পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

প্রাক ইসলামিক যুগে আরবের নারীরা কি বেশি স্বাধীন ছিল? (১ম পর্ব)


স্বঘোষিত নাস্তিক ড. হুমায়ুন আজাদ তার বিভিন্ন লিখনীর মাধ্যমে একথা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ইসলাম পূর্ব আরবে নারীদের অধিকার, মর্যাদা ও সম্মান বেশী ছিল এমনকি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদেরকে বেশী মূল্যায়ন করা হত। কিন্তু আরবে ইসলাম যখন প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তখন নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ড. আজাদের ভাষায়ঃ
.
“ আরব নারীদের নানা ইতিহাস লিখা হয়েছে; সবগুলোতেই স্বীকার করা হয় যে ইসলাম পূর্ব আরবে অনেক বেশী ছিলো নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার। তারা অবরোধ থাকত না অংশ নিত সমস্ত সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ডে; এমনকি তাদের প্রাধান্য ছিলো সমাজে”। .................. প্রচারের ফলে মুসলমানদের মধ্যে জন্মেছে এমন এক বদ্ধমূল ধারণা যে ইসলামপূর্ব আরবে নারীদের অবস্থা ছিলো শোচনীয়; ইসলাম উদ্ধার করে তাদের। প্রতিটি ব্যবস্থা পূর্ববর্তী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়; তবে ঐতিহাসিক ভাবে সাধারণত সত্য হয় না”।

.
[হুমায়ুন আজাদ,নারী, অধ্যায়ঃ- পিতৃতন্ত্রের খড়কঃ আইন বা বিধিবিধান ; পৃষ্ঠাঃ-৮১; (আগামী প্রকাশনী,৩৬ বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০, ৩য় সংস্করণ, ষষ্ঠদশ মূদ্রণ, মে ২০০৯)] ।
.
অন্যত্র তিনি লিখেছেনঃ- “ইসলামের আগে আরবের নারীদের অবস্থা যতোটা খারাপ ছিল বলে প্রচারিত ততোটা খারাপ ছিল না, ঐতিহাসিকদের মতে নারী অনেক বেশী স্বাধীন ছিলো অন্ধকার যুগের আরবে”।
.
(হুমায়ুন আজাদ, নারী, অধ্যায়ঃ- পিতৃতন্ত্রের খড়কঃ আইন বা বিধিবিধান ; পৃষ্ঠাঃ-৩৬৯)
.
কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, তিনি এই আলোচনা করতে গিয়ে না ইতিহাস থেকে কোন দলীল দিতে পেরেছেন। আর না তার পক্ষে কোন ঐতিহাসিকের মতামত উপস্থাপন করতে পেরেছেন। শুধুমাত্র একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন যাও এই ক্ষেত্রে দলীল হিসেবে ব্যবহার করার অযোগ্য। আমরা আমাদের আলোচনা শুরুর পূর্বে একথা বলব, ড. আজাদ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নারীদেরকে স্রষ্টার মনোনীত দ্বীন ইসলাম থেকে দূরে নিয়ে যেতে চেয়েছেন।
.
তিনি হয়ত ভেবেছেন তার নিজস্ব চিন্তাধারা এবং অযৌক্তিক মিথ্যা বক্তব্যের দ্বারা মুসলিম নারীদের তিনি অতি সহজেই বিভ্রান্ত করতে পারবেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের সামনে মুসলিম জাতির ইতিহাস বিশুদ্ধ সনদে সংরক্ষিত রয়েছে। আমাদের সম্মানিত বিদ্বানরা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে যাচাই বাছাই করে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। আমাদের কে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বিভ্রান্ত করার কোন সুযোগ নেই, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা আমাদের কাছে সংরক্ষিত ইসলামের বিশুদ্ধ ইতিহাস ও সেই সাথে অমুসলিম ঐতিহাসিকদের মতামত থেকেই দেখাবো যে, ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব জাতির সামাজিক অবস্থা কত বর্বর ছিল এবং সেই সময়ে নারীদের অবস্থা কতটা শোচনীয় ছিল। মহান আল্লাহই তাওফীকদাতা।
.
কোরআনকে যেহেতু নাস্তিকরা দলীল হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে (কিন্তু আমাদের কাছে কোরআনই হল সর্বোত্তম দলীল) তাই আমরা প্রথমেই আপনার সামনে অমুসলিম লেখকদের বই থেকে ইসলাম পূর্ব আরবে বিদ্যমান নারীদের অবস্থার বর্ণনা প্রদান করছি।
.
বিখ্যাত অমুসলিম ঐতিহাসিক গীবন (Gibbon) আরবজাতির তৎকালীন বর্বরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন -
.
“In this primitive and abject state, which will deserve the name of society, this human brute, without arts and laws, almost without sense and language, is poorly distinguished from the rest of the animal creation”.
.
“আদিম সমাজ ও জঘন্য পরিস্থিতির মধ্যে আইন কানুন,ভাষা ও জ্ঞান বিবর্জিত সমাজ নামের অযোগ্য এই নররূপি পশুদিগকে অন্যান্য ইতর জীব হতে পৃথক করা যায় না”।
.
{Badruddoza, Muhammad(sm): His Teachings and Contribution, p.39.; (Islamic Foundation, Agargaon, Sher-e-Bangla Nagar, 6th edition, 2009)}
.
ইসলাম বিদ্বেষী লেখক রবার্ট স্পেন্সার (Robert Spencer) ইসলাম পূর্ব আরবে নারীদের অবস্থার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তার “The Truth About Mumammad” বইতে লিখেছে -
.
“Pagan Arabia was a rough land. Blood feuds were frequent, and the people had grown to be as harsh and unyielding as their desert land. Women were treated as chattel; child marriage (of girls as young as seven or eight) and female infanticide were common, as women were regarded as a financial liability”.
.
“পৌত্তলিক আরব ছিল রুক্ষ ভূমি। সেখানকার লোকজন মরুভূমির মত অত্যন্ত একরোখা ও কর্কশ মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠত, রক্তগত শত্রুতা ছিলো পুনরাবৃত্তিমূলক। সেখানকার নারীদেরকে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হত। বাল্য বিবাহ ( যেসব নারীদের বয়স ৭ অথবা ৮) এবং কন্যা শিশু হত্যা ছিল তাদের কাছে অতি সাধারণ ব্যাপার। নারীরা সমাজে আর্থিক দায়বদ্ধতার বস্তু হিসেবে বিবেচ্য হত”।
.
Robert Spencer, The Truth About Muhammad, p.34; (An Eagle Publishing Company, Washington, DC, 2006).
.
আরেক ইসলাম বিদ্বষী লেখক স্যার উইলিয়াম মূর (William Muir) প্রাক ইসলামিক আরবের অধঃপতনের চিত্র অংকন করেছে এইভাবে -
.
“The religion was a gross idolatry and their faith the dark superstitions dread of unseen beings; rather than belief in an overruling providence. The life to come and retribution for good and evil were, as motivates of action, practically unknown. Thirteen years before the Hijrat (July 2nd AD. 622) Mecca lay lifeless in this debased state”.
.
“তাদের ধর্ম ছিল জঘন্য পৌত্তলিকতা এবং তাদের বিশ্বাস ছিল এক সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের স্থলে বিভিন্ন অদৃশ্য শক্তির জন্য কুসংস্কার ও অজ্ঞতা পূর্ণ ভীতি। কর্ম প্রেরণার উৎস হিসেবে পরকাল ও ভালো মন্দের ফলাফলের উপর বিশ্বাস ছিল আরবজাতির অজানা। হিজরীর ১৩ বছর মক্কা এই অধঃপতিত অবস্থায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল”।
.
Sir William Muir, Life of Mahomet, p.509, london,1858.
.
.
বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত মুক্ত বিশ্বকোষ ‘উইকিপিডিয়াতে’ ইসলাম পুর্ব আরবে নারীদের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে -
.
“Before Islam, women experienced limited rights, except those of high status. They were treated like slaves and were not considered human. Women were not considered “worthy of prayer” and played no role in religious life. It is said that women were treated no different from “pet goats or sheep”. Women could not make decisions based on their own beliefs ...their view was not regarded for either a marriage or divorce. …They could not own or inherit property or objects, even if they were facing poverty or harsh living conditions. Women were treated less like people and more like possessions of men. …Essentially, women were slaves to men and made no decisions on anything, whether it be something that directly impacted them or not. If their husband died, his son from a previous marriage was entitled to his wife if the son wanted her”.
.
“ইসলাম আগমনের পূর্বে অভিজাত শ্রেণি ব্যতীত অন্যান্য নারীদের খুবই সীমিত অধিকার ছিল। তাদেরকে দাসীর ন্যায় বিবেচনা করা হত এবং মানুষ বলেই গণ্য করা হত না। নারীরা ধর্মীয় ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই পালন করত না এবং প্রার্থনার ক্ষেত্রে তাদেরকে অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হত। এটিও বলা হয় যে, পোষা ছাগল কিংবা ভেড়ার তুলনায় তাদেরকে আলাদা করে দেখা হত না। নারীরা তাদের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে কোন কোন পদক্ষেপ নিতে পারত না ...তালাক ও বৈবাহিক ব্যাপারে তাদের মতামত প্রদানের অধিকার ছিল খুবই সীমিত পর্যায়ের। ... উত্তরাধিকার সূত্রে তারা কোন সম্পত্তির মালিক হতে পারত না এমনি দরিদ্রাবস্থা কিংবা জীবনের কঠোরতম অবস্থাতেও না। মহিলাদের খুব কমই মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হত বরং তারা পুরুষের অধিকৃত বস্তু হিসেবে বিবেচিত হত। ...মূলত নারীরা ছিল পুরুষের দাসী এবং কোন ক্ষেত্রেই তাদের মতামত প্রদানের অধিকার ছিল না। ...যদি কোন মহিলার স্বামী মারা যেত তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে তার সৎ ছেলে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করত”।
.
.
এই হল অমুসলিম লেখকদের দেয়া ইসলাম পূর্ব আরবে বিদ্যমান নারীদের অবস্থা। উপরের বর্ণনাগুলো থেকে আমাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলাম পূর্ব আরবে নারীরা কতটা অধিকার বঞ্চিত, কতটা অত্যাচারিত, কতটা লাঞ্ছিত, কতটা নিপীড়িত-নিগৃহীত ছিল।
.
ইসলাম পূর্ব আরবে নারীরা ছিল পুরুষের একান্ত বাধ্যগত দাসী। সামাজিকভাবে ছিল না তাদের কোন মর্যাদা। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদেরকে মতামত প্রদানের কোন সুযোগ প্রদান করা হত না। উত্তরাধিকার সূত্রে তারা কোন সম্পত্তির মালিক হতে পারত না। বিয়ে কিংবা তালাক কোন বিষয়েই তারা তাদের নিজস্ব মতামত প্রদান করার সুযোগ পেত না। আর ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে তারা একান্তই অযোগ্য বলে বিবেচিত হত। সর্বোপরি অমুসলিম লেখকদের দেয়া বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, ইসলাম পূর্ব পৌত্তলিক আরবে নারীদেরকে মানুষ নয় বরং গৃহপালিত পশু হিসেবেই বিবেচনা করা হত। (তবে অভিজাত শ্রেণীর নারীরা ছিল এর ব্যতিক্রম; যাদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই সামান্য)
.
আর এটাই হল ড. আজাদ বর্ণিত নারী স্বাধীনতার আরব। ড. আজাদের মত নাস্তিকরা যদি নারী অধিকারবঞ্চিত প্রাক-ইসলামিক আরবের পক্ষে কলম ধরে ইসলাম পরবর্তী আরবের বিরোধিতা করতে চান; তো আমাদের আর একথা বুঝতে আর বাকী থাকে না যে, নাস্তিকদের চিন্তাধারা কতটা নারী বিদ্বেষী!
.
তারা নারীদেরকে কতটা নীচে নামাতে চায়!
তারা নারীদেরকে কতটা অধিকার বঞ্চিত করতে চায়!
.
(ইনশাআল্লাহ চলবে ..................)

.
সব থেকে বিশুদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থ কোরআন কারীমেও প্রাক ইসলামিক যুগে নারীদের অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ্‌ তৎকালীন নারীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ [١٦:٥٨] يَتَوَارَىٰ مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ ۚ أَيُمْسِكُهُ عَلَىٰ هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ [١٦:٥٩]
অর্থঃ “আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করা হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্নগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে (কন্যাকে) রেখে দেবে না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত নেয় তা কত নিকৃষ্ট”। (সূরা আন-নাহলঃ ৫৮-৫৯)
.
এই আয়াত আমাদেরকে অত্যন্ত পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলাম পূর্ব আরবের নারীরা কতটা অপমানিত হত। যে সমস্ত পিতাদের কন্যাসন্তান জন্মলাভ করত তারা লজ্জায় সমাজে মুখ লুকিয়ে বেড়াত। তাদের মনের মধ্যে ক্রোধ সৃষ্টি হত, এতটাই অপমানবোধ করতো যে কন্যাসন্তান কে রেখে দেবে নাকি মাটিতে পুতে ফেলবে তা নিয়ে ইতঃস্ততবোধ করতে থাকত। কেউ কেউ তাদের কন্যাসন্তানকে জীবিত মাটিতে দাফন করে দিত। কেননা কন্যা সন্তানকে তারা অপয়া মনে করত, তাদেরকে তারা সমাজের বোঝা মনে করত। আপনি যদি ইতিহাস গ্রন্থের দিকে তাকান তাহলেও এই ধরণের অসংখ্য উদাহরণ পাবেন। আমরা তার একটি ছোট্ট নমুনা আপনাদের সামনে পেশ করছি। “ইসলামের ইতিহাস” গ্রন্থে গ্রন্থকার লিখেন,
.
“বনী তামীম এবং কোরায়শদের মধ্যে কন্যা হত্যার সমধিক প্রচলন ছিল। তারা এজন্যে রীতিমত গর্ববোধ করতো এবং তাদের জন্যে সম্মানের প্রতীক বলে বিশ্বাস করতো। কোন কোন পরিবারে এ পাষণ্ডতা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, মেয়েরা যখন বেশ বড় হয়ে যেতো এবং মিষ্টি কথা বলতে শুরু করতো, তখন পাঁচ ছ’ বছর বয়সে তাকে সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত করে পিতা তাকে লোকালয়ের বাইরে নিয়ে যেতো। পাষণ্ড পিতারা পূর্বেই সেখানে গিয়ে গর্ত খুড়ে আসত এবং পরে মেয়েকে সেখানে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে গর্তে ফেলে দিত। অবোধ মেয়ে তখন অসহায় অবস্থায় চীৎকার করে করে বাপের কাছে সাহায্য চাইতো, কিন্তু পাষণ্ড পিতা তার দিকে বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ঢিল ছুড়ে ছুড়ে তাকে হত্যা করতো বা জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে নিজ হাতে কবর সমান করে দিয়ে নির্বিকারে ঘরে ফিরে আসতো এবং আপন কলিজার টুকরা সন্তানকে জীবন্ত প্রেথিত করার জন্য সে রীতিমত গর্ববোধ করতো। বনী তামীমের জৈনেক কায়স ইবন আসিম এভাবে একে একে তার দশটি কন্যাসন্তানকে জীবন্ত প্রেথিত করে। কন্যা হত্যার এ অমানুষিক বর্বরতা থেকে আরবের কোন কবীলাই মুক্ত ছিলো না। তবে কোন কোন এলাকা্র কবীলায় এটি অনেক বেশী হত, আবার কোন কোন কবীলায় তা কম হত”।
.
{নজিবাদী, আকবর শাহ খান, ইসলামের ইতিহাস, ১/৬৮; (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগারগাও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা, ২য় সংস্করণ, জুন, ২০০৮)}।
.
এই হলো জাহেলী যুগের কন্যাশিশুদের উপর আরব জাতির করা নির্মম অত্যাচারের কিছু খণ্ডচিত্র। এবার চলুন হাদিস থেকে দেখি যে তাদের সময়ে সাধারন নারীদের কি ধরণের অত্যাচার করা হত। তাদের যৌন চাহিদা মেটাতে গিয়ে তারা নারীকে কিভাবে তাদের ভোগ্য পণে পরিণত করেছিল।
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সহধর্মিণী আয়েশা (রা) বলেছেনঃ জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল।
.
এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে।
.
দ্বিতীয়ত হচ্ছে, কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মাসিক ঝতু থেকে মুক্ত হওয়ায় পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সাথে যৌনমিলন কর। এরপর স্বামী তার নিজ স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো এক বিছানায় ঘুমাত না, যতক্ষণ না সে অন্য ব্যক্তির দ্বারা গর্ভবতী হত, যার সাথে যৌনমিলন করত। এটা ছিল তার স্বামীর অভ্যাস। এতে উদ্দেশ্য ছিল যাতে করে সে একটু উন্নত জাতের সন্তান লাভ করতে পারে। এ ধরণের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হত।
.
তৃতীয় প্রথা ছিল যে, দশ জনের কম কতিপয় ব্যক্তি একত্রিত হয়ে পালাক্রমে একই মহিলার সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হত। যদি মহিলা এর ফলে গর্ভবতী হত এবং কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ায় পর কিছুদিন অতিবাহিত হত, সেই মহিলা এই সকল ব্যক্তিকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। যখন সকলেই সেই মহিলার সামনে একত্রিত হত, তখন সে তাদের বলত তোমরা সকলেই জান- তোমরা কি করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি, সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান! ঐ মহিলা যাকে খুশী তার নাম ধরে ডাকত, তখন এ ব্যক্তি উক্ত শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং ঐ মহিলা তার স্ত্রীরূপে গণ্য হত।
.
চতুর্থ প্রকারের বিবাহ হচ্ছে, বহু পুরুষ একই মহিলার সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হত এবং ঐ মহিলা তার কাছে যত পুরুষ আসত কাউকে শয্যাশায়ী করতে অস্বীকার করত না। এরা ছিল পতিতা, যার চিহ্ন হিসেবে নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে এদের সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হতে পারত। যদি এই সকল মহিলাদের মধ্য থেকে কেউ গর্ভবতী হত এবং কোন সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়া সকল কাফাহ পুরুষ এবং একজন কাফাহ ( এমন একজন বিশেষজ্ঞ, যারা সন্তানের মুখ অথবা শরীরের কোন অঙ্গ দেখে বলতে পারত- অমুকের ঐরসজাত সন্তান)- কে ডেকে আনা হত সে সন্তানটির যে লোকটির এ সদৃশ্য দেখতে পেত তাকে বলতঃ এটি তোমার সন্তান। তখন ঐ লোকটি ঐ সন্তানকে নিজের হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হত এবং লোকে ঐ সন্তানকে তার সন্তান হিসাবে আখ্যা দিত এবং সে এই সন্তানকে অস্বীকার করতে পারত না। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে সত্য দ্বীনসহ পাঠানো হল তখন তিনি জাহেলী যুগের সমস্ত বিবাহ প্রথাকে বাতিল করে দিলেন এবং বর্তমানে প্রচলিত শাদী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিলেন”।
.
{বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ কিতাবুন নিকাহ, ৮/৪৭৫১ ; (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগারগাও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা,একাদশ সংস্করণ, জুন-২০১৩)}।
.
এই হল জাহেলী সমাজের কিছুটা বাস্তব চিত্র। তৎকালীন আরব অভিজাত বংশের নারীদেরকেই কেবল মাত্র সম্মান করা হত, তাদের কথা সমাজে গৃহীত হত, তাদেরকে রক্ষায় যুদ্ধ হত, এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য। কিন্তু অপরদিকে সমাজের সাধারণ স্তরের নারীদের ছিলনা কোন মর্যাদা, ছিলো না সমাজ স্বীকৃত কোন অধিকার, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা হত সামাজিক সকল ধরণের কর্মকাণ্ড হতে। তাদের সাথে যেনা ব্যাভিচার করা জাহেলী সমাজের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। নিম্ন বংশীয় নারীরা কেবল মাত্র পুরুষের মনোরঞ্জনের সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হত, তাদের কে পতিতা বানানো হত। অপরদিকে নারী দাসীদের অবস্থা আরও শোচনীয় ছিল। তাদের ছিলনা কোন সমাজ স্বীকৃত অধিকার, তাদের ছিল না কোন মর্যাদা, তাদের ছিল না কোন ধরণের প্রতিবাদ করার অধিকার। তাদের সাথে তাদের মালিকরা অনায়েসেই অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হতে পারত। সমাজের কেউ কিছুই বলতো না।
.
ব্যাভিচার এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, সমাজের কোন স্তরের লোকেরাই এ থেকে মুক্ত ছিল না। অবশ্য কিছু সংখ্যক নারী পুরুষ (যাদের সংখ্যা নগণ্য) তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকার কারণে ব্যাভিচার থেকে বিরত থাকতো। জাহেলী যুগে একাধিক স্ত্রী রাখা দোষের কিছু ছিল না। দুই সহোদর বোনকে তারা একই সাথে বিয়ে করত। পিতার তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী অথবা পিতার মৃত্যুর পর সন্তান তার সৎ মায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো। তালাকের উপর ছিল শুধুমাত্র পুরুষের একছত্র অধিকার। তাদের স্ত্রী গ্রহণ করার যেমন কোন সীমা ছিল না ( কেউ কেউ দশের অধিক বিয়ে করত), ঠিক তেমনি তাদের তালাকেরও কোন নির্দিষ্ট সীমা ছিল না। যখন খুশি যাকে বিয়ে করত, যখন খুশি যাকে তালাক দিত এতে কোন নারী কোন ধরণের আপত্তি তুলতে পারতো না। তারা কোন ধরণের বিচার চাইতে পারতো না তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে।
.
{মুবারকপুরী, শফিউর রহমান, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠাঃ ৬০-৬৪; আল কোরআন একাডেমী, লন্ডন, ২১ তম প্রকাশ, নভেম্বর, ২০১৩)}।
.
আরবের তৎকালীন ইতিহাস পাঠ করলে আমাদের সামনে অত্যন্ত সুস্পষ্ট রূপেই প্রতিয়মান হয় যে, তৎকালীন উচ্চ বংশীয় নারীরা ছাড়া, সমাজের অন্যান্য স্তরের নারীদের অবস্থা একেবারেই শোচনীয় ছিল। তাদের ছিল না কোন সমাজ স্বীকৃত অধিকার। ছিল না কোন সামাজিক মর্যাদা। তারা পুরুষের যৌন সামগ্রী হিসেবেই সমাজে বিবেচিত হত। সর্বোপরি নারীরা সে সমাজে মানুষ নয় বরং পুরুষের অধিকৃত সম্পত্তি এবং গৃহপালিত ছাগল ভেড়ার ন্যায় বিবেচিত হত।
.
কিন্তু ইসলাম আগমনের পড়ে তাদের এই ধরণের সকল অজ্ঞতা ও কুসংস্কার কে বাতিল বলে ঘোষণা করে। নারীদেরকে মানুষ হিসেবে পুরুষের সমান ঘোষণা করে। নারীদের কে ফিরিয়ে দেয় তাদের প্রাপ্য সম্মান, কন্যা শিশু হত্যাকে পাপের কাজ বলে ঘোষণা করে। ৪টির বেশী স্ত্রী রাখাকে হারাম করে দেয়। সমাজের নারী দাসীদের সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন কে হারাম করে দেয়। নারীদের কে সম্পত্তিতে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করে। মোটকথা একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে, বোন হিসেবে তার প্রাপ্য ন্যায্য অধিকারকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করে। প্রত্যেক পুরুষকে তার অধীনস্ত নারীদের রক্ষনাবেক্ষন করা, তাদের মাল ইজ্জজের হিফাযত করা, তাদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করা ইত্যাদিকে বাধ্যতামূলক করে দেয় ইসলাম। (ইনশাআল্লাহ বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে)।
.
এ দাবি কেবল আমাদের নয়। অমুসলিমদের তৈরি এনসাইক্লোপিডিয়া “উইকিপিডিয়াতে” বলা হয়েছে,
“In 586 CE women were acknowledged to be human”
“৫৮৬ খৃষ্টাব্দে নারীদেরকে মানুষ বলে বিবেচনা করা হয়”
.
.
তাই ড. আজাদসহ নাস্তিকদেরকে আমরা বলতে চাই, আপনাদের কাছে প্রাক ইসলামিক আরবের কোন ইতিহাস বই থাকলে তা অধ্যয়ন করুন তারপর বিচার বিশ্লেষণ করে দেখুন যে কোন সমাজ নারীদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করেছে। আর যদি সব কিছু জেনে শুনেও প্রাক ইসলামিক আরবের পক্ষে কলম ধরেন তো আমাদের আর এ কথা বুঝতে বাকি থাকে না যে, আপনারা নারীদেরকে কতটা নীচে নামিয়ে দিতে চান। আপনাদের উদ্দেশ্য নারী স্বাধীনতা নয় বরং স্বাধীনতা নামক ফাকা বুলির আড়ালে নারীদেরকে যৌন দাসী বানিয়ে উপভোগ করা, যেমনি প্রাক ইসলামিক যুগের আরব পুরুষরা করত।
.
বস্তুত একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বজ্ঞানী।

.
.
সব থেকে বিশুদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থ কোরআন কারীমেও প্রাক ইসলামিক যুগে নারীদের অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ্‌ তৎকালীন নারীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ [١٦:٥٨] يَتَوَارَىٰ مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ ۚ أَيُمْسِكُهُ عَلَىٰ هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ [١٦:٥٩] 
অর্থঃ “আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করা হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্নগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে (কন্যাকে) রেখে দেবে না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত নেয় তা কত নিকৃষ্ট”। (সূরা আন-নাহলঃ ৫৮-৫৯)
.
এই আয়াত আমাদেরকে অত্যন্ত পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলাম পূর্ব আরবের নারীরা কতটা অপমানিত হত। যে সমস্ত পিতাদের কন্যাসন্তান জন্মলাভ করত তারা লজ্জায় সমাজে মুখ লুকিয়ে বেড়াত। তাদের মনের মধ্যে ক্রোধ সৃষ্টি হত, এতটাই অপমানবোধ করতো যে কন্যাসন্তান কে রেখে দেবে নাকি মাটিতে পুতে ফেলবে তা নিয়ে ইতঃস্ততবোধ করতে থাকত। কেউ কেউ তাদের কন্যাসন্তানকে জীবিত মাটিতে দাফন করে দিত। কেননা কন্যা সন্তানকে তারা অপয়া মনে করত, তাদেরকে তারা সমাজের বোঝা মনে করত। আপনি যদি ইতিহাস গ্রন্থের দিকে তাকান তাহলেও এই ধরণের অসংখ্য উদাহরণ পাবেন। আমরা তার একটি ছোট্ট নমুনা আপনাদের সামনে পেশ করছি। “ইসলামের ইতিহাস” গ্রন্থে গ্রন্থকার লিখেন,
.
“বনী তামীম এবং কোরায়শদের মধ্যে কন্যা হত্যার সমধিক প্রচলন ছিল। তারা এজন্যে রীতিমত গর্ববোধ করতো এবং তাদের জন্যে সম্মানের প্রতীক বলে বিশ্বাস করতো। কোন কোন পরিবারে এ পাষণ্ডতা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, মেয়েরা যখন বেশ বড় হয়ে যেতো এবং মিষ্টি কথা বলতে শুরু করতো, তখন পাঁচ ছ’ বছর বয়সে তাকে সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত করে পিতা তাকে লোকালয়ের বাইরে নিয়ে যেতো। পাষণ্ড পিতারা পূর্বেই সেখানে গিয়ে গর্ত খুড়ে আসত এবং পরে মেয়েকে সেখানে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে গর্তে ফেলে দিত। অবোধ মেয়ে তখন অসহায় অবস্থায় চীৎকার করে করে বাপের কাছে সাহায্য চাইতো, কিন্তু পাষণ্ড পিতা তার দিকে বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ঢিল ছুড়ে ছুড়ে তাকে হত্যা করতো বা জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে নিজ হাতে কবর সমান করে দিয়ে নির্বিকারে ঘরে ফিরে আসতো এবং আপন কলিজার টুকরা সন্তানকে জীবন্ত প্রেথিত করার জন্য সে রীতিমত গর্ববোধ করতো। বনী তামীমের জৈনেক কায়স ইবন আসিম এভাবে একে একে তার দশটি কন্যাসন্তানকে জীবন্ত প্রেথিত করে। কন্যা হত্যার এ অমানুষিক বর্বরতা থেকে আরবের কোন কবীলাই মুক্ত ছিলো না। তবে কোন কোন এলাকা্র কবীলায় এটি অনেক বেশী হত, আবার কোন কোন কবীলায় তা কম হত”।
{নজিবাদী, আকবর শাহ খান, ইসলামের ইতিহাস, ১/৬৮; (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগারগাও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা, ২য় সংস্করণ, জুন, ২০০৮)}।
.
এই হলো জাহেলী যুগের কন্যাশিশুদের উপর আরব জাতির করা নির্মম অত্যাচারের কিছু খণ্ডচিত্র। এবার চলুন হাদিস থেকে দেখি যে তাদের সময়ে সাধারন নারীদের কি ধরণের অত্যাচার করা হত। তাদের যৌন চাহিদা মেটাতে গিয়ে তারা নারীকে কিভাবে তাদের ভোগ্য পণে পরিণত করেছিল। 
.
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সহধর্মিণী আয়েশা (রা) বলেছেনঃ জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল। 
.
এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে।
দ্বিতীয়ত হচ্ছে, কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মাসিক ঝতু থেকে মুক্ত হওয়ায় পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সাথে যৌনমিলন কর। এরপর স্বামী তার নিজ স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো এক বিছানায় ঘুমাত না, যতক্ষণ না সে অন্য ব্যক্তির দ্বারা গর্ভবতী হত, যার সাথে যৌনমিলন করত। এটা ছিল তার স্বামীর অভ্যাস। এতে উদ্দেশ্য ছিল যাতে করে সে একটু উন্নত জাতের সন্তান লাভ করতে পারে। এ ধরণের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হত।
তৃতীয় প্রথা ছিল যে, দশ জনের কম কতিপয় ব্যক্তি একত্রিত হয়ে পালাক্রমে একই মহিলার সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হত। যদি মহিলা এর ফলে গর্ভবতী হত এবং কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ায় পর কিছুদিন অতিবাহিত হত, সেই মহিলা এই সকল ব্যক্তিকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। যখন সকলেই সেই মহিলার সামনে একত্রিত হত, তখন সে তাদের বলত তোমরা সকলেই জান- তোমরা কি করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি, সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান! ঐ মহিলা যাকে খুশী তার নাম ধরে ডাকত, তখন এ ব্যক্তি উক্ত শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং ঐ মহিলা তার স্ত্রীরূপে গণ্য হত।
চতুর্থ প্রকারের বিবাহ হচ্ছে, বহু পুরুষ একই মহিলার সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হত এবং ঐ মহিলা তার কাছে যত পুরুষ আসত কাউকে শয্যাশায়ী করতে অস্বীকার করত না। এরা ছিল পতিতা, যার চিহ্ন হিসেবে নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে এদের সাথে যৌনমিলনে লিপ্ত হতে পারত। যদি এই সকল মহিলাদের মধ্য থেকে কেউ গর্ভবতী হত এবং কোন সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়া সকল কাফাহ পুরুষ এবং একজন কাফাহ ( এমন একজন বিশেষজ্ঞ, যারা সন্তানের মুখ অথবা শরীরের কোন অঙ্গ দেখে বলতে পারত- অমুকের ঐরসজাত সন্তান)- কে ডেকে আনা হত সে সন্তানটির যে লোকটির এ সদৃশ্য দেখতে পেত তাকে বলতঃ এটি তোমার সন্তান। তখন ঐ লোকটি ঐ সন্তানকে নিজের হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হত এবং লোকে ঐ সন্তানকে তার সন্তান হিসাবে আখ্যা দিত এবং সে এই সন্তানকে অস্বীকার করতে পারত না। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে সত্য দ্বীনসহ পাঠানো হল তখন তিনি জাহেলী যুগের সমস্ত বিবাহ প্রথাকে বাতিল করে দিলেন এবং বর্তমানে প্রচলিত শাদী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিলেন”।
.
{বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ কিতাবুন নিকাহ, ৮/৪৭৫১ ; (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগারগাও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা,একাদশ সংস্করণ, জুন-২০১৩)}।
.
এই হল জাহেলী সমাজের কিছুটা বাস্তব চিত্র। তৎকালীন আরব অভিজাত বংশের নারীদেরকেই কেবল মাত্র সম্মান করা হত, তাদের কথা সমাজে গৃহীত হত, তাদেরকে রক্ষায় যুদ্ধ হত, এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য। কিন্তু অপরদিকে সমাজের সাধারণ স্তরের নারীদের ছিলনা কোন মর্যাদা, ছিলো না সমাজ স্বীকৃত কোন অধিকার, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা হত সামাজিক সকল ধরণের কর্মকাণ্ড হতে। তাদের সাথে যেনা ব্যাভিচার করা জাহেলী সমাজের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। নিম্ন বংশীয় নারীরা কেবল মাত্র পুরুষের মনোরঞ্জনের সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হত, তাদের কে পতিতা বানানো হত। অপরদিকে নারী দাসীদের অবস্থা আরও শোচনীয় ছিল। তাদের ছিলনা কোন সমাজ স্বীকৃত অধিকার, তাদের ছিল না কোন মর্যাদা, তাদের ছিল না কোন ধরণের প্রতিবাদ করার অধিকার। তাদের সাথে তাদের মালিকরা অনায়েসেই অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হতে পারত। সমাজের কেউ কিছুই বলতো না।
ব্যাভিচার এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, সমাজের কোন স্তরের লোকেরাই এ থেকে মুক্ত ছিল না। অবশ্য কিছু সংখ্যক নারী পুরুষ (যাদের সংখ্যা নগণ্য) তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকার কারণে ব্যাভিচার থেকে বিরত থাকতো। জাহেলী যুগে একাধিক স্ত্রী রাখা দোষের কিছু ছিল না। দুই সহোদর বোনকে তারা একই সাথে বিয়ে করত। পিতার তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী অথবা পিতার মৃত্যুর পর সন্তান তার সৎ মায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো। তালাকের উপর ছিল শুধুমাত্র পুরুষের একছত্র অধিকার। তাদের স্ত্রী গ্রহণ করার যেমন কোন সীমা ছিল না ( কেউ কেউ দশের অধিক বিয়ে করত), ঠিক তেমনি তাদের তালাকেরও কোন নির্দিষ্ট সীমা ছিল না। যখন খুশি যাকে বিয়ে করত, যখন খুশি যাকে তালাক দিত এতে কোন নারী কোন ধরণের আপত্তি তুলতে পারতো না। তারা কোন ধরণের বিচার চাইতে পারতো না তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে। 
.
{মুবারকপুরী, শফিউর রহমান, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠাঃ ৬০-৬৪; আল কোরআন একাডেমী, লন্ডন, ২১ তম প্রকাশ, নভেম্বর, ২০১৩)}।
.
আরবের তৎকালীন ইতিহাস পাঠ করলে আমাদের সামনে অত্যন্ত সুস্পষ্ট রূপেই প্রতিয়মান হয় যে, তৎকালীন উচ্চ বংশীয় নারীরা ছাড়া, সমাজের অন্যান্য স্তরের নারীদের অবস্থা একেবারেই শোচনীয় ছিল। তাদের ছিল না কোন সমাজ স্বীকৃত অধিকার। ছিল না কোন সামাজিক মর্যাদা। তারা পুরুষের যৌন সামগ্রী হিসেবেই সমাজে বিবেচিত হত। সর্বোপরি নারীরা সে সমাজে মানুষ নয় বরং পুরুষের অধিকৃত সম্পত্তি এবং গৃহপালিত ছাগল ভেড়ার ন্যায় বিবেচিত হত।
.
কিন্তু ইসলাম আগমনের পড়ে তাদের এই ধরণের সকল অজ্ঞতা ও কুসংস্কার কে বাতিল বলে ঘোষণা করে। নারীদেরকে মানুষ হিসেবে পুরুষের সমান ঘোষণা করে। নারীদের কে ফিরিয়ে দেয় তাদের প্রাপ্য সম্মান, কন্যা শিশু হত্যাকে পাপের কাজ বলে ঘোষণা করে। ৪টির বেশী স্ত্রী রাখাকে হারাম করে দেয়। সমাজের নারী দাসীদের সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন কে হারাম করে দেয়। নারীদের কে সম্পত্তিতে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করে। মোটকথা একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে, বোন হিসেবে তার প্রাপ্য ন্যায্য অধিকারকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করে। প্রত্যেক পুরুষকে তার অধীনস্ত নারীদের রক্ষনাবেক্ষন করা, তাদের মাল ইজ্জজের হিফাযত করা, তাদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করা ইত্যাদিকে বাধ্যতামূলক করে দেয় ইসলাম। (ইনশাআল্লাহ বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে)।
এ দাবি কেবল আমাদের নয়। অমুসলিমদের তৈরি এনসাইক্লোপিডিয়া “উইকিপিডিয়াতে” বলা হয়েছে, 
“In 586 CE women were acknowledged to be human” 
“৫৮৬ খৃষ্টাব্দে নারীদেরকে মানুষ বলে বিবেচনা করা হয়”
.
.
তাই ড. আজাদসহ নাস্তিকদেরকে আমরা বলতে চাই, আপনাদের কাছে প্রাক ইসলামিক আরবের কোন ইতিহাস বই থাকলে তা অধ্যয়ন করুন তারপর বিচার বিশ্লেষণ করে দেখুন যে কোন সমাজ নারীদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করেছে। আর যদি সব কিছু জেনে শুনেও প্রাক ইসলামিক আরবের পক্ষে কলম ধরেন তো আমাদের আর এ কথা বুঝতে বাকি থাকে না যে, আপনারা নারীদেরকে কতটা নীচে নামিয়ে দিতে চান। আপনাদের উদ্দেশ্য নারী স্বাধীনতা নয় বরং স্বাধীনতা নামক ফাকা বুলির আড়ালে নারীদেরকে যৌন দাসী বানিয়ে উপভোগ করা, যেমনি প্রাক ইসলামিক যুগের আরব পুরুষরা করত।
.
বস্তুত একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বজ্ঞানী। 
.

লেখকঃ জাকারিয়া মাসুদ [ফেসবুক id: Jakaria Masud]

অফিসিয়াল ওয়েব সাইট ঃ shottokothon.com  এবং response-to-anti-islam.com

ফেসবুক পেজঃ fb.com/shottokothon1

কোন মন্তব্য নেই