পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ঈদ উদযাপন

নবীজি (স:) এবং সাহাবাদের (রা:) ঈদ

প্রতিবছরই দুটি দিনকে মুসলমানরা ঈদ হিসেবে উদযাপন করে। অনেক দেশের অনেক সমাজেই ঈদ এখন ধর্মীয় পর্বের উর্ধ্বে উঠে রূপ নিয়েছে সার্বজনীন এক সাংস্কৃতিক উৎসবে। কিন্তু ঈদ উৎসবটির সত্যিকার তাৎপর্য যদি বুঝতে হয়, তাহলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হলো নবীজি (স) এবং সাহাবাদের জীবনকে দেখা। তারা নিজেরা কীভাবে ঈদ উদযাপন করেছেন। অন্যদেরকে করার তাগিদ দিয়েছেন। পাঠক আসুন, আমরা দেখি নবীজি এবং সাহাবাদের জীবনে ঈদ।


■ ঈদের প্রচলন
মদীনায় যাওয়ার পর নবীজি (স) দেখলেন, সেখানকার লোকজন দুটি দিনকে উদযাপন করে খেলাধূলার মধ্য দিয়ে। নবীজি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দুদিনের কী তাৎপর্য আছে? তারা বললো, আমরা জাহেলী যুগে এ দু দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন তিনি বললেন : ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দু’টো দিন দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’ [সুনান আবূ দাউদ : ১১৩৪]

শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির জন্য যে দু’টো দিন ছিল আল্লাহ তায়ালা তা পরিবর্তন করে এমন দু’টো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া, তাঁর জিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে পরিমিত আমোদ-ফুর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে। বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ গ্রন্থে ইবনে জারীর রাদি আল্লাহু আনহুর বর্ণনা মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (স) প্রথম ঈদ পালন করেছেন।


■ ঈদের নামাজ

নবীজী (স) দিনে বের হয়ে দু’রাকাত ঈদের সালাত আদায় করেছেন। এর পূর্বে ও পরে অন্য কোন নামাজ আদায় করেননি।’ [সহীহ বুখারি : ৯৮৯] শুধু ছেলেরা নয়, ঈদের জামাতে মেয়েদের শামিল করানোর ব্যাপারেও নবীজি (স) তাগিদ দিয়েছেন। উম্মে আতিয়া (রা) বলেন, ‘আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (স) আদেশ করেছেন আমরা যেন মহিলাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজের জন্যে বের করে দেই; পরিণত বয়স্কা, ঋতুবতী ও গৃহবাসিনীসহ সকলকেই। ঋতুবতী নারীরা ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে সালাত আদায় থেকে বিরত থাকবে তবে কল্যাণ ও মুসলিমদের দোয়া প্রত্যক্ষ করতে অংশ নিবে। তিনি আরো বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মাঝে কারো কারো ওড়না নেই (যা পরিধান করে আমরা ঈদের সালাতে যেতে পারি)। রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ‘সে তার অন্য বোন থেকে ওড়না নিয়ে পরিধান করবে।’ [সহীহ মুসলিম : ২০৯৩]


● ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে তাকবীর পাঠ করা

তাকবীর পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়। তাকবীর হলো : আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। ওয়া লিল্লাহিল হামদ। বাক্যটি উচ্চস্বরে পড়া। আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন।’ [মুসতাদরাক : ১১০৬] যখন সালাত শেষ হয়ে যেত তখন আর তাকবীর পাঠ করতেন না। বিশেষভাবে ঈদগাহের উদ্দেশ্যে যখন বের হবে ও ঈদগাহে সালাতের অপেক্ষায় যখন থাকবে তখন গুরুত্বসহকারে তাকবীর পাঠ করতে হবে।


● ঈদের দিন গোসল করা

ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছছন্নতা অর্জন করাকেও নবীজি গুরুত্ব দিতেন। ইবনে উমার রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে,‘তিনি ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।’ [সুনান বায়হাকী : ৫৯২০]


● পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া

আলী রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘সুন্নাত হলো ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া।’ [সুনান আততিরমিযী : ৫৩৩] উভয় পথের লোকদেরকে সালাম দেয়া ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য যে পথে যাবে সে পথে না ফিরে অন্য পথে ফিরে আসা। হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিনে পথ বিপরীত করতেন।’ [সহীহ বুখারী : ৯৮৬]


● খাবার গ্রহণ

ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা এবং ঈদুল আজহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নাত। বুরাইদা রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে খেতেন না।’ [সুনান আততিরমীযি : ৫৪৫]



● উত্তম পোশাক পরিধান করা


আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন তাঁর বান্দার উপর তাঁর প্রদত্ত নিয়ামাতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।’ [সহীহ আলজামে : ১৮৮৭] ইবনুল কায়্যিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন : ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ [যাদুল মায়াদ]



● ঈদের খুতবা শ্রবণ করা


আব্দুল্লাহ বিন সায়েব রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের সালাত শেষ করলেন, বললেন : আমরা এখন খুতবা দেব। যার ভালো লাগে সে যেন বসে আর যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে।’ [সুনান আবূ দাউদ : ১১৫৭]



● দোয়া ও ইস্তেগফার করা

ঈদের দিনে আল্লাহ তায়ালা অনেক বান্দাহকে মাপ করে দেন। মুয়ারিরক আলঈজলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ঈদের এই দিনে আল্লাহ তায়ালা একদল লোককে এভাবে মাপ করে দিবেন, যেমনি তাদের মা তাদের নিষ্পাপ জন্ম দিয়েছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তারা যেন এই দিনে মুসলিমদের জামায়াতে দোয়ায় অংশগ্রহণ করে।’ [লাতাইফুল মায়ারিফ]


মুসাফাহা ও মুআনাকা করা

মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান (রা) নবী কারীম (স) এর কাছে আসলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কোলাকুলি করলেন।’ [শারহুস সুন্নাহ] ফিতরাহ দেয়া : রমজান মাসে সিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে এবং অভাবগ্রস্তদের খাবার প্রদানের উদ্দেশ্যে ঈদের সালাতের পূর্বে নির্ধারিত পরিমাণের যে খাদ্য সামগ্রী দান করা হয়ে থাকে, শরীয়াতের পরিভাষায় তাকেই যাকাতুল ফিত্র বা ফিতরাহ বলা হয়ে থাকে। হাদিসে বর্ণিত, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে ফিতরাহ আদায় করার আদেশ দিলেন।’ [সহীহ বুখারি : ১৫০৩]


ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ভাষা

ঈদে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো শরিয়ত অনুমোদিত একটি বিষয়। বিভিন্ন বাক্য দ্বারা এ শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যেমন : (ক) হাফেয ইবনে হাজার রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, সাহাবায়ে কিরামগণ ঈদের দিন সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন : ‘তাকাববালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ অর্থ- আল্লাহতায়ালা আমাদের ও আপনার ভাল কাজগুলো কবুল করুন। (খ) ‘ঈদ মুবারক’ ইনশাআল্লাহ। (গ) ‘ঈদুকুম সাঈদ’ বলে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।


আনন্দ প্রকাশ করা

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদি আল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন : ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দু’টি ছোট মেয়ে গান গাইতেছিল, বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। ইতোমধ্যে আবু বকর রাদি আল্লাহু আনহু ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা শুনে বললেন, ‘মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ [সহীহ বুখারি : ৯৫২]


আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজ-খবর নেয়া

কোন মন্তব্য নেই