পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

একজন মুসলিম মেয়ের উপর কি ছেলেরা ‘ক্রাশ’ খেতে পারে?


এক.
পাশ্চাত্যে একটা কথা বেশ প্রচলিত আছে, Ladies First. পর্দার প্রসঙ্গ আসলে আমাদের মধ্যেও হয়তো একটা ধারণা চলে আসে, পর্দা কেবল নারীদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু পবিত্র কুর’আনে পর্দার বেলায় আল্লাহ সর্বপ্রথম বলেছেন পুরুষের কথা, Gents First.

হাদীসে, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত” [১ ]কথাটির মাধ্যমে মা-জাতির যে বিশেষ সম্মানের কথা বলা আছে, তেমনি এটাও বলা আছে, “জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী হবে নারী” [২]।

নারীর এরকম বৈচিত্রপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ইতিহাসের পাতায়ও দেখা যায়। রাসূলুল্ললাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কে জীবরাঈল (আলাইহিস সালাম) জান্নাতের একটা প্রসাদের সুসংবাদ দেন, যেখানে থাকবেনা কোনো প্রকার কোলাহল [৩]। নূহ আর লূত (আলাইহিমাস সালামের) স্ত্রীদের দেন জাহান্নামের দুঃসংবাদ [৪]।

নারী কখনো উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করতে নিজের জীবন বাজি রেখে এগিয়ে যায় [৫], আবার নারী কখনো বিষ প্রয়োগ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করতে চায়।

নারী কখনো কাফির ফেরাউনের ঘরে ঈমানদার আছিয়া (আলাইহাস সালাম), আবার নূহ (আলাইহিস সালাম) এর মতো নবীর ঘরে কাফির স্ত্রী।

নারী কখনো নিজের রূপ প্রদর্শন করে কনফেশন লিস্ট বাড়ায়, আবার নারী নিজেকে আবৃত করে নিজেকে যেমন হিফাযত রখে তেমনি আশেপাশের পুরুষদেরকেও হিফাযত করে।

দুই.
ভার্সিটিতে উঠার পর ছেলেমেয়েরা নদী পার হয়ে সমুদ্রে নামে। যার কোনো কূল-কিনারা নেই। স্কুল-কলেজ লাইফে ফ্রি-মিক্সিংয়ের অবাধ সুযোগ না থাকলেও, ভার্সিটিতে পদার্পণ করার পর ছেলেমেয়েরা এই সুযোগ পেয়ে যায়। সারাজীবন চোখ নত করে চলা ছেলেগুলো এক সময়ে চোখ তুলে তাকানো শুরু করে। রঙ্গিন দুনিয়ার আহ্বান অনেক সময় উপেক্ষা করতে পারেনা। মেয়েদের চোখে চোখ পড়লে যে ছেলেটা একসময় লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিতো, সেই ছেলেটাও একসময় দেখা যায় কোনো একটা মেয়ের হাত ধরে টিএসসিতে হাঁটছে।

গ্রামের স্কুল-কলেজে পড়ার সময় যেই মেয়েটা পর্দা করে চলতো, ভার্সিটিতে উঠার পর সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সেই পর্দা করাকে ট্যাঁট্যাঁ-গুডবাই বলে বিদায় জানায়।

একসময় সে ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করতে গিয়ে দেখতে পায় তার নাম কোনো একটা Crush and Confession পেইজে। কোনো এক বড় ভাই কিংবা ইয়ারমেট তার উপর ‘ক্রাশ’ খেয়েছেন। তার সৌন্দর্যের গুণকীর্তন করে সেই ক্রাশখোর দু-চার লাইনের প্রেম-কাব্য রচনা করেছেন। নিজের গুণকোর্তন দেখে মোবাইল হাতে নিয়ে সে মিটিমিটি হাসে।

নিজের প্রশংসা কে না শুনতে চায়!

কনফেশনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় শুরু–শেষে কিংবা পুরোটা জুড়ে মেয়েদের সৌন্দর্যের বর্ণনা। সেই মেয়েটার নয়নভোলানো হাসি, প্রেজেন্টেশনের দিন শাড়ি পরায় তাকে কেমন দেখাচ্ছিলো, তার চুলের অন্যরকম স্টাইল, কিংবা বৃষ্টিস্নাত দিনে তার গালে বৃষ্টির পানি পড়ার পর তাকে কেমন লেগেছিলো এইসব।

মেয়েটাও আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে পারে, তার সাজগোজ করা স্বার্থক।

তিন.
ইসলামের বিধানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এটা পূর্ণাঙ্গ। আল্লাহ তাঁর বিধানে কোনো ফাঁকফোকর রাখেননি।

কুর’আনে পুরুষদের বেলায় যেমন বলা আছে, দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত রাখতে। (সূরা আন-নূরঃ৩০) 
নারীদের বেলায়ও তেমনি বলা হয়েছে, দৃষ্টি সংযত রাখতে, লজ্জাস্থানের হিফাযত রাখতে এবং সৌন্দর্য প্রদর্শন না করতে। (সূরা আন-নূরঃ৩১)

একজন মুসলমান ছেলে যদি তার দৃষ্টি হিফাযত রাখে, তাহলে তো তার ক্রাশ খাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। ঠিক তেমনি একজন মুসলমান মেয়ে যদি তার সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তাহলে তার উপর ক্রাশ খাওয়ারও কোনো সুযোগ নাই।

এরপরও যদি কোনো মুসলমান মেয়ের উপর কেউ ক্রাশ খায়, তার সৌন্দর্যের বর্ণনা করে Crush and Confession পেইজে কনফেশন করে তাহলে বুঝে নিতে হবে পর্দা করার বেলায় সেই মেয়ের কিছুটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে।

সমুদ্রে একটা বিশাল জাহাজকে ডুবানোর জন্য জাহাজের নিচে ছোট্ট একটা গর্ত যথেষ্ট। ঠিক তেমনি হয়তোবা পর্দা করার পরও কোথাও একটু অপূর্ণতা থাকার ফলে একজন মুসলিম মেয়ের উপর ছেলেরা ক্রাশ খাওয়ার সুযোগটুকু পাচ্ছে।

যারা দ্বীন মেনে চলছেনা সেইসব মেয়েরা কনফেশন পেইজে নিজেদের নাম দেখে উচ্ছসিত হতে পারে, কনফেশন পড়ে মিটিমিটি হাসতে পারে; কিন্তু দ্বীন মেনে চলা একজন মুসলিম মেয়ে কনফেশন পেইজে নিজের নাম দেখে উচ্ছাস করতে পারেনা, মিটিমিটি হাসতে পারেনা। এরকম কনফেশন দেখা তার চোখ দিয়ে পানি ঝড়ার কারণ হতে পারে।

চার.
একজন মহিলা আর তার স্বামী একটা ড্যান্স বারে ড্যান্স করতো। ড্যান্স বারে ড্যান্স করা মানে একেবারে উলঙ্গ না হলেও অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে ড্যান্স করা, ড্যান্স বারে আসা পুরুষদের বিনোদন দেওয়া। একটা সময় তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়, ড্যান্স করা ছেড়ে দেয়। ইসলামের বিধানগুলো মেনে চলার চেষ্টা শুরু করে। এরকম করে দুইমাস কাটলো।

ইসলাম গ্রহণের দুইমাস পর সেই মহিলা একজন স্কলারকে ফোন দিলো একটা ফতো’আ জানার জন্য। একদিন সে আর তার স্বামী একটা বাসে উঠেছিলো। বাসে প্রচণ্ড ঝাঁকুনির ফলে তার হাত থেকে কাপড়টুকু একটু সরে যায়। বাসে থাকা লোকজন তার হাত দেখে ফেলে।

কান্নাভেজা কন্ঠে ফোন দিয়ে সেই মহিলা ঐ স্কলারের কাছে জানতে চাইলো, “তার হাতগুলো তো বাসের লোকজন দেখে ফেলেছে, এজন্য কি সে জাহান্নামে যাব?” [৬]

যেই মহিলা দুইমাস আগে উলঙ্গ-অর্ধউলঙ্গ হয়ে ছেলেদের সামনে ড্যান্স করতো, ইসলাম গ্রহণ করার পর দূর্ঘটনাবশত সেই মহিলার হাত বাসের মানুষজন দেখার ফলে সে কান্না শুরু করে দেয়, সে জানতে চায় এজন্য কি সে জাহান্নামে চলে যাবে!
আল্লাহু আকবার!!!

দূর্ঘটনাবশত একজন মুসলমান মেয়ের হাত মানুষ দেখে ফলে যদি এই হয় তার উদ্বিগ্নতা, তাহলে Crush and Confession পেইজে নিজের নাম দেখে একজন মুসলমান মেয়ে কিরকম উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?

দ্বীন না মানা একজন মেয়ের গোপণ ড্রয়ারে থাকা প্রেমপত্র, কনফেশন পেইজে আসা কনফেশনগুলো গর্বের বিষয় হতে পারে। কিন্তু একজন দ্বীনদার মেয়ের কাছে এগুলো তার কান্নার কারণ হতে পারে। নবাগত প্রেমপত্র-কনফেশনগুলো তাকে সতর্ক করিয়ে দেবে, তার পর্দা করা এখনো যথাযথ হচ্ছেনা। জাহাজের মধ্যে ছোট্ট একটা গর্ত রয়ে গেছে।

পাঁচ.
লেখাটি শেষ করছি একটা ছোট্ট ঘটনা বলার মাধ্যমে। কয়েকদিন আগে একটা বইয়ে ঘটনাটি পড়েছিলাম, এক আপুর লিখা।

তিনি লিখেন, পর্দা করার বিষয়টি সেদিন থেকে ভালোমতো উপলব্ধি করলাম, যেদিন দেখলাম বাসে একজন মহিলা তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া একটা জিনিস তোলার জন্য নিচের দিকে ঝুঁকছেন। তখন ক্লাস সিক্সে পড়া একটা ছেলে নিচে ঝুঁকে থাকা সেই মহিলার দিকে তাকিয়ে আছে!


রেফারেন্সঃ
১। সুনানে আন নাসাঈ, হাদীস নাম্বার ৩১০৪।
২। সহিহ বুখারী, হাদীস নাম্বার ৩২৪১।
৩। সহিহ বুখারী, হাদীস নাম্বার ৩৮২০।
৪। সূরা আত-তাহরীম, আয়াত নাম্বার ১০।
৫। সিরাত ইবনে হিশাম, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১।
৬। Story of a dancer conversation to Islam, Tariq Jameel.


লেখক: আরিফুল ইসলাম

কোন মন্তব্য নেই