথেষ্ট। মানুষও অন্য দশটা পশুর মতোই। তাই মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তির অণুসরণ করলেই সুন্দর, স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। 

তারা প্রায়ই বলে, ধর্ম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির উপর হস্তক্ষেপ করে, স্বাভাবিক কামনা-বাসনা চরিতার্থ করায় বাঁধা দেয়। ধর্ম মানুষকে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত করতে চায়। আর এজন্যই ধর্ম ব্যক্তিগত জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। 

কোন কোন বিষয়গুলোকে ‘প্রাকৃতিক’, ‘সহজাত’, কিংবা ‘স্বাভাবিক’ ধরা হচ্ছে, কীভাবে এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, এ ব্যাপারগুলো তারা সযত্নে এড়িয়ে যায়। 

‘প্রাকৃতিক’ বলতে কী বোঝায় – এ প্রশ্নের ব্যাপারে চিন্তা করলে আমাদের অধিকাংশের মাথায় ধরাবাঁধা নির্দিষ্ট কিছু ছবি ভেসে উঠে। কোলাহলপূর্ণ শহর আর সবুজ শ্যামল তৃণভূমির মধ্যে কোনটি বেশি প্রাকৃতিক? ক্যান্ডিবার আর সালাদের মধ্যে কোনটি বেশি প্রাকৃতিক? আমরা সবাই কিছু জিনিসকে প্রাকৃতিক এবং কিছু জিনিসকে কৃত্রিম বা ম্যান মেইড হিসেবে জানি। 

কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবেন যে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমের মধ্যে এ পার্থক্য তেমন তাৎপর্যপূর্ণ না। মানুষ যদি আর দশটা প্রাণীর চেয়ে বেশি কিছু না হয়, তাহলে মানুষের বানানো স্থাপনা, সরঞ্জাম, বাড়িঘর ইত্যাদিকে কেন প্রাকৃতিক হিসেবে গণ্য করা হবে না? কেন দালানকোঠা প্রাকৃতিক ন্য,কিন্তু পিঁপড়ার বাসা প্রাকৃতিক? 

আসলে,কোন বিষয়টা প্রাণী আর জড় বস্তুকে আলাদা করে? সব পশুই কি অণু-পরমাণুউর কিছু নির্দিষ্ট অণু-পরমাণু আর বিন্যাসের ফলাফল না? যে অণু-পরমাণু দিয়ে পশুরা তৈরি, সে একই অণু-পরমাণু দিয়ে কি গাছপালা,নদী নালা, পাহাড়-পর্বত, সাগরের ঢেউ, হারিকেন ইত্যাদি তৈরি না? সবকিছু তো সেই একই অণু পরমাণুর সমষ্টি। আর যদি তাই হয় তাহলে সাইক্লোনের কারণে ধানক্ষেত ধ্বংস হয়ে যাওয়া আর পঙ্গপালের ঝাঁকের মাধ্যমে সেই একই ধানক্ষেত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মাঝে মৌলিক পার্থক্য কী? আর এ দুটোর সাথে মানুষের মাধ্যমে কোন ধান ক্ষেত ধ্বংস হয়ে যাবার মৌলিক পার্থক্য কী? 

সঙ্কীর্ণ বস্তুবাদী দর্শন আপনাকে এধরনের উপসংহার টানতে বাধ্য করে। কিন্তু এধরনের চিন্তা ও উপসংহার যে মানুষকে নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) ও ধ্বংসবাদের (Nihilism) দিকে ঠেলে দেয়, এটা নাস্তিক এবং সেক্যুলারিস্টরাও বোঝে। কিন্তু এধরণের চিন্তা ভাবনার মধ্যে যে অনেক ভুল-ত্রুটি রয়েছে তা নাস্তিক এবং সেকুলারিস্টরা ভালমতই জানে। তাই এধরনের বিষয়ে যে জটিলতা বিদ্যমান তা অস্বীকার করে এবং প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিমতা’র মাঝে দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে (যা কিনা তাদের চিন্তা ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত) তারা তাদের বক্তব্যকে জোরালো করতে চায়। 
বাস্তবতা হল, বস্তুবাদী দর্শনের আলোকে চিন্তা করে, কেবল “প্রকৃতি” বা “প্রাকৃতিক” – এর আশ্রয় নিয়ে মানব অস্তিত্বের কোন বিশেষ অর্থ বা মূল্য খুঁজে বের করা সম্ভব না। একটা বিভ্রান্তি তৈরি করা যায় কেবল। আর এ বিভ্রান্তি, কোনটা প্রাকৃতিক আর কোনটা না, এ প্রশ্নের একটি সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত উত্তর আছে, প্রচলিত এই ভুল ধারণার উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যেমন ধরুন, সবুজ তৃণভূমি আর সালাদ যে প্রাকৃতিক এ নিয়ে সন্দেহের কোন সুযোগ নেই !

কিন্তু বস্তুবাদী দর্শনের অবস্থান থেকে খুব সহজেই বেশ কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া যায়।যেমনটা আমরা দেখলাম। এখন পর্যন্ত কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নেই যে পরীক্ষায় ‘প্রাকৃতিক’ বলে কোন ফলাফল পাওয়া যায়। মাইক্রোস্কোপের মধ্যে দিয়ে সবুজ মাঠ বা সালাদের দিকে তাকালে ‘প্রাকৃতিক’ নামের কোন লেবেল অথবা ফলাফল আপনি পাবেন না। 

তার মানে কি বাস্তবে প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক বলে কিছু নেই?
এখানেই অস্তিত্বের দর্শন (Ontology) এবং মেটাফিযিক্স গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি অস্তিত্বের ব্যাপারে নাস্তিক ও সেকুলারিস্টদের প্রচারিত বস্তুবাদী দর্শন কখনই মজবুতভাবে প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম-এর মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখতে পারে না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে কী বলে?

প্রকৃতির ধারণার পরিবর্তে ইসলাম আমাদের সৃষ্টি ও স্রষ্টার কথা বলে। সৃষ্টি ও স্রষ্টার ধারণা সরাসরি জানিয়ে দেয় যে, আমাদের চারপাশের জগত কোন চিরন্তন, এবং শাশ্বত সত্তা নয়, যার অস্তিত্ব থাকা অপরিহার্য, যার অস্তিত্ব ছাড়া অন্য কোন অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব না। বরং এক অর্থে ‘প্রকৃতির’ কোন অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ প্রকৃতি এমন কোন স্বয়ংক্রিয় ও স্বাধীন সত্তা না যা একটা ফাঁকা ক্যানভাসের মতো নিরন্তর বিদ্যমান। বরং মহাবিশ্ব এবং মহাবিশ্বে যা কিছু আছে সবই স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্ট। সব কিছুর এক মূহুর্ত থেকে তার পরবর্তী মূহুর্ত পর্যন্ত টিকে থাকা নির্ভর করে স্রষ্টার ইচ্ছার ওপর। তাঁর ইচ্ছার কারণেই সব কিছুর অস্তিত্ব সম্ভবপর হয়।

সুতরাং একেবারে গোড়া থেকেই বস্তুবাদী দর্শন এবং ইসলামের অবস্থানের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আমরা যদি আরও গভীরে যাই তাহলে তা আরও পরিষ্কার হয়। নিচের আয়াত গুলোর বক্তব্য নিয়ে চিন্তা করে দেখুন - 

সাত আসমান, যমীন আর এগুলোর মাঝে যা আছে সব কিছুই তাঁর মহিমা ঘোষণা করে। এমন কোন জিনিসই নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তোমরা বুঝতে পার না কীভাবে তারা তাঁর মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরম সহিষ্ণু, বড়ই ক্ষমাপরায়ণ। [আল-ইসরাইল, আয়াত ৪৪, (১৭:৪৪)]

“নিশ্চয় আমি আসমানসমূহ, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত পেশ করেছি, অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছে এবং এতে ভীত হয়েছে। আর মানুষ তা বহন করেছে। নিশ্চয় সে ছিল অতিশয় যালিম, একান্তই অজ্ঞ।“ [আল-আহযাব, আয়াত ৭২, (৩৩:৭২)]

“যখন তারা পিপীলিকার উপত্যকায় আসল তখন একটি পিপীলিকা বলল- ‘ওহে পিঁপড়ার দল! তোমাদের বাসস্থানে ঢুকে পড়, যাতে সুলাইমান ও তার সৈন্যবাহিনী তাদের অগোচরে তোমাদেরকে পদপিষ্ট ক’রে না ফেলে।” [আন-নামল, আয়াত ১৮, (২৭:১৮)]

“অতঃপর হুদহুদ অবিলম্বে এসে বলল- ‘আমি যা অবগত হয়েছি আপনি তা অবগত নন, আমি সাবা থেকে নিশ্চিত খবর নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।”[আন-নামল, আয়াত ২২, (২৭:২২)]

আরও অসংখ্য হাদিসে পাথর যা অনুভব করতে পারে, গাছের কান্না, পাহাড়ের ভালোবাসা ইত্যাদি বর্ণনা এসেছে। অস্তিত্বের এ দর্শন এমন জগতের কথা বলে যা স্রষ্টার নিরত উপাসনায় মগ্ন সৃষ্টি দ্বারা পূর্ণ। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে সব কিছুর সাপেক্ষে, এবং এ সব কিছুর জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে যদি আমরা ‘প্রাকৃতিক’– কে সংজ্ঞায়িত করি, তাহলে স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ করা, একমাত্র তাঁরই ইবাদত করাই মানুষের জন্য সবচেয়ে ‘প্রাকৃতিক’। 

কুরআনের দিকে তাকালে মানুষ ও মানব অস্তিত্বের ব্যাপারে আমরা অন্যান্য আরো বক্তব্য পাই - 

‘নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং সবরের’। [আল-আসর, আয়াত ২-৩, (১০৩:২-৩)]

‘সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ ত্বরাপ্রবণ’।[আম্বিয়া,আয়াত ৩৭,(২১:৩৭)]

‘মানুষ তো সৃজিত হয়েছে ভীরুরূপে’। [মায়া’রিজ,আয়াত ১৯, (৭০:১৯)]

‘তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ'। [বাকারাহ,আয়াত ১৮৭, (২:১৮৭)]

আর অবশ্যই আমরা ফিতরাতের কথা পাই যা হল মানবজাতির মৌলিক স্বাভাবিক প্রবণতা যার বর্ণনা বিভিন্ন হাদিসে এসেছে, যেমন – 

“প্রত্যেক মানুষ ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে তারপর তার বাবা মা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা যাদুকর বানায়, যেমনিভাবে প্রত্যেক পশু নিখুঁত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে তোমরা কোন খুঁত দেখতে পাও কি?” [সহিহ বুখারি, হাদিসঃ ১২৯২, সাহিহ মুসলিম ২৬৫৮]

ইসলামের দর্শন দূরে থাকুক, আমাদের শুধু ফিতরাত নিয়ে আলোচনা করলেই খন্ডের পর খন্ড ঢাউস বই হয়ে যাবে। নৈতিকতা ও রাজনীতি নিয়ে আজকের চলমান আলোচনাকে বোঝার জন্য বস্তুবাদী দর্শন আর ইসলামের অবস্থানের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্যগুলো বোঝা অত্যন্ত জরুরী। কারণ শেষপর্যন্ত ব্যক্তির নৈতিকতা তার জীবনবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও অস্তিত্বের দর্শনের ওপরই নির্ভর করে। ভালো ও মন্দের সংজ্ঞা মৌলিক ভাবে মহাবিশ্ব, এর অস্তিত্ব এবং এ মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থা ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। আমরা মুসলিমরা যদি অজান্তে বস্তুবাদী অবস্থান গ্রহণ করি তাহলে তা আমাদেরকে নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে ফেলবে।

অন্যদিকে আমরা যদি ইসলাম ও বস্তুবাদের মধ্যেকার পার্থক্যগুলো ভালভাবে জানি তাহলে নাস্তিক এবং সেকুলারদের তর্কের ধরণ, তাদের লজিকাল ফ্যালাসি এবং বিশেষ করে তাদের ভুল ব্যবহৃত রেডিমেইড যুক্তিগুলোর ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পারব ইনশা আল্লাহ্‌।

লেখক – ড্যানিয়েল হাকিকাতজু
অনুবাদ – সত্যকথন ডেস্ক

অফিসিয়াল ওয়েব সাইট ঃ Click Here  এবং Click Here

ফেসবুক পেজঃ Click Here

কোন মন্তব্য নেই