পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

এক বালকের মাধ্যমে গোটা একটি জাতির জেগে উঠার গল্প


শুধুমাত্র এক বালকের আত্মত্যগের বিনিময়ে জেগে উঠেছিল পুরো এক গোষ্ঠী। যারা হিদায়াতের যোগ্য মহান আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে হিদায়াত দান করবেনই। আর যারা নিজেদের জন্য গোমরাহীকেই বেঁচে নিয়েছে, তারা কখনোই হিদায়াত লাভ করতে সক্ষম হবে না। পূর্ববর্তী যুগে শুধুমাত্র এক বালকের অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে বহু সংখ্যক মানুষ হিদায়াতের পথ অনুসরণ করেছিল। পক্ষান্তরে এ ধরনের অলৌকিক ঘটনা চাক্ষুস দেখার পরও অনেকে হিদায়াতের পথ অনুসরন করতে সক্ষম হয়নি। এ মর্মে রাসুল (সাঃ)-এর বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে। নিম্নে আমরা সেই হাদীসের ভাবানুবাদ উল্লেখ করার চেষ্টা করছি ইনশাআল্লাহ।

সুহাইব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে একজন বাদশাহ ছিল এবং তার (উপদেষ্টা) একজন যাদুকর ছিল। যাদুকর বার্ধক্যে উপনীত হলে বাদশাহকে বলল, আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি সুতরাং আপনি আমার নিকট একটি বালক পাঠিয়ে দিন, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব। ফলে বাদশাহ তার কাছে একটি বালককে প্রেরন করলো যাকে সে যাদু শিক্ষা দিত।

সেই বালকের যাতায়াতের পথে বাস করতো এক ধর্মযাজক। বালকটি তার কাছে বসলো এবং তার কথা শুনল। তার কথা বালকের পছন্দ হল। যখনই বালকটি যাদুকরের কাছে যেত, তখনই যাত্রাপথে ঐ ধর্মযাজকের নিকট কিছুক্ষণের জন্য বসত।

সেই ধর্মযাজকের নিকট কিছুক্ষণ বসার কারনে, যাদুকরের নিকট পৌঁছতে দেরী হতো, আর সেই যাদুকর এই বিলম্বের কারনে ঐ বালককে প্রহার করতো। ফলে সে ধর্মযাজকের নিকটে অভিযোগ করলো। তখন ধর্মযাজক বলল, যখন তোমার ভয় হবে যে, যাদুকর তোমাকে মারধোর করবে, তখন তুমি বলবে, আমার বাড়ির লোক আমাকে কোনো কাজে আটকে দিয়েছিল। আর যখন বাড়ির লোকে মারবে বলে আশংকা হবে, তখন তুমি বলবে যে, যাদুকর আমাকে কোনো কাজে আটকে দিয়েছিল।

সুতরাং এভাবেই সেই বালকটি দিনাতিপাত করতে থাকলো। এমনিভাবে চলতে থাকা অবস্থায় একদিন বালকটি তার চলার পথে একটি ভয়ানক হিংস্র প্রানীর সম্মুখীন হল। ঐ জন্তুটি লোকদের পথ অবরোধ করে রেখেছিল। এ অবস্থা দেখে বালকটি মনে মনে বলল যে, আজ আমি জানতে পারবো যে, যাদুকর শ্রেষ্ঠ না ঐ ধর্মযাজক? অতঃপর একটি পাথর নিয়ে সে বলল, হে আল্লাহ! যদি যাদুকরের চাইতে ধর্মযাজক আপনার কাছে অধিক পছন্দনীয় হয়, তাহলে এই পাথর দ্বারা জন্তুটিকে শেষ করে দিন। যাতে রাস্তা নিরাপদ হয় এবং লোকেরা চলাফেরা করতে পারে। এই দু’আ করে সেই জন্তুর প্রতি পাথর ছুড়লো এবং তাকে হত্যা করে দিল। এরপর লোকেরা চলাফেরা করতে লাগলো। এরপর বালকটি ধর্মযাজকের নিকটে এসে তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা বলল। ধর্মযাজক বলল, হে বৎস! তুমি আজ থেকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তোমার ঈমানের ব্যাপার দেখে আমি অনুভব করছি যে, তোমাকে শীঘ্রই পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। সুতরাং তুমি যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, তখন আমার কথা গোপন রাখবে।

বালকটি আল্লাহর ইচ্ছায় জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগ ভালো করে দিতে পারত এবং অন্যান্য সমস্ত রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা করতে লাগলো। এমতাবস্থায় বাদশাহর পরিষদবর্গের জনৈক ব্যক্তি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যখন সে বালকটির কথা শুনল, তখন প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে তার কাছে গেল এবং তাকে বলল, তুমি যদি আমাকে ভালো করতে পারো, তাহলে এ সমস্ত উপঢৌকন তোমার। বালকটি বলল, আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারিনা, আল্লাহ তায়ালাই আরোগ্য দান করে থাকেন। যদি তুমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো তবে আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে দু’আ করবো, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। সুতরাং সে ঈমান আনল, ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে আরোগ্য দান করলেন।

চোখ ভালো হওয়ার পর লোকটি পূর্বেকার অভ্যাস অনুযায়ী বাদশাহর কাছে গিয়ে বসলো। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো, কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে? সে বলল, আমার রব। একথা শুনে বাদশাহ বলল, আমি ব্যতীত তোমার অন্য কোনো রব আছে কি? লোকটি বলল, আমার প্রভু এবং আপনার প্রভু হচ্ছেন আল্লাহ। একথা শুনে বাদশাহ তাকে পাকড়াও করলো এবং ততক্ষন পর্যন্ত তাকে অবিরতভাবে শাস্তি দিতে থাকলো, যতক্ষন পর্যন্ত না সে ঐ বালকের কথা বলে দিল।অতঃপর সেই বালককে বাদশাহর দরবারে নিয়ে আসা হল। বাদশাহ তাকে বলল, হে বৎস! তোমার কৃতিত্ব বা যাদু ঐ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করছ এবং আরও অনেক কিছু করছ। বালকটি বলল, আমি কাউকে আরোগ্য দান করতে পারিনা, আরোগ্য দানকারী হচ্ছেন একমাত্র মহান আল্লাহ। ফলে বাদশাহ তাকেও পাকড়াও করে অবিরতভাবে ততক্ষন পর্যন্ত শাস্তি দিতে থাকলো, যতক্ষন পর্যন্ত না সে ঐ ধর্মযাজকের কথা প্রকাশ করে দিল।

অতঃপর সেই ধর্মযাজককেও রাজদরবারে নিয়ে আসা হল। ধর্মযাজককে বলা হল, তুমি তোমার নিজের দ্বীন থেকে ফিরে এসো। কিন্তু সে অস্বীকার করলো। ফলে তার মাথার সিঁথিতে করাত রাখা হল। করাতটি তাকে চিরে দ্বিখণ্ডিত করে দিল, এমনকি তার শরীর দুই ভাগে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর বাদশাহর পরিষদবর্গের সেই ব্যক্তিকেও নিয়ে আসা হল এবং তাকে বলা হল, তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। কিন্তু সেই লোকটিও বাদশাহর কথা প্রত্যাখ্যান করলো। ফলে তার মাথার সিঁথিতেও করাত রাখা হল এবং তা দিয়ে তাকে চিরে দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হল। এমনকি তার শরীর দুই ধারে মাটিতে পড়ে গেল।

তারপর বালকটিকে নিয়ে আসা হল। অতঃপর তাকে বলা হল, তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। কিন্তু সেও এতে অসম্মতি জানাল। সুতরাং বাদশাহ তাকে তার বিশেষ কিছু লোকের কাছে অর্পণ করে দিয়ে বলল, এই বালককে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও, পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করাও। অতঃপর তোমরা যখন পর্বতের চুড়ায় পৌঁছবে, তখন তাকে তার ধর্ম ত্যাগের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে। যদি সে নিজের ধর্ম হেকে ফিরে যায়, তাহলে ভালো। নচেৎ তাকে ওখান থেকে নীচে ফেলে দাও। সুতরাং তারা সেই বালককে নিয়ে পাহাড়ের উপর আরোহণ করলো। বালকটি তখন আল্লাহর নিকট দু’আ করলো, হে আল্লাহ! তুমি আমার জন্য তাদের মোকাবেলায় যেভাবেই চাও, যথেষ্ট হয়ে যাও। সুতরাং পাহাড় কেপে উঠলো এবং তারা সবাই নীচে পড়ে গেল।

এরপর বালকটি হেঁটে হেঁটে বাদশাহর নিকট উপস্থিত হল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার সঙ্গীদের কোথায়? বালকটি বলল, আল্লাহ তায়ালা তাদের মোকাবেলায় আমার জন্য যথেষ্ট হয়েছেন।

বাদশাহ আবার তাকে কিছু লোকের নিকট সমর্পণ করে বলল যে, একে নিয়ে তোমরা নৌকায় চড় এবং সমুদ্রের মধ্যস্থলে গিয়ে তাকে তার ধর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করো। যদি সে স্বধর্ম থেকে ফিরে আসে তাহলে ঠিক আছে। নচেৎ তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো। সুতরাং তারা তাকে নিয়ে গেল। অতঃপর বালকটি নৌকায় চোরে দু’আ করলো, হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা এদের মোকাবেলায় আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও। সুতরাং নৌকাটি উল্টে গেল এবং তারা সকলেই পানিতে ডুবে গেল।

তারপর বালকটি হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে এলো। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলো, তোমার সঙ্গীদের কি হল? বালকটি বলল, আল্লাহ তায়ালা তাদের মোকাবেলায় আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছেন। পুনরায় বালকটি বাদশাহকে বলল, আপনি আমাকে সে পর্যন্ত হত্যা করতে পারবেন না, যে পর্যন্ত না আপনি আমার নির্দেশিত পদ্বতি অবলম্বন করবেন। বাদশাহ বলল, তা কী? সে বলল, আপনি একটি মাঠে লোকজন একত্রিত করুন এবং গাছের গুড়িতে আমাকে ঝুলিয়ে দিন। অতঃপর আমার তূন থেকে একটি তীর নিয়ে তা ধনুকের মাঝে রাখুন, তারপর বলুন, ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম’ (অর্থাৎ, এই বালকের প্রতিপালকের নামে) অতঃপর আমাকে তীর নিক্ষেপ করুন। এভাবে করলে আপনি আমাকে হত্যা করতে সক্ষম হবেন।

সুতরাং বালকটির নির্দেশনা অনুযায়ী বাদশাহ একটি ময়দানে লোকজন একত্রিত করলো এবং গাছে গুঁড়িতে তাকে ঝুলিয়ে দিল। অতঃপর তার তূন থেকে একটি তীর নিয়ে তা ধনুকের মাঝে রেখে ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম’ (অর্থাৎ এই প্রতিপালকের রবের নামে মারছি) বলে তীর নিক্ষেপ করলো। তীরটি সেই বালকের কান ও মাথার মধ্যবর্তী স্থানে গিয়ে আঘাত করলো। বালকটি আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে হাত রেখে মারা গেল। অতঃপর লোকেরা অলৌকিক এ দৃশ্য দেখে বলল যে, আমরা এ বালকের রবের প্রতি ঈমান আনলাম।

এ সংবাদ বাদশাহর কাছে পৌঁছানো হল এবং বলা হল, আপনি যার ভয় করছিলেন সেটাই ঘটে গেছে, সকল লোকেরা সে বালকের পালনকর্তার প্রতি ঈমান এনেছে।

এরপর বাদশাহ পথের মাঝে গর্ত খোঁড়ার নির্দেশ দিল। ফলে গর্ত খোঁড়া হল এবং তাতে আগুন জ্বালানো হল। বাদশাহ আদেশ করলো যে, যে লোক দ্বীন থেকে ফিরবে না তাকে এই আগুনে নিক্ষেপ করা হবে অথবা তাকে বলা হবে এই আগুনে প্রবেশ করো। লোকেরা তাই করলো। পরিশেষে একটি স্ত্রীলোক আসলো। তার সঙ্গে তার একটি শিশু ছিল। সেই নারীটি শিশুকে নিয়ে আগুনে পতিত হতে কুণ্ঠিত হলে, তার দুধের শিশুটি বলল, মা! আপনি সবর করুন, কেননা আপনি সত্যে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন’’ মুসলিম ৭৪০১-(৭৩/৩০০৫); তিরমিযি ৩৩৪০; রিয়াদুস সালিহীন ৩১

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হিদায়াতের পথ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন।

কোন মন্তব্য নেই