পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ইহুদিরা কি আসলেই উজাইর (Ezra) কে আল্লাহর পুত্র বলে বিশ্বাস করে?


নাস্তিক প্রশ্ন: ইহুদিরা(Jews) সম্পূর্ণরূপে একেশ্বরবাদী থাকা সত্ত্বেও কুরান কিসের ভিত্তিতে দাবি করে তারা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী (Quran 9:30)?

উত্তরঃ আল কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ۖ ذَٰلِكَ قَوْلُهُم بِأَفْوَاهِهِمْ ۖ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ ۚ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ ۚ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ
অর্থঃ ইহুদীরা বলে “উজাইর আল্লাহর পুত্র” এবং খ্রিষ্টানরা বলে “মাসীহ [ঈসা(আ)/যিশু] আল্লাহর পুত্র”। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। ওরা তো তাদের মতই কথা বলে যারা তাদের পূর্বে কাফির হয়েছে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে!
(কুরআন, তাওবাহ ৯:৩০)

ইহুদি তথা ইস্রায়েল জাতির ইতিহাস বহু ঈশ্বরের উপাসনা ও মূর্তিপুজা দ্বারা পরিপূর্ণ। তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থই এর সাক্ষ্য দেয়।

নবী মুসা(আ) [prophet Moses] ইস্রায়েলীয়দের ছেড়ে তুর পাহাড়ে যাওয়ামাত্রই তারা গরুর বাছুরের মূর্তিপুজা শুরু করেছিল। এ জন্য ঈশ্বরের শাস্তিতে তাদের বহু লোক নিহত হয়। [দেখুন খ্রিষ্টান বাইবেল/ইহুদি তানাখ(Tanakh) এর যাত্রাপুস্তক(Exodus) ৩২:১-৯]

শেষ পর্যন্ত মুসা(আ) তাঁদেরকে আবার মূর্তিপুজা থেকে ফেরান।
ইহুদিদের কিতাবমতে তাদের একজন নবী সুলাইমান(আ)[Solomon] স্বয়ং শেষ বয়সে মূর্তিপুজক হয়ে যান এবং দেব-দেবীর মন্দির বানান! [দেখুন বাইবেল, ১ রাজাবলী(1 Kings) ১১:১-১০] {{কুরআন এইজাতীয় কথা অস্বীকার করে; কুরআনমতে কোন নবী পাপী ছিলেন না; কুরআন সরাসরি বলে যে সুলাইমান(আ) কুফরী করেননি। দেখুন বাকারাহ ২:১০২।}}

নবী দাউদ(আ)[David] এবং সুলাইমান(আ) [Solomon] এর পর পরই ইস্রায়েলীয়দের রাজ্য ২ভাগে ভাগ হয়ে যায়, ইয়াহুদা(Judah) এবং ইস্রায়েল(সামারিয়া) এই দুই রাজ্যে। প্রথমে সামারিয়ার রাজ্যের ইস্রায়েলীয়রা মূর্তিপুজা শুরু করে,ফলে ঐশ্বরিক শাস্তি আসে, আসিরিয়া সাম্রাজ্য তাদের আক্রমণ করে দাসে পরিণত করে। পরে ইয়াহুদা রাজ্যের লোকেরা মূর্তিপুজায় লিপ্ত হয় এবং ব্যাবিলোনিয়ানরা তাদের আক্রমন করে দাসে পরিণত করে। সেসব এলাকায় নবীদের দাওয়াতে ইহুদিরা আবার একত্মবাদী ইসলামে ফিরে আসে। পরে পারস্যসম্রাট সাইরাস ইহুদিদের মুক্ত করেন এবং আবার ফিলিস্তিনে যেতে দেন। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের(Old Testament) এর প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে এইসব ইতিহাস অনেক বিস্তারিত বর্ণণা করা আছে।

ইহুদিদের মূর্তিপুজা ও বহু ঈশ্বরের উপাসনার আরো অনেক বিবরণ বাইবেলে আছে—বায়াল দেবতার উপাসনাকারী ইস্রায়েলীয়দের তাদের নবী কর্তৃক হত্যা করার ঘটনাঃ ২ রাজাবলী(2 Kings) ১০ম অধ্যায়।

নবী যিশাইয়(Isaiah) এর যুগে ইহুদিদের মূর্তিপুজা এবং নবী কর্তৃক তাদের একত্ববাদে(ইসলাম) ফিরে আসার আহ্বান বাইবেল, যিশাইয়(Isaiah) ২:৫-৯।

নবী ইয়ারমিয়া(যেরমায়া) কর্তৃক সেসময়ের মূর্তিপুজক ইহুদিদের একত্ববাদে ফিরে আসবার আহ্বানঃ বাইবেল, যিরমিয়(Jeremiah) ৩২:২৮-৩৫।

নবী হিজকিল (যিহিষ্কেল) এর ঘটনাঃ বাইবেল, যিহিষ্কেল(Ezekiel) ২০:৩১।

ইহুদি তথা ইস্রায়েল জাতির নিজ ধর্মগ্রন্থই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তাদের ইতিহাস পৌত্তলিকতা আর বহু দেবতার পুজায় ভরা। কাজেই চট করে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সময়ে “ইহুদিরা সম্পূর্ণরূপে একেশ্বরবাদী ছিল” বলে দেওয়াটা একটু কঠিন বৈকি।

কোন প্রেক্ষাপটে বা কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াতটি নাজিল হয়েছিল?

সাল্লাম ইবন মিশকাম, নু’মান ইবন আওফা, শাস ইবন কায়স ও মালেক ইবনুস সাইফ রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর কাছে এসে বলল, আমরা কিভাবে আপনার অনুসরণ করতে পারি, অথচ আপনি আমাদের কিবলা ত্যাগ করেছেন, আপনি উজাইরকে আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নেন না? তখন আল্লাহ তাআ’লা এ আয়াত নাজিল করেন।
[তাবারী, সিরাত ইবন হিশাম ১/৫৭০]

সুতরাং আমরা ঐতিহাসিক বিবরণ পাচ্ছি যে ইহুদিরা আসলেই উজাইরকে আল্লাহর পুত্র বলত।

সুরা তাওবাহ এর ৩০নং আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবী(র) বলেনঃ “ “ইহুদীরা বলে” এই কথাটি একটি সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে যদিও এর মানে সুনির্দিষ্ট, কারণ সব ইহুদি এমনটি [উজাইর আল্লাহর পুত্র] বলত না।
এটা তো আল্লাহর ঐ বক্তব্যের মত “যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, ...” (আলি ইমরান ৩:১৭৩) অথচ সব লোক তা বলেনি। “ [সুরা আলি ইমরানের ১৭৩ নং আয়াত—“যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু সাজ-সরঞ্জাম; তাদের ভয় কর। ...” এ আয়াতে “লোকেরা” কথাটি ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখানে এ দ্বারা আরবের সকল লোককে বোঝানো হয়নি বরং অল্প কিছু মুনাফিকের কথা বলা হয়েছে।]

ইমাম শাওকানী(র) এর ফাতহুল কাদিরেও অনুরূপ মত ব্যক্ত করা হয়েছে।

জি ডি নিউবাই তাঁর “আ হিস্টরি অফ দ্য জিউস অব এরাবিয়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “আমরা সহজেই ধরতে পারি যে হিজাজের[মক্কা-মদীনা] ইহুদিরা, যারা কিনা সুস্পষ্টভাবেই মোরাকাবার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মরমি ভাবধারায় আক্রান্ত ছিল, উজাইরকে সেই স্থান দিয়েছিল।

এর কারণ ছিল তার কিতাবের অনুবাদের বিবরণ, তার ধার্মিকতা।এবং বিশেষত, ঈশ্বরের অনুলেখক হিসাবে তাকে হনোক(Enoch) এর সাথে তুলনা করা হত।এ দ্বারা ঈশ্বরের পুত্রদের একজনকেও বোঝায়।এবং নিঃসন্দেহে তিনি ধর্মীয় নেতাদের সকল বৈশিষ্ট্য বহন করতেন(কুরআন ৯:৩১এ বর্ণিত ‘আহবার’), যাকে ইহুদিরা বন্দনা করত।”
[G. D. Newby, A History Of The Jews Of Arabia, 1988, University Of South Carolina Press, p. 61]

ইমাম কুরতুবী (র) ও ইমাম শাওকানী (র) এর তাফসির থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে আলোচ্য আয়াতে সকল ইহুদি সম্পর্কে এটা বলা হয়নি যে তারা উজাইরকে আল্লাহর পুত্র দাবি করে। বর্তমানকালেও ইহুদি ফির্কাগুলোর মধ্যে এমন বিশ্বাস দেখতে পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সময়ে আরবের ইহুদিরা [যারা ছিল ইয়েমেনী(Yemenite) দলীয় ইহুদি] উজাইরকে আল্লাহর পু্ত্র বলে অভিহীত করত।

ইহুদিদের বহু ঈশ্বরের উপাসনার ইতিহাস, ঐতিহাসিক বিবরণ ইত্যাদি উপেক্ষা করে যারা এরপরেও কুরআনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান, তাদের উদ্যেশ্যে বলব—সেসময়কার স্থানীয় ইহুদিদের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে যদি কুরআন আসলেই মারাত্মক ভুল কোন তথ্য দিত, তাহলে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর অনেক সাহাবীরই সেটা চোখে পড়ত।

মদীনাবাসী সাহাবীদের ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাস খুব ভালো করেই জানা ছিল কেননা মদীনায় তখন প্রচুর ইহুদি বাস করত।কুরআন যদি সত্যিই ইহুদিদের বিশ্বাসের ব্যাপারে এমন ভুল তথ্য দিত, তাহলে সাহাবীরা বুঝতেন যে কুরআন মিথ্যা। তাহলে তাঁদের অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করতেন।কিন্তু তাঁরা আদৌ এমন কিছু করেননি। বরং নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) ও কুরআনের উপর বিশ্বাসে অটল ছিলেন।
========================
.
লেখকঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার 

অফিসিয়াল ওয়েব সাইট ঃ Click Here  এবং Click Here

ফেসবুক পেজঃ Click Here

কোন মন্তব্য নেই