পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ইফতার পার্টি কালচার: এপিঠ ওপিঠ


সোসালাইজেশন—সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন সুরক্ষা ইসলামের সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান, সংস্কৃতির অংশ। সরাসরি আল্লাহর ইবাদাতের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু হুকুমের মধ্যেও সামাজিক সম্মিলনের উপাদান রয়েছে।

প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে সালাত, জুম’আহ, দুই ঈদের সালাত—ইত্যাদি আমলগুলো কেবল আল্লাহর ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত হলেও এগুলোর মাধ্যমে সামাজিক সম্মিলনও ঘটে। পরস্পরের দেখা-সাক্ষাত, কুশল বিনিময়, ভালোমন্দ খোঁজ-খবর রাখার কাজটিও সারে।

এছাড়াও, যাকাত আদায়, সাদাকাতুল ফিতর প্রদান, ঐচ্ছিক দান-সাদাকা প্রদান, উপহার-উপঢৌকন বিনিময়, প্রতিবেশির হক আদায়, বিয়ের ওয়ালিমা, নবজাতকের আকিকা— ইত্যাদি নানারকম উপলক্ষ ইসলাম নির্মাণ করেছে সামাজিক সম্পৃতি সুরক্ষার জন্য।

নববী যুগ, খুলাফা আর রাশিদূনের যুগ, তাবিউন, তাবিউত তাবিঈন, আয়িম্মাহ মুজতাহিদিনসহ মুসলিম মনীষীদের জীবনে আমরা এসব ‘আমলের বেশ চর্চা দেখতে পাই। এর মাধ্যমে যে সমাজ তারা নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে পারস্পারিক সম্প্রীতি যথেষ্ঠ উন্নত ছিল বলেই আমরা জানি।

আমাদের বর্তমান সমাজে এই ‘আমলগুলো কতখানি চর্চা হয় তা বিবেচনার ভার আপনার উপর। এ আমলগুলো ‘আমাদের’ সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য যথেষ্ঠ প্রতীয়মান না হওয়া, কিংবা অজানা অন্য কোনো কারণে আমাদের সমাজে নতুন কালচার তৈরি হয়েছে ‘ইফতার পার্টি’।

ইসলামের অনেক রকম ‘ইবাদাত রয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হলেও স্থানীয় ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। সালাত, হাজ্জ, যাকাতের যেমন ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে তেমনি রামাদানেরও রয়েছে।

রামাদানের মূল উদ্দেশ্য সোশালাইজেশন নয়, বরং সেলফ একচুয়ালাইজেশন বা আত্ম উন্নয়ন। নীরবে নিভৃতে আল্লাহর ‘ইবাদাত করা; আল্লাহর সাথে একান্ত গভীর সম্পর্ক বিনির্মান। একারণে ই’তিকাফ রামাদানের একটা অংশ। দিনের সিয়াম আর রাতের কিয়াম একান্তই নিভৃত ইবাদাত কর্ম। কেবল প্রভু আর তার ভৃত্যের মধ্যে গভীর লেনদেন, একান্ত আলাপন।

সেখানে রামাদানে এই রকম পাল্লা দিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন রামাদানের এসেন্সের সাথে কতটা যায়, তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, কর্পোরেট আগ্রাসন এই পাল্লার আগুনে ঘি ঢেলেছে। সারা বছরের নিন্দিত নানা কর্ম, ধর্মের বিরোধিতাকে এই মাসে তারা ইফতার পার্টির মখমল চাদরে ঢেকে দেয়। তাদের ধর্মবিদ্বেষী চেহারার ওপরে খুব অনায়াসেই এসব উপলক্ষ কাজে লাগিয়ে ধার্মিকতার প্রলেপ লাগিয়ে দেয়।

সমাজের কল যেহেতু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইশারা আর কর্পোরেট কাঠিতেই নড়ে, তাদের চর্চাকেই যেহেতু স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়, তাই ইসলামিক সমাজের লোকেরাও এসব অনুষ্ঠানগুলোর পালে হাওয়া দিচ্ছে। অথচ এসব সিজনাল ধার্মিকতা যে কতটা বকধার্মিকতা, সেটা তারাও জানে।

কর্পোরেটগুলোর এসব অনুষ্ঠান আর বিজ্ঞাপন যে আসলে কেবলই তাদের মার্কেটিং আর বাণিজ্যিক প্রচারণার উপলক্ষমাত্র, তা কে না জানে!

কেউ কেউ এই আলোচনায় রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব-সংশ্লিষ্ট হাদীস নিয়ে আসবেন জানি। কিন্তু আপনার কি মনে হয় এসব হাদীস সাহাবীরা জানতেন না? তাহলে তারা ইফতার করানোর এই ফজিলত অর্জন করার জন্য কী করতেন, কীভাবে করতেন সেটা একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন।

দেখুন সেখানে ইফতার পার্টি (মাহফিলুল ইফতার) নামক কোনো অনুষ্ঠান দেখতে পান কি না। যদি না পাওয়া যায়, তবে এর মধ্যে বাহ্যিক কিছু কল্যাণের রোশনাই দেখা গেলেও সারবস্তু এখানে কিছুতেই থাকার কথা নয়। যদি সারবস্তু কিছু থাকত, তাহলে সাহাবিরা কিছুতেই নিজেদেরকে তা থেকে বঞ্চিত করতেন না।

সোশালাইজেশনের গুরুত্ব ইসলামে মোটেই কম নয়; কিন্তু তার বিশেষ সময় রামাদান নয়। রামাদান বাইরের কাজকর্ম, গণসংযোগ কমিয়ে একান্ত ‘ইবাদাতের প্রতি নিবিষ্ট হওয়ার সময়। রামাদানের শেষে ঈদে আপনি সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার কাজটি অনেক ভালোভাবে করতে পারেন।

বাসা থেকে দূরে গিয়ে ইফতার করতে গেলে ইফতারের পর একটু রেস্ট নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না; এমতাবস্থায় তারাবিহ আদায়ে মনসংযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়ারই কথা। আর সারা দিনের রোজা শেষে এভাবে বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে বিছানায় গেলে শেষ রাতে ওঠাটাও আরও কষ্টকর হয়ে যায়—হয়েই ওঠে না অনেক সময়।

আর আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকের অবস্থা না হয় বর্ণনা না-ই করলাম। এখানে কোনো কিছুই সহজে হয় না; তাদের ধুম ছুটে যায় সামান্য একটু অনুষ্ঠান আয়োজনে। যদি ঘরে আয়োজন হয়, তবে মহিলাদের উপর এটা যথারীতি জুলুমের পর্যায়ে নেমে আসে।

সারাদিন রোজা থেকে বিকেলবেলা রান্না ঘরের স্টিমরুমের মধ্যে তাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। আর এটা স্বাভাবিক কারণেই তাদের ‘ইবাদাত-বন্দেগিতে ব্যাঘাত ঘটায়।

আর এই আনুষ্ঠানিকতার সূত্র ধরেই আজ ইফতার ছাড়িয়ে সেহরি পার্টি পর্যন্ত পৌঁছেছে সংস্কৃতি। কিছুদিন পর দেখবেন এটাও আমাদের গা সওয়া হয়ে যাবে; এরপর হয়তো আমরাও আয়োজন শুরু করব—আল্লাহ মা’ফ করুন।

আপনি যদি কেবল বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়-সজনদের আপ্যায়ন করে আতিথেয়তার সওয়াব অর্জন করতে চান, সেজন্য বাকি এগারটা মাস পড়ে রয়েছে। কেউ আপনাকে মানা করবে না। আপনি তখন ইচ্ছেমতো আয়োজন করতে পারবেন।

আপনি যদি রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব অর্জন করতে চান, তাহলে অনুষ্ঠান করা ছাড়াও তা অর্জন করতে পারেন।

মাসজিদে পথচারী কিংবা মুসল্লিদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়, সেখানে অংশগ্রহণ করুন। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সত্যিকারে ইফতারের মুখাপেক্ষীদের মাঝে ইফতার বিতরণের ব্যবস্থা করে থাকে; তাদের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করুন।

সবেচেয়ে ভালো হয়, আপনার এলাকায় যারা সত্যিকার মুখাপেক্ষী, তাদের অর্থ কিংবা ইফতারি আইটেম কিনে আগে থেকেই সরবরাহ করতে পারেন।

শেষ কথা হলো “ধর্ম যার যার অনুষ্ঠান সবার” এমন শ্লোগান আপনারা নিশ্চয় শুনেছেন। এ শ্লোগান যারা দিয়েছেন, তারা বুঝে দিন আর না বুঝে দিন, মুসলিমদের জন্য এর পরিণতি ভয়াবহ।

এর মাধ্যমে ইসলামের সকল ‘ইবাদাত নিছক সামাজিক অনুষ্ঠানে রুপান্তরিত হবে। এগুলোর মধ্য থেকে সত্যিকার ‘ইবাদাতের এসেন্স উঠে গিয়ে কেবল সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হবে।

এই যে অশুভ প্রক্রিয়া সমাজে শুরু হয়েছে, ইফতার পার্টি আয়োজনের মধ্য দিয়ে দয়া করে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবেন না।

পরিবেশেনায়: SEAN Publication (বিশুদ্ধ জ্ঞান | বিশ্বমান)

কোন মন্তব্য নেই