পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

প্রশ্নোত্তরে ইতিকাফ

প্রশ্ন : ই‘তিকাফ কী? এর হুকুম কী?
উত্তর : দুনিয়াবী সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করাকে ই‘তিকাফ বলা হয়ে থাকে। ইতেকাফ করা সুন্নাত।


প্রশ্ন : ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য কী?

উত্তর : দুনিয়াদারীর ঝামেলা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়া, বিনয় নম্রতায় নিজেকে আল্লাহর দরবারে সমপর্ণ করা এবং বিশেষ করে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করার সুযোগ লাভ করাই ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন : ই‘তিকাফের জন্য কী কী শর্ত পূরণ আবশ্যক?
উত্তর : (ক) মুসলমান হওয়া, (খ) জ্ঞান থাকা, (গ) বড় নাপাকী থেকে পবিত্র থাকা, গোসল ফরয হলে গোসল করে নেয়া। (ঘ) মসজিদে ই‘তিকাফ করা। কাজেই কাফির-মুশরিক, অবুঝ শিশু, পাগল ও অপবিত্র লোক এবং হায়েয-নিফাস অবস্থায় নারীদের ই‘তিকাফ শুদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন : ই‘তিকাফের রুকন কয়টি ও কী কী?
উত্তর : এর রুকন ২টি : (ক) নিয়ত করা, (খ) মাসজিদে অবস্থান করা, নিজ বাড়ীতে বা অন্য কোথাও ই‘তিফাক করলে তা শুদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন : মেয়েরা কি নিজ বাসগৃহে ই‘তিকাফ করতে পারবে?
উত্তর : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় নারীরা মসজিদে ই‘তিকাফ করতেন।


প্রশ্ন : ই‘তিকাফ অবস্থায় কী কী কাজ নিষিদ্ধ?

উত্তর : তাহল :
(১) স্বামী স্ত্রীর মিলন, স্ত্রীকে চুম্বন ও স্পর্শ করা,
(২) মাসজিদ থেকে বের হওয়া। বেচাকেনা, চাষাবাদ, এমনকি রোগীর সেবা ও জানাযায় অংশ গ্রহণের জন্যও মাসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয নয়। বের হলে ইতেকাফ বাতিল হয়ে যাবে।

প্রশ্ন : বিশেষ প্রয়োজনে ই‘তিকাফ অবস্থায় মাসজিদ থেকে বের হতে পারবে কি?
উত্তর : মাসজিদের গণ্ডির মধ্যে ব্যবস্থা না থাকলে শুধুমাত্র মানবিক প্রয়োজনে প্রস্রাব-পায়খানা, খাওয়া-দাওয়া ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য মাসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয আছে, তবে মাসজিদে এসব ব্যবস্থা থাকার পর যদি কেউ বাইরে যায় তাহলে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

ই‘তিকাফ অবস্থায় এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী সাফিয়া রাদ্বি আল্লাহু আনহা কে ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। (বুখারী)

প্রশ্ন : কী কী কারণে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়?
উত্তর : নিম্নে বর্ণিত যে কোন একটি কাজ করলে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
১. স্বেচ্ছায় বিনা প্রয়োজনে মাসজিদ থেকে বের হলে
২. কোন শির্ক বা কুফরী কাজ করলে।
৩. পাগল বা বেঁহুশ হয়ে গেলে।
৪. নারীদের হায়েয-নিফাস শুরু হয়ে গেলে।
৫. স্ত্রীসহবাস বা যে কোন প্রকার যৌন সম্ভোগ করলে।


প্রশ্ন : ই‘তিকাফ অবস্থায় কী কী কাজ করা বৈধ অর্থাৎ মুবাহ?

উত্তর : ই‘তিকাফকারীদের জন্য নিুোক্ত কাজ করা বৈধ :
১. একান্ত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা।
২. চুল আঁচড়ানো, মাথা মুণ্ডানো, নখ কাটা, শরীর থেকে ময়লা পরিষ্কার করা, এবং সুগন্ধি ব্যবহার ও উত্তম পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান করা।
৩. মসজিদের ভিতরে পানাহার করা, ঘুমানো এবং বিশেষ প্রয়োজনে বিবাহের কাবিননামা ও ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিও সম্পাদন করা যাবে।

প্রশ্ন : ই‘তিকাফকারীর দায়িত্ব ও করণীয় কাজ কী কী? এবং তাঁর কী ধরনের ইবাদত করা উচিত?
উত্তর : উত্তম হল নফল ইবাদত বেশী বেশী করা। যেমন সলাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করা, যিক্র-আযকার ও তাসবীহ, তাহলীল করা অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, তাওবাহ-ইস্তেগফার, দু‘আ, দুরূদ ইত্যাদি ইবাদতে সর্বাধিক সময় মশগুল থাকা। তাছাড়া শরীয়া বিষয়ক ইলম চর্চা করা।
পার্থিব ব্যাপারে কথাবার্তা বলা, অনর্থক গল্পগুজব ও আলোচনা থেকে বিরত থাকা উচিত, তবে পারিবারিক কল্যাণর্থে বৈধ কোন বিষয়ে অল্পস্বল্প কথাবার্তা বলার মধ্যে কোন দোষ নেই।

প্রশ্ন : ই‘তিকাফ শুধুই রমযান মাসে? নাকি অন্য সময়ও করা যায়?
উত্তর : বৎসরের যে কোন সময় ই‘তিকাফ করা যায়। এজন্য নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট কোন দিন তারিখ নেই। যিনি যখন চাইবেন তখনি ই‘তিকাফ করতে পারবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার শাওয়াল মাসেও ই‘তিকাফ করেছেন। ‘উমার রাদিআল্লাহু আনহু একবার মাত্র এক রাত ই‘তিকাফ করেছিলেন।


প্রশ্ন : ই‘তিকাফের জন্য কোনটি উত্তম সময়?

উত্তর : রমযান মাস হচ্ছে ই‘তিকাফের উত্তম সময়। আরো উত্তম হচ্ছে রমযানের শেষ দশদিন ই‘তিকাফ করা।


প্রশ্ন : সর্বনিম্ন কী পরিমাণ সময় ই‘তিকাফ করা যায়?

উত্তর : এটি একটি মতবিরোধপূর্ণ মাসআলা। শাইখাইনের মতে ই‘তিকাফের ন্যূনতম সময়সীমা ১দিন। কেননা, হানাফী মতে ই‘তিকাফের জন্য রোযা শর্ত। আর রোযা ১ দিনের কমে পূর্ণ হয় না।

প্রশ্ন : ই‘তিকাফ কখন শুরু ও শেষ করব?
উত্তর : ফযরের সলাত আদায় করে বা সূর্যাস্তের পর ই‘তিকাফে প্রবেশ করা সুন্নাত/মুস্তাহাব। আর শেষ করবে ঈদের চাঁদ দেখা গেলে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটিই করতেন।


প্রশ্ন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতবার ই‘তিকাফ করেছেন?

উত্তর : প্রত্যেক রমাযানেই তিনি শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমযানে তিনি ই‘তিকাফ করেছিলেন ২০ দিন। এভাবে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোন বছরই তিনি ই‘তিকাফ থেকে বিরত থাকেননি। (বুখারী)


প্রশ্ন : ই‘তিকাফ কত প্রকার ও কী কী?

উ: ইসলামী শরীয়তে ই‘তিকাফ ৩ প্রকার।
(ক) ওয়াজিব ই‘তিকাফ : ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে ওয়াজিব ই‘তিকাফ হলো মানতের ই‘তিকাফ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“ তারা যেন তাদের মানৎ পূর্ণ করে।” (সূরা হাজ্জ : ২৯)
(খ) সুন্নাত ই‘তিকাফ : রমযানের শেষ ১০ দিনের ই‘তিকাফ। সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। যেমন :

(গ) মুস্তাহাব ই‘তিকাফ : উল্লেখিত দু’প্রকার ব্যতীত বাকী সব মুস্তাহাব ইতেকাফ।
____________________________________________________________
[রামাদ্বান মুসলিম জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এই মাসের আমল গুলো পূর্ণ ভাবে করতে চাই সঠিক সুন্নাহ ভিত্তিক জ্ঞান। আপনাদের কাছে সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যে রামাদ্বান সম্পর্কিত আর্টিকেল,ফতোয়া, বই, অডিও লেকচার দিয়ে সাজানো হয়েছে আমাদের রামাদ্বানের পাথেয় সেকশনটি, এখানে রমযান সম্পর্কিত আপনার জিজ্ঞাসার উত্তর গুলো পেয়ে যাবেন আশা করছি। নিজে পড়ুন, শুনুন এবং আপনাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। এই রামাদ্বান কে পরিনত করুন আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ রমযানে, এই রামাদ্বান মাস কে পরিণত করুন আপনার জীবনের সেরা সময়ে ইনশাআল্লাহ্‌।]

____________________________________________________
উৎস:
প্রশ্নোত্তরে সিয়াম

লেখক : অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া মজুমদার
প্রণয়নে : এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পরিমার্জনে :
ড. আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া মজুমদার
সভাপতি, আল-ফিক্হ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
ড. হাফেয আবদুল জলীল
গবেষণা কর্মকর্তা, ইসলামী বিশ্বকোষ বিভাগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
কাজী মুহাম্মাদ ইবরাহীম
হেড মুহাদ্দিস, জামেয়া কাসেমিয়া কামিল মাদরাসা, নরসিংদী

কোন মন্তব্য নেই