পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

অনুভূতি


যে ছেলেমেয়েগুলো দ্বীনের পথে চলার চেষ্টা করে তারা এলিয়েন না। অন্য সবার মতো তাদেরও আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা-মন্দলাগা আছে। পুরোদমেই আছে। দ্বীনের খাতিরে তারা এই আবেগ-অনুভূতিগুলোকে আল্লাহ্‌র অপছন্দনীয় জায়গাগুলোতে ব্যয় করতে চায় না। এটা তাদের স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া একটা পথ। এই কঠিন পথটা বেছে নেওয়াতে কিন্তু আবেগগুলো মরে যায় না। সেগুলো পুরোপুরিই থাকে ভেতরে। মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসতে চায়।
.
আল্লাহ্‌ মানুষকে যন্ত্র করে বানান নি। এই অনুভূতিগুলো তিনিই দিয়েছেন। আবার তিনিই দেখিয়ে দিয়েছেন কোন পথে এগুলো কীভাবে খরচ করতে হবে। কোনটা ঠিক পথ, কোনটা ভুল পথ। ঠিক পথে আবেগগুলো খরচ করার জন্য একটা ইসলামভিত্তিক সামাজিক কাঠামো দরকার। সেটা না থাকায় এই ছেলেমেয়েগুলো তাদের আবেগের জায়গাগুলোতে কেবলই suppress করে যায়। হারামটাকে ঠেকিয়ে রাখছি, কিন্তু হালালটা তো পাচ্ছি না–এরকম পরিস্থিতি। এই suppression এর ফলে পুরো ব্যাপারটাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, নিজেকে যন্ত্র বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই পরিশ্রম বৃথা পরিশ্রম। একসময় শরীর-মন বিদ্রোহ করে ওঠে। তখন শুরু হয় একরকম হতাশা। অথচ আল্লাহ্‌ এই অনুভূতিকে মেরে ফেলার জন্য আমাদের বানান নি।
.
যেমন ধরা যাক প্রেম। প্রেম অত্যন্ত ন্যাচারাল একটা ব্যাপার। জীবনে একবারও প্রেমে পড়ে নি এমন মানুষ পাওয়া ভার। এই ন্যাচারাল ব্যাপারটাকে আনন্যাচারাল বানিয়ে ফেলার ফল শুভ হয় না। অথচ এই ছেলেমেয়েগুলোকে সেটাই করতে হয়। আল্লাহ্‌ যেমন বলে দিয়েছেন নিষিদ্ধ পথ কোনটা, সেইসাথে সেটাও বলে দিয়েছেন বৈধ পথ কোনটা।
.
কেউ হয়তো কোনও সুন্দরীর সাথে গভীর প্রণয়ে লিপ্ত। একদিন জানতে পারে সম্পর্কের এই পদ্ধতি তার স্রষ্টা অনুমোদন করেন নি। সাথে সাথে সে এতদিনের ভালোবাসাকে ছুঁড়ে ফেলল। এর প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলানো বেশ কঠিন। কিন্তু ঐ যে বললাম, কঠিন পথটাকে তো এরা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে। আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসা থেকে, ভয় থেকে। আবার কেউ হয়তো সুন্দরী-বিত্তশালী রাজকন্যাকে বিয়ে করতে পারে চাইলেই। করছে না কারণ রাজকন্যার দ্বীনের বুঝ নেই। এই ত্যাগগুলো খুব সহজ নয়। প্রাথমিক ধাক্কার কথা বলছিলাম। সেটা সামলে উঠলে এরা দ্বিতীয় পরীক্ষাটায় পড়ে যখন এই সমস্ত সবরকে যখন অন্যরা মূল্যহীন জ্ঞান করে। ছ-ইঞ্চি লম্বা জিহবা একটা মানুষের হৃদয়কে জ্বালিয়ে দিতে যথেষ্ট।
.
Suppression এর পথটা সহজ হতো যদি এরা কাছের মানুষদের থেকে সমর্থনটা পেত। কিন্তু সেখানে উলটো বিরোধিতায় এই যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ। সমাজের সীমাহীন কলুষতার মধ্যে থেকে গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে নিজেদের ভালো রাখছে, অথচ পরিবার থেকে এরা কোনও appreciation পায় না। আমার কাছে এই আচরণকে চরম নিষ্ঠুরতা মনে হয়। তখন ছেলেমেয়েগুলোর মাথায় এমন চিন্তা আসতেই পারে যে এত ভালো থেকে কী পেলাম। চারদিক থেকে একটু শিথিলতা দিলেই তো এত প্রলোভন, ঐশ্চর্য আর আমুদে জীবন ছিল, সবার কাছে ভালোও হওয়া যেত। কষ্টও করতে হতো না, লোকের মুখে এত দুর্নামও সইতে হতো না।
.
হ্যাঁ, এই চিন্তা অবশ্যই শুদ্ধ না। আমরা বলতেই পারি, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্যই যদি স্বার্থত্যাগ হয় তবে এরকম চিন্তা কেন আসবে? কিন্তু এখানেই লেখার প্রথম বাক্যে যে কথাটা বলেছি, সেটার গুরুত্ব চলে আসবে। এই ছেলেমেয়েগুলো এলিয়েন না। সীরাহর দিকে তাকালে আমরা দেখি হুনাইনের যুদ্ধলব্ধ গণিমত বণ্টনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নতুন মুসলিম হওয়া মুজাহিদদের বেশি অংশ দিয়ে দিচ্ছেন, যদিও মর্যাদার দিক থেকে তাঁরা সর্বোত্তম ছিলেন না। এটা দেখে আনসার সাহাবীদের মনে খচখচ আরম্ভ হয়েছিল। শুনে মনে হতেই পারে, এতবড় সাহাবীরা, সামান্য পার্থিব সম্পদ, তাও যা কি না আল্লাহ্‌র রাসূল স্বয়ং ভাগ করছেন, সেটা নিয়ে ফিসফাস! হ্যাঁ, এটাই স্বাভাবিক ছিল কারণ তাঁরা মানুষ, ভিনগ্রহী নন। তাঁদের অন্তর প্রশান্ত করতে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) ভাষণ দিয়েছিলেন, যাতে আনসার সাহাবীদের অশ্রু চোখ ছাড়িয়ে দাড়িকে সিক্ত করেছিল।
.
আজকের সমাজে যে ছেলেমেয়েগুলো দ্বীনের পথে চলার জন্য সংগ্রামরত, তারা আল্লাহ্‌র রাসূলের মতো অন্তর প্রশান্তকারী কিছু কথা শুনতে চায়। একদিকে তারা নিজেদের suppress করতে করতে ক্লান্ত, এটা একটা কষ্ট, তার ওপর পরিবারের মানুষগুলোর অসহযোগিতা আরেকটা কষ্ট। এসময় তারা চায় কেউ কাঁধে হাত বুলিয়ে মন জুড়ানো কিছু কথা বলে হৃদয়কে শান্ত করুক, উৎসাহ দেক, সংগ্রামকে সাপোর্ট করুক, স্যাক্রিফাইসগুলোকে appreciate করুক।
.
একই পথের অগ্রজরাও কিন্তু সেই ভূমিকা নেন না। তাঁরা ধমক দেন, বলেন জযবাওয়ালা ছেলে ফ্যান্টাসিতে ভুগছে। বলেন দ্বীনদারদের পড়ালেখাতেও টপার হতে হবে। ভালো কথা। কিন্তু এসবই যে তত্ত্বকথায় কীভাবে পরিণত হচ্ছে সেটা কি তাঁরা দেখতে পান না? মানসিকভাবে এতটা চাপে থাকলে পড়ালেখায় কয়জন টপার হতে পারে? এই চাপগুলো কমানোর জন্য বড়দের ভূমিকা কী? কেবল ফেসবুকে এসে ছোটদের ধমকালেই কি দায়িত্ব শেষ?
.
যে ছেলেটি ইচ্ছে করলেই রাজকন্যাকে বুকে স্থান দিতে পারতো সে একটা সাধাসিধে ধর্মপরায়ণ মেয়েকে বিয়ে করতে পারছে না–এ দৃশ্য আমাদের জন্য লজ্জার। কিন্তু আমরা লজ্জা পাই না। নির্লজ্জ আবার লজ্জা পাবে কীসে? সকল সুযোগের মধ্যেও কিছু ছেলেমেয়ে সুযোগকে পায়ে ঠেলে চলে; বাকিদের জন্য, তাদের পরিবারের মানুষগুলোর উচিত ছিল লজ্জা পাওয়া।
.
এই শহুরে ধুলোমাখা জীবনে আমাদের শুধু ছোটাছুটিই আছে, আত্মার খোরাক নেই। কারো মন বুঝতে চাওয়ার সময় আমাদের নেই। কোনও সভ্যদেশে সাইকোলজিক্যাল ব্যাপারগুলোকে এতটা অবজ্ঞা করা হয় না, যা আমাদের সমাজে হয়। ছেলেমেয়েরা ভেতরে ভেতরে মরতে বসেছে, কারো কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। কতজন তো মরেই গেছে। জীবিত লাশ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে, কেউ বুঝতেও পারছে না। ওর তো শরীরটাই আছে, ভেতরে প্রাণ নেই। সেটা মরে গেছে, মেরে ফেলা হয়েছে।
.
এসব দেখলে খারাপ লাগে। বড্ড খারাপ লাগে।

লেখক: মুহাম্মদ জোবায়ের

কোন মন্তব্য নেই