পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

বহুবিবাহ ও একটি পর্যালোচনা


পৃথিবীর প্রতিটি সমাজেই বহুবিবাহ প্রচলিত আছে। পশ্চিমাদেশে যেভাবে বহুবিবাহ করা হয় তাকে বলে সিরিয়াল পলিগাইনি। মানে প্রতি ৫-১০ বছর পরপর বৌ পরিবর্তন। উৎকৃষ্ট উদাহরণ ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেলানিয়া তাঁর ৩ নাম্বার স্ত্রী।

বয়স হয়ে গেলেই বৌ পরিবর্তনের পাশাপাশি উপপত্নী বা মিস্ট্রেস রাখার প্রচলনও জনপ্রিয়। ফ্রান্সে এটিকে খারাপ চোখে দেখা হয়না। বিবিসির এক ডকুমেন্টারিতে দেখেছিলাম যে স্বামীকে তাঁর স্ত্রী মতামত দিচ্ছেন তার মিস্ট্রেসদের ব্যাপারে।

আগে কোলকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোতেও উপপত্নী রাখার প্রচলন ছিল। যারা লালবাগ কেল্লা দেখতে গিয়েছেন তারা দেখেছে মুঘাল সম্রাটদের উপপত্নীদের মহল।

যাই হোক যা বলছিলাম, একসাথে একের অধিক সঙ্গী লিগালি রাখার কনসেপ্টটি এখনো আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত সমাজে ট্যাবু হয়ে আছে। তবে নিম্ন এবং অতি-উচ্চবিত্তের মাঝে ব্যাপারটা কিন্তু অত আন-কমন না।

আমাদের দেশে বিত্তবানদের মাঝেও অনেকেই আছেন যাঁদের একাধিক স্ত্রী। আর উচ্চবিত্তের বহুগামিতার উদাহরণ এরশাদ। আমাদের সমাজে এরশাদের মত অনেকেই আছে যদিও এগুলো তেমন প্রকাশ্যে আসেনা। অনেক সময় দেখা যায় মারা যাবার পর এসকল কথা প্রকাশ পায় এবং ওয়ারিশদের মাঝে গণ্ডগোল লেগে যায়।

এর বাইরে আলেম শ্রেণীর মাঝেও বেশ কিছু ব্যাক্তিকে চিনি যাঁদের একাধিক স্ত্রী আছে। তবে যেহেতু বেশী চিনিনা তাই বলতে পারিনা এটি এই শ্রেণীতে কমন কিনা।

আমার পরিচিত এক নেশাখোর ছেলে একবার গাড়ি চাপা দিয়ে এক লোককে মেরে ফেলেছিল। নিহতের পরিবারের সাথে মোটামুটি একটা ফয়সালা যখন হয়ে এসেছে তখন আরেকগ্রুপ এসে হাজির। তাদের দাবী তারা নিহতের দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। এবং তাদেরও মোটা ডিমান্ড আছে। মানে সেই এক কাণ্ড।

আর নিম্নবিত্তদের মাঝে অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহ হয়। এরা বিয়ে ১৮-২০ বছর বয়েসেই বিয়ে করা শুরু করে। দুই একটি বাচ্চা হলে ঐ বৌ ছেড়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে ফেলে। এরপর বৌ ভরণপোষণের জন্য দরজায় দরজায় নালিশ দিয়ে বেড়ায়। আমি যখন গারমেন্টেসে বসতাম তখন এমন বেশ কয়টি কেস হ্যান্ডেল করতে হয়েছিল। নিম্নবিত্তের মাঝে বিয়ে রেজিস্টার করার প্রচলন কম বলে এরা ইচ্ছে মত বিয়ে করে এবং ছাড়ে। আমাদের বাসায় এক দারওয়ান ছিল তার সম্ভবত ১০+ বৌ ছিল বিভিন্ন গ্রামে। তার জ্বালায় গৃহপরিচারিকারা অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল।

এর বাইরে পরকীয়া আছেই। যদিও তা বোঝা কঠিন তবে বিভিন্ন হোটেল বা গেস্ট হাউযগুলোর ম্যানেজারদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় এর বিস্তার। আর যারা লিভ টুগেদার করেন তারাও কিছু পরপরই পার্টনার পরিবর্তন করে ফেলেন, অবশ্য এটাই তাদের প্রাথমিক গোল ছিল, নয়ত তারা তাদের সহবস্থানেকে একটি লিগ্যাল বাইন্ডিং এ আনতেন।

বাস্তবতা হল পুরুষের বহুগামিতা কোন না কোন ফর্মে সমাজে ছিল এবং থাকবেই। কোন ফর্মে থাকবে এটি হল প্রশ্ন। সব পুরুষ বিয়ে করবেনা বা সব পুরুষ একধিক সঙ্গী খুজবেনা। তবে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একের অধিক সঙ্গী খুঁজবে।

২০১১ বাংলাদেশের সালের শুমারি অনুযায়ী ২০-৩৪ বছর, এই এইজ গ্রুপের তথ্য

Age Group 20-24 Male 5 777 370 Female 7 522 419
Age Group 25-29 Male 6 225 252 Female 7 254 256
Age Group 30-34 Male 5 079 106 Female 5 420 659
(source Bangladesh Bureau of Statistics)

তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে বিয়ের স্বাভাবিক এজ গ্রুপে মেয়েদের চাইতে ছেলের সংখ্যা প্রায় ৩২ লক্ষ কম।

যে সকল ছেলে আছে তাদের সকলেই বিবাহযোগ্য হবেনা। বাংলাদেশের স্ট্যাটিস্টিক্স পেলামনা তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের এভারেজ হিসেব হল ৪৮% পুরুষ বিয়ে করার উপযুক্ত হয়ে থাকে। বাকিররা ড্রাগ অ্যাডিকশান, শারীরিক ত্রুটি, কর্মহীনতা, কারাবন্দীত্ব , যোগ্যতার অভাব সহ বিভিন্ন কারণে বিয়ে করার উপযুক্ত হয়না।

বিপরীতে বিবাহযোগ্য মেয়ের সংখ্যা বেশী থাকে, কারন যেহেতু মেয়েরা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কম নিযুক্ত হয় তাই পঙ্গুত্ব বরন কম করে, অপরাধ প্রবনতা কম তাই কম কারাবন্দিত্ব এবং সাধারণভাবে আয়ক্ষমতা বিয়ের হিসেবে আসেনা। ড্রাগ অ্যাডিকশানও মেয়েদের মাঝে তুলনামূলক হারে অনেক কম।

ফলে দেখা যাচ্ছে বিয়ের উপযুক্ত প্রায় ৭০- লক্ষ থেকে ১.১০ কোটি মেয়ে সঙ্গী খুঁজে পাবেনা। এবং এই চিত্র বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমি কিছু বছর বিভিন্ন এনজিওর সাথে কর্মজীবী নারীদের উপর কিছু কাজ করেছিলাম। তখন দেখেছি গার্মেন্টস শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, শ্রমজীবী নারিদের অধিকাংশই অবিবাহিতা বা বিয়ের কিছুদিন পরেই স্বামী চলে/মারা গিয়েছে। সঠিক নাম্বার বলা কঠিন তবে ৬০% এর উপরে হবে। সমাজের উপরের শ্রেণীতেও তালাক এবং উপযুক্ত পাত্র না পাবার কারণে সঙ্গিহীন নারীর সংখ্যা বাড়ছে।

উচ্চশিক্ষিতা পাত্রীদেরও বিয়ের উপযুক্ত পাত্র পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একজন পি এচ ডি করা মেয়ে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষায় সমকক্ষ বা ভাল পাত্র চাইবে। বিপরীতে উচ্চশিক্ষিত পাত্ররা উচ্চশিক্ষিত পাত্রীর চাইতে ২০-২৫ বছরের মেয়েদের প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে এই শ্রেণীতে অনেক মেয়ে উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাবেনা।

বিভিন্ন কারণে বর্তমানে ডিভোর্সের সংখ্যা বেড়েছে। এবং আমাদের দেশের কন্টেক্সটে ডিভোর্সি মেয়েদের আবার বিয়ে দেওয়া বেশ দুরহ ব্যাপার। ফলে অধিকাংশ তালাকপ্রাপ্তাদের বাকি জীবন একলা কাটাতে হচ্ছে।

একটি সমাজে যদি স্বাভাবিকরীতিতে চলে তাতে বিবাহযোগ্য মেয়ের সংখ্যা বিবাহ যোগ্য পুরুষের চাইতে বেশী থাকবে, কারণ ২০-৪০ বছরের পুরুষদের মৃত্যুহার বেশী। ঝুঁকিপূর্ণ জীবন, মাদকাসক্তি, অপরাধ প্রবণতা, কাজের চাপ, দুর্ঘটনা ইত্যাদি কারণে। যুদ্ধবিগ্রহ হলে এই পার্থক্য অনেক বেড়ে যাবে কারণ বহু তরুণ এতে প্রাণ হারাবে।

বিভিন্ন সমাজ বিভিন্নভাবে এই সঙ্গিহীন তরুণীর সমস্যার নানা ভাবে সমাধান দিয়েছে। যেমন প্রাচীন ভারতে তারা মেয়েদের দেবতা, গাছ, হনুমান, কুকুর ইত্যাদির সাথে বিয়ে দিত। কিছু মেয়েকে দেবদাসী বানানো হত। বিধবাদের পাঠিয়ে দেয়া হত পতিতালয়ে বা কাশীতে। সতীদাহ নামে পুড়িয়ে মারার মত প্রথাও চালু ছিল।

প্রাচীন আরবে মেয়েদের শিশু অবস্থায়ই মেরে ফেলা হত।

ইউরোপে এবং আমেরিকায় এখন সুগার ড্যাডি, ট্রাভেল বাডির কালচার হট। সুগার ড্যাডি হল বিত্তবান পুরুষ যারা মূলত অল্প বয়সী তরুণীদের "অভিভাবকের" ভূমিকা ন্যায় যেমন তাদের টিউশান ফি, হাতখরচ, ঘর ভাড়া দিয়ে দেয়। বিনিময়ে কি ন্যায় তা হয়ত বুঝিয়ে বলা দরকার হবেনা। নানা রকম ওয়েবসাইট আছে যেখানে বিত্তবান পুরুষের ট্রাভেল করতে যাবার সময় একজনকে সাথে নিয়ে নেয়।

ইসলাম যেহেতু মাটির নিচের আর আসমানের উপরের ধর্ম না, সেহেতু এটা স্বাভাবিক এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা থাকবে। সেটা আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক।

বিয়ে এবং বহুবিয়ে একটি সামাজ প্রথা এবং এটি একেক সমাজ একেকভাবে ইমপ্লেমেন্ট করবে। বিভিন্ন আরব এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে এটি তেমন কোন ব্যাপার না। আমেরিকার এক শ্রেণীর খ্রিস্টানদের মাঝেও বহুবিবাহ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার।

মালায়শিয়াতেও ব্যাপারটি মোটামুটি এক্সেপ্টেড বিশেষ করে যে অঞ্চলগুলোতে শরিয়া জারি আছে।
আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে এটি এখনো একটি ট্যাবু বিষয় হয়ে আছে বিভিন্ন ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক কারণে। অবশ্য কেবল যে বহুবিবাহ ট্যাবু হয়ে আছে তা না, বিধবা বিয়ে, বেশী বয়সের মেয়েকে বিয়ে করা, তালাকপ্রাপ্তাকে বিয়ে করা সমাজে মোটামুটি নিষিদ্ধ আপেলের সমতুল্য।

আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যেহেতু সামর্থ্য বাড়ছে তাই স্বাভাবিকভাবেই এক শ্রেণীর পুরুষ একধিক সঙ্গী খুঁজবেন। তাই এনিয়ে আলোচনা হওয়া ভাল যে পুরুষের বহুগামিতা কি ফর্মে থাকবে সমাজে। তবে আমি মনে করি আলোচনাটির ব্যাপ্তি আরকেটু বড় করা দরকার।

বাংলাদেশে উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে বর্তমানে বহুবিবাহের চাইতেও বড় অপরাধ সম্ভবত কালো মেয়ে বিয়ে করা। বহুবিবাহের আলোচনা একসময় মিলিয়ে যায়, তবে কালো মেয়ে বিয়ে করলে, আর যদি সন্তান কালো হয়ে তাহলে মোটামুটি এটি একটি লাইফটাইম প্যাঁড়া হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমানে ফেসবুকে বহুবিবাহ নিয়ে একটি গ্রুপ খোলার প্রেক্ষিতে এনিয়ে নানা রকম আলোচনা হচ্ছে, তাই নিজের কিছু বিক্ষিপ্ত চিন্তা শেয়ার করলাম। আমি বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে বহুবিবাহের পক্ষে বা বিপক্ষে এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছিনা কারণ আমাদের সমাজে ইসলামের বিধানের প্রতি যেরকম মানসিকতা তাতে বহুবিবাহ কমন হয়ে গেলে কি অবস্থা হবে তা বলা মুশকিল। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে আইনের শাসন এত দুর্বল।

দেখুন আমাদের দেশে ধার্মিক পরিবারগুলোতেও নিজের বোনকে তার সম্পত্তির ভাগ দিতে কি এক অবস্থা করে। বাবা নিজের মেয়েকে পথে বসিয়ে ছেলেদের উইল করে সম্পত্তি দিয়ে দেয়। বাবা মারা যাবার পর মাকে ঘর থেকে বের করে দেয় ছেলেরা।

সেখানে কোন ব্যাক্তির একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের ভরণপোষণ, স্বামী মারা যাবার পর সম্পত্তির ভাগ। বিভিন্ন ঘরের ছেলে মেয়েদের প্রতি ইনসাফ কিভাবে করা হবে এনিয়ে সামাজিক আলোচনা হওয়ার দরকার আছে।

তবে পাশাপাশি এটি আল্লাহর দেয়া বিধান। কেউ যদি সামর্থ্য রাখেন ইনসাফ করার তাহলে তাকে নিরুৎসাহিত করারও কিছু নেই এবং এটিকে খারাপ চোখে দেখাও একটি ভুল মানসিকতা।


Writer: Brother Zahid Eshaq

কোন মন্তব্য নেই