পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ধারাবাহিক কুরআন ০৬


[১]
একবার ইহুদীদের কয়েকজন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এসে বললো, "আমরা কয়েকটি প্রশ্ন করছি, যেগুলোর সঠিক উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারেনা। আপনি সত্য নবী হলে উত্তর দিন।"
রাসূল সঃ বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, যা ইচ্ছা তাই প্রশ্ন করো। কিন্তু অঙ্গীকার করো, যদি আমি ঠিক ঠিক উত্তর দিই তাহলে তোমরা আমার নবুওতী স্বীকার করে আমার অনুসারী হবে?"
তারা অঙ্গীকার করে। রাসুল সঃ তখন হযরত ইয়াকুব আঃ-এর মতো আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তাদের হতে পাকা ওয়াদা গ্রহণ করে তাদেরকে প্রশ্ন করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা বলল, "প্রথমে এটা বলুন, ইয়াকুব আঃ নিজের উপরে কোন জিনিসটি হারাম করেছিলেন?"

-“শুনো, যখন ইয়াকুব আঃ 'আরকুন সিনা’ নামের একটি রোগে ভীষণভাবে আক্রান্ত হন, তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, আল্লাহ তায়া’লা যদি তাঁকে এ রোগ হতে আরোগ্যদান করেন তাহলে তিনি উটের গোশত খাওয়া ও উটনীর দুধ পান করা পরিত্যাগ করবেন। আর এ দুটি ছিল তার খুবই লোভনীয় ও প্রিয় বস্তু। অতঃপর তিনি সুস্থ হয়ে গেলে এই দুটো জিনিস নিজের উপর হারাম করে দেন। তোমাদের উপর সেই আল্লাহর শপথ, যিনি মূসা আঃ'র উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন। সত্য করে বলতো, এটা সঠিক নয় কি?"
তারা শপথ করে বলল, “নিশ্চয়ই সত্য।"
তিনি বললেন “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।"

অতঃপর তারা বলল, “আচ্ছা বলুন, তাওরাতের মধ্যে যে নিরক্ষর নবীর আগমনের সংবাদ রয়েছে তাঁর বিশেষ নিদর্শন কী? আর তাঁর কাছে কোন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসেন?"
--"তাঁর বিশেষ নির্দশন এই যে, যখন তাঁর চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে, তখন তাঁর অন্তর জাগ্রত থাকে। তোমাদেরকে সেই প্রভুর কসম, যিনি মূসা আঃ'র উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন। বলতো, এই উত্তর সঠিক নয় কি?"
তারা সবাই কসম করে বলল, "আপনি সম্পূর্ণই সঠিক উত্তর দিয়েছেন।"
--"হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।"
তখন তারা বলল, "এইবার আমাদেরকে দ্বিতীয় অংশের উত্তর দিন। এটাই আলোচনার সমাপ্তি।" --"আমার বন্ধু জিবরাঈলই আঃ আমার নিকট ওহী নিয়ে আসেন এবং তিনিই সব নবীর নিকট ওহী নিয়ে আসতেন। সত্য করে বল, আমার এই উত্তরটিও সঠিক নয় কি?"
--"হ্যা, উত্তর সঠিকই বটে; কিন্তু জিবরাঈল আঃ আমাদের শত্রু। কেননা, তিনি কঠোরতা ও হত্যার কারণসমূহ নিয়ে আসেন। এজন্যে, আমরা তাঁকে মানিনা আর আপনাকেও মানবো না। তবে, যদি আপনার নিকট আমাদের বন্ধু মীকাঈল আঃ ওহী নিয়ে আসতেন তবে আমরা আপনার সত্যতা স্বীকার করে আপনার অনুসারী হতাম।" তাদের একথার উত্তরে নিচের আয়াত দুটি অবতীর্ণ হয়।

[২]
বুখারীর এক বর্ণনায় আছে, যখন রাসূলুল্লাহ সঃ মদীনায় আগমন করেন সেসময় আবদুল্লাহ বিন সালাম রাঃ নিজের বাগানে অবস্থান করছিলেন তখন তিনি ইহুদী ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রাসূলু সঃ'র আগমন সংবাদ শুনে তিনি তখনই রাসূলুল্লাহ সঃ-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, "জনাব, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি যার উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউই জানে না। বলুন তো, কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ কী? জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার কি এবং কোন জিনিস সন্তানকে কখনো মায়ের দিকে এবং কখনো বাপের দিকে আকৃষ্ট করে?"
তখন রাসূল সঃ বললেন, "এ তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনই জিবরাঈল আঃ আমাকে বলে গেলেন।"
--"জিবরাঈল আঃ তো আমাদের শত্রু।"
তখন রাসূল সঃ নিচের আয়াত দুটি পাঠ করেন। (অর্থাৎ, আয়াত দুটি তখনি নাযিল হয়) অতঃপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ এই যে, এক আগুন হবে যা জনগণকে পূর্ব দিক হতে পশ্চিম দিকে নিয়ে জমা করবে। জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। আর যখন পুরুষের বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে এবং যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন কন্যা সন্তান জন্ম হয়।" এ উত্তর শুনেই আবদুল্লাহ বিন সালাম মুসলমান হয়ে যান এবং তিনি বলেন, "হে আল্লাহর রাসূল সঃ! ইহুদীরা খুবই নির্বোধ। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করার পূর্বেই যদি তারা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জেনে নেয় তাহলে, তারা আমার সম্বন্ধে খারাপ মন্তব্য করবে (সুতরাং আপনি তাদেরকে প্রথমে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করুন)

অতঃপর ইহুদীরা রাসূল সঃ-এর নিকট আগমন করলে রাসূলুল্লাহ সঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ বিন সালাম কেমন লোক?"
--"তিনি আমাদের মধ্যে উত্তম লোক ও উত্তম লোকের ছেলে। তিনি আমাদের মধ্যে নেতা ও নেতার ছেলে।"
--“তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মতামত কী?"
--“আল্লাহ তাঁকে ইসলাম গ্রহণ হতে রক্ষা করুন!"
তখুনি আবদুল্লাহ বিন সালাম রাঃ আড়াল হতে বের হয়ে পড়েন (তিনি এতক্ষণ আড়ালে ছিলেন) এবং পাঠ করেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সঃ তাঁর রাসূল'।
তখনই এসব ইহুদীরা বলে উঠল, "সে আমাদের মধ্যে খারাপ লোক এবং খারাপ লোকের ছেলে। সে অত্যন্ত নিম্ন স্তরের লোক।"
আবদুল্লাহ বিন সালাম রাঃ তখন বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল সঃ! আমি এ ভয়ই করেছিলাম।"
(তাফসীরে ইবনে কাসীর)

[৩]
"বল, যে ব্যক্তি জিবরাঈলের সাথে শত্রুতা রাখে এজন্য যে, সে আল্লাহর হুকুমে এই কুরআনকে তোমার অন্তঃকরণ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে, যা পূর্ববতী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণ করছে ও মু’মিনদের সুসংবাদ দিচ্ছে।" [২:৯৭] "যে ব্যক্তি আল্লাহর, তাঁর ফেরেশতাগণের, তাঁর রাসূলগণের, জিবরাঈলের এবং মিকাঈলের শত্রু, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়া’লা এরূপ কাফিরদের শত্রু।" [২:৯৮]

কোন মন্তব্য নেই