পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ব্রেলভীদের আক্বীদা ও আমল

১৮৮০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলীতে ব্রেলভী মতবাদের জন্ম হয়। হানাফী মাযহাবের অনুসারী এবং ছূফীবাদে বিশ্বাসী আহমাদ রেযা খান (১৮৫৬-১৯২১ খৃঃ) এই মতবাদের উদ্ভাবক। ব্রিটিশ আমলে ‘আশেকে রাসূল’ নামে এই মতবাদটি সমধিক পরিচিত ছিল। এদের বর্তমান নেতা আন-নাওয়ারীর নামানুসারে এদেরকে জামা‘আতে নাওয়ারীও বলা হয়। তারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী হ’লেও তাদের বিশ্বাসের মূলে রয়েছে শী‘আদের ভ্রান্ত আক্বীদা ও বিশ্বাস। যার মধ্যে তিনটি হ’ল প্রধান : (ক) প্রাচ্য দর্শন ভিত্তিক মাযহাব, যা দক্ষিণ এশীয় হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নিকট থেকে এসেছে। (খ) খ্রিস্টানদের নিকট থেকে আগত মাযহাব, যা হুলূল (حلول ) ও ইত্তেহাদ (اتحاد)   দু’ভাগে বিভক্ত। হুলূল (حلول) অর্থ ‘মানুষের দেহে আল্লাহর অনুপ্রবেশ’। হিন্দু মতে, নররূপে নারায়ণ। (গ) ইত্তেহাদ বা ওয়াহদাতুল উজূদ (وحدة الوجود) বলতে অদ্বৈতবাদী দর্শনকে বুঝায়। যা হুলূল-এর পরবর্তী পরিণতি হিসাবে রূপ লাভ করে। এর অর্থ হ’ল, আল্লাহর সত্তার মধ্যে বান্দার সত্তা বিলীন হয়ে যাওয়া (الفناء في الله)। তাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে অস্তিত্ববান সব কিছুই আল্লাহর অংশ। আল্লাহ পৃথক কোন সত্তার নাম নয় (নাঊযুবিল্লাহ)। নিম্নে এই ভ্রান্ত ফের্কাটির আক্বীদা সম্পর্কে আরও কিছু বর্ণিত হ’ল।-

(১) তাদের বিশ্বাস মতে, রাসূল (ছাঃ) এমন ক্ষমতার অধিকারী, যার মাধ্যমে তিনি সারা দুনিয়া পরিচালনা করে থাকেন। তাদের একজন বড় নেতা আমজাদ আলী ব্রেলভী বলেছেন, ‘রাসূল (ছাঃ) হ’লেন আল্লাহর সরাসরি নায়েব (প্রতিনিধি)। সমস্ত বিশ্বজগৎ তাঁর পরিচালনার অধীন। তিনি যা খুশী করতে পারেন এবং যাকে খুশী দান করতে পারেন। যাকে খুশী নিঃস্বও করতে পারেন। তাঁর রাজত্বে হস্তক্ষেপ করা দুনিয়ার কারু পক্ষে সম্ভব নয়। যে তাঁকে অধিপতি হিসাবে মনে করে না, সে সুন্নাত অনুসরণের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে’। আহমাদ রেযা খান ভক্তির আতিশয্যে লিখেছেন, ‘হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! আমি আপনাকে আল্লাহ বলতে পারছি না। কিন্তু আল্লাহ ও আপনার মাঝে কোন পার্থক্যও করতে পারছি না’ (হাদায়েক বখশীশ, ২/১০৪)।

(২) তাদের মতে, রাসূল (ছাঃ) গায়েবের খবর রাখেন। আহমাদ রেযা খান আরো বলেন, আল্লাহ রাববুল আলামীন কুরআনের ধারক, আমাদের সরদার এবং আমাদের মাওলা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে লাওহে মাহফূযের যাবতীয় কিছু দান করেছেন (খালেছুল ই‘তিক্বাদ, পৃঃ ৩৩)।

(৩) তাদের মতে, বর্তমানে নবী করীম (ছাঃ) সৃষ্টির যাবতীয় কর্ম নিজে উপস্থিত থেকে দেখছেন। তিনি নূরের তৈরী এবং সর্বত্র হাযির (উপস্থিত) ও নাযির (দ্রষ্টা) (আহমাদ ইয়ার খান, মাওয়াইযু নাঈমিয়াহ, পৃঃ ১৪)।। আহমাদ ইয়ার খান আরো বলেন, তিনি তাঁর অবস্থানস্থল হ’তেই দুনিয়ার সবকিছু দেখেন নিজ হাতের তালু দেখার ন্যায়। তিনি নিকটের ও দূরের সব আওয়ায শুনেন। তিনি মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী চক্কর দিতে পারেন, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করতে পারেন এবং আহবানকারীর আহবানে সাড়া দেন (জা-আল হাক্ব ১/১৬০)।

(৪) তাদের মতে, রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে অলী-আওলিয়াও দুনিয়া পরিচালনার কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। আহমাদ রেযা খান বলেন, হে গাওছ (আব্দুল কাদের জীলানী)! ‘কুন’ বলার ক্ষমতা লাভ করেছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর প্রভুর কাছ থেকে, আর আপনি লাভ করেছেন মুহাম্মাদ (ছাঃ) থেকে। আপনার কাছ থেকে যা-ই প্রকাশিত হয়েছে, তা-ই দুনিয়া পরিচালনায় আপনার ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। পর্দার আড়াল থেকে আপনিই আসল কারিগর’।

(৫) যেহেতু তাদের মতে রাসূল (ছাঃ) হাযির-নাযির, এজন্য প্রতি ফরয ছালাতের পর তাদের ইমাম ছাহেব সূরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াতটি পাঠ করে ‘ইয়া নবী সালামু আলাইকা’ বলে কথিত দরূদ শুরু করেন এবং মুক্তাদীরা সমস্বরে তাতে যোগ দেন।

(৬) তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ যেহেতু একা, সেহেতু একাই তাঁর পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনার সুবিধার্থে আরশে মু‘আল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীব ৩১৯ জন, নাক্বীব ৭০ জন, আবদাল ৪০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন এবং একজন হ’লেন গাওছুল আযম, যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তা‘আলার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। তারা অলীগণের দ্বারা সৃষ্টজীবের হায়াত, রুযী, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মানো ও মুছীবত বিদূরণের কাজ সম্পাদন করেন।

(৭) মৃত ব্যক্তির জন্য কুলখানি, চল্লিশা ও বার্ষিক ঈছালে ছাওয়াবের অনুষ্ঠান ও উৎকৃষ্ট ভোজের ব্যবস্থা করা ছাড়াও কুরআন খতম করা, কবরের পার্শ্বে আযান দেওয়া, মৃতের কাফনের উপরে কালেমা তাইয়েবা লেখা, শায়খ আব্দুল কাদির জ্বীলানীর মৃত্যুদিবস উপলক্ষে ফাতিহা ইয়াযদাহম বা এগারো শরীফের অনুষ্ঠান করা এবং অলীদের নামে পশু পালন ইত্যাদি শিরকী ও বিদ‘আতী কাজকে তারা পরম ছওয়াবের কার্য মনে করে থাকে।

(৮) তাদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ হ’ল ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’। এই দিন তারা মহা ধুমধামে জশনে জুলূসের আয়োজন করে এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল (ছাঃ)-এর নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এদিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে।

(৯) অলী-আওলিয়ার মাযারে কথিত ‘ওরস শরীফ’ পালন তাদের জন্য বিরাট আনন্দের উপলক্ষ। এ উপলক্ষে তারা বাৎসরিক মাহফিলের আয়োজন করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়। এ দিনটিকে তারা পীরের নেক নযর লাভ ও অত্যন্ত ছওয়াব অর্জনের দিন বলে মনে করেন। যারা ছালাত-ছিয়াম আদায় করে না, তারা এদিনকে তাদের বাদ যাওয়া ছালাত ও ছিয়ামের জন্য কাফফারা আদায়ের দিবস বা মুক্তি লাভের দিবস হিসাবে মনে করে।

ব্রেলভী মতবাদ উপমহাদেশে পীর-মাযারী প্রথার পৃষ্ঠপোষক হিসাবে শিরক ও বিদ‘আতের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে।

জেনে-শুনে এ ধরনের শিরকী আক্বীদাসম্পন্ন লোকের পিছনে ছালাত আদায় করা জায়েয হবে না (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ, ফৎওয়া নং ৩০৯০, ২/৩৯৪-৩৯৬ পৃঃ)।

(বিস্তারিত দ্রঃ আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীর, আল-ব্রেলভিয়াহ : আক্বায়েদ ওয়া তারীখ; ড. মানে‘ আল-জূহানী, আল-মাওসূআহ আল-মুয়াসসারাহ ১/২৯৮-৩০৩ পৃঃ)।

কোন মন্তব্য নেই