পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

আল্লাহর একটা নিদর্শন


❒ এক.
ক্লাসে ম্যাম এক মেয়েকে দাঁড় করালেন। মেয়েটি ছিলো বিবাহিতা। ম্যাম পাঁচজনের একটা লিস্ট মেয়েটির হাতে দিলেন। মেয়েটা লিস্টের নামগুলো পড়তে লাগলো। তার বাবা-মায়ের নাম, স্বামীর নাম, সন্তানের নাম, বোনের নাম, বেস্ট ফ্রেন্ডের (বান্ধবী) নাম।

এবার ম্যাম বললেন, “এই পাঁচজনের নাম থেকে তোমাকে একজনের নাম কেটে ফেলতে হবে!” অর্থাৎ, মেয়েকে তার প্রায়োরিটি লিস্ট পাঁচজন থেকে চারজনে নিয়ে আসতে হবে। মেয়েটি একটু সময় নিয়ে তার বান্ধবীর নাম কেটে দিলো। ম্যাম বললেন, “এবার আরেকজনের নাম কেটে ফেলো।” মেয়েটি আরো কিছুক্ষণ চিন্তা করে তার বোনের নাম কেটে ফেললো। বোনের নাম কেটে তার খারাপ লাগা শুরু হলো।

ম্যাম তার খারাপ লাগা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এবার আরেকজকে বাদ দাও।” বাবা-মা, সন্তান আর স্বামী। কাকে রেখে কাকে বাদ দিবে? এবার মেয়েটি অনেকক্ষণ সময় নিলো। ম্যাম তাড়া দিলেন- “এতো সময় নিলে তো হবে না, তাড়াতাড়ি করো।” বাবা-মায়ের নামটা কাটতে গিয়ে মেয়েটি কান্না করে দিলো। যারা তাঁকে জন্ম দিয়েছেন, বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন প্রায়োরিটি লিস্ট থেকে তাদের নাম বাদ?

কান্না শেষে সে চোখ মুছলো। এবার ম্যাম বললেন, “সন্তান আর স্বামী, এই দুজন থেকে একজনকে বাদ দিতে হবে।” কথাটি শুনে মেয়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করলো। কান্নাভেজা কন্ঠে ম্যামকে বললো, “ম্যাম, আমাকে আর কষ্ট দিবেননা, প্লিজ। এই দুটো থেকে আমি বাদ দিতে পারবো না। একজনের শরীরের সকল উপাদান- রক্ত, মাংস সবই আমার শরীরের অংশ। তাকে আমি কিভাবে বাদ দেবো? আরেকজন আমার স্বামী। তাকেই বা কিভাবে বাদ দেই?”

ম্যাম জোর করলেন। “না, তোমাকে বাদ দিতেই হবে।” মেয়েটা এবার অনেক সময় নিলো। ম্যামও এবার তাড়া দিলেন না। সন্তানের নামটা কেটে দিয়ে সে মরাকান্না শুরু করলো। তাকে তার বান্ধবীরা স্বান্তনা দিয়ে বললেন, ‘বোকা মেয়ে, তোর সন্তানের তো কিছুই হয়নি। এটাতো একটা গেইম।” মেয়েটি কিছুক্ষণ পর যখন শান্ত হলো তখন ম্যাম জিজ্ঞেস করলেন, “এবার বলো, তুমি প্রথমে তোমার বান্ধবীর নাম বাদ দিলে কেন?”

মেয়েটি বললো, “বেঁচে থাকার জন্য বান্ধবী দরকার আছে। তবে মা-বাবা, স্বামী-সন্তানের সাথে বান্ধবী আর বোন হলো খাবারের সাথে সালাদের মতো। এগুলো লাগে, কিন্তু না থাকলেও চলে। তখন মা হয়ে যান বান্ধবী, স্বামী হয়ে যায় বন্ধু।”

“বুঝলাম। কিন্তু, তোমার বাবা-মা, সন্তানের নাম বাদ দিলে কেন?”

মেয়েটি একটু ইমোশনাল হয়ে বললো, “এটা ছিলো সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। মা-বাবা আমাকে জন্ম দিয়েছেন আর আমি আমার সন্তানকে জন্ম দিয়েছি। তিনজনের সাথেই আমার রক্তের সম্পর্ক। দেখুন, আমার মা-বাবা আমাকে আমার স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছেন। স্বামীর সংসারই এখন আমার-আমাদের সংসার। কখনো ছুটি পেলে মা-বাবার সাথে দেখা করতে যাই। দুঃখজনক হলেও সত্য, মা-বাবা আজকে আছেন কয়েকবছর পর আর থাকবেন না। আদরের সন্তান আজকে আছে কিন্তু সে পড়ালেখা করার জন্য দেশ-বিদেশে যাবে, চাকরি করে আমাদের ছেড়ে থাকবে, বিয়ে করে হয়তোবা তার স্ত্রীর সাথে আলাদা থাকবে। কিন্তু, যার সাথে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি থাকবো তিনি হলেন আমার স্বামী। আমার স্বামী হলো এই দুনিয়ায় আমার শেষ আশ্রয়স্থল। একসাথে আমাদের যৌবন ছিলো, বেঁচে থাকলে একসাথে আমাদের বার্ধক্য আসবে।”
(গল্পটি বহুল আলোচিত একটা গল্প। লোকমুখে শোনা।)

❒ দুই.
ওহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ শহীদদের আত্মীয়-স্বজনকে মৃত্যু সংবাদ দেন। হামনাহ বিনতে জাহশ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নামের একজন নারীকে রাসূল ﷺ বললেন, “ধৈর্য ধরো আর আল্লাহর পুরস্কারের আশায় সন্তুষ্ট থাকো।”

হামনাহ (রা.) বুঝে ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! কে মারা গেছেন?”

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তোমার ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.)।”

হামনাহ (রা.) ইন্নালিল্লাহী... পড়ে ভাইয়ের জন্য দু’আ করেন।

এরপর আবার রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “ধৈর্য ধরো আর আল্লাহর পুরস্কারের আশায় সন্তুষ্ট থাকো।”

হামনাহ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আর কে মারা গেছেন?”

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তোমার চাচা হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)।”

হামনাহ (রা.) আবার ইন্নালিল্লাহী... পড়ে চাচার জন্য দু’আ করেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ আবারও বললেন, “ধৈর্য ধরো আর আল্লাহর পুরস্কারের আশায় সন্তুষ্ট থাকো।”

হামনাহ (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আর কেউ কি মারা গেছেন?”

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘হ্যাঁ। তোমার স্বামী মুস’আব ইবনে উমাইর (রা.)।”

স্বামীর মৃত্যু সংবাদ শুনে হামনাহ (রা.) আর সহ্য করতে পারলেন না। চিৎকার দিয়ে উঠেন। ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ তাঁকে টলাতে পারেনি, চাচার মৃত্যু সংবাদ তাঁকে টলাতে পারেনি, কিন্তু স্বামীর মৃত্যু সংবাদ তাঁকে মর্মাহত করেছে। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ মন্তব্য করেন, “নিশ্চয়ই নারীর কাছে তার স্বামী ভালোবাসা বিশেষ কিছু; যা আর কারো জন্য নেই।” [সুনানে ইবনে মাজাহঃ ১৫৯০]

❒ তিন.
একজন মেয়ে বিশ-বাইশ বছর একটা বাড়িতে কাটায়। বাড়ির মানুষজন থেকে শুরু করে বাড়ির ইট-পাথরের সাথে পর্যন্ত তার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। বাড়িতে তার নিজের বিছানা থাকে, আলমারি থাকে, পড়ার টেবিল থাকে, খাবারের প্লেট-গ্লাস থাকে। সৌখিন মেয়ে হলে বাড়িতে তার ফুলের টব থাকে, বাগান থাকে, পোষা বিড়াল থাকে, কবুতর থাকে।

হঠাৎ একদিন একটা ছেলে তার পরিবার নিয়ে এসে তাকে পছন্দ করলো, সেও তার মত দিলো। কয়েকদিনের মধ্যে তিনবার ‘কবুল-কবুল-কবুল’ বলে সে তার বিশ-বাইশ বছরের স্মৃতিকে পেছনে রেখে একটা ‘অপরিচিত’ মানুষের হাত ধরে তার বাড়িতে উঠলো। সে হয়তো নিজের বাড়ি ছাড়া কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারতো না, নিজের বিছানা ছাড়া অন্য কোনো বিছানায় হয়তোবা তার ঘুম আসতো না, নিজের পোষা পাখি বা নিজের হাতে পরিচর্যা করা বাগানে কিছুক্ষণ সময় না দিলে তার দিনটা যেন অপূর্ণ থেকে যেতো। সেই মেয়েটা এতোদিন যে বাড়িকে ‘নিজ বাড়ি’ বলতো কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করার পর সেই বাড়িকে তার বলতে হচ্ছে ‘বাপের বাড়ি’!

(ছোটবেলায় আমার ছোটো খালামণির সাথে এটা নিয়ে আমার ঝগড়া হতো। তাকে জিজ্ঞেস করতাম- তোমার বাড়ি কোনটা? স্বামীর বাড়ি নাকি বাপের বাড়ি? প্রথম প্রথম তিনি বলতেন আমার বাপের বাড়িই আমার বাড়ি। আট বছর পর এখন তাঁর সুর পাল্টেছে!)

ছোটবেলায় খালা-ফুফদের সাথে আমার বেশি সময় কাটতো। একে একে তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পরদিন ওয়ালিমায় বরের বাড়ি গেলে তারা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতো- উনি আমার শাশুড়ি, ও আমার ননদ, ও আমার ননদের ছেলে...।

আমার অবাক লাগতো। একদিনের ব্যবধানে আমার ফুফু-খালা তাঁর স্বামীর সম্পর্কের সবাইকে ‘আমার’ বলে সম্বোধন করছেন। তাঁর স্বামীর সম্পর্কের মানুষরা যেন একটা পক্ষ আর আমরা যারা ওয়ালিমায় আসছি তারা আরেকটা পক্ষ। অথচ দুদিন আগেও ফুফু-খালাকে নিয়ে আমরা ছিলাম এক পক্ষ। হঠাৎ করে তিনি নতুন একদল মানুষকে ‘আমার-আমার’ বলে ডাকছেন বলে আমার কিশোরমন কষ্ট পেতো। আমি কান্না করতাম।

ভালোবাসার এই ক্যামিস্ট্রিটা আমি বুঝতে পারতাম না। আমি বুঝতে পারতাম না কিভাবে অপরিচিত দুজন মানুষ হঠাৎ করে আপন হয়ে যায়। যে মেয়েটা জীবনে কোনোদিন তাঁর হাতটা কাউকে ধরতে দেয়নি, সেই মেয়েটা তাঁর সর্বস্ব বিলিয়ে দিচ্ছে একজন অপরিচত মানুষকে? তিনবার ‘কবুল’ বলার মধ্যে কী এমন ক্ষমতা আছে? ‘কবুল’ শব্দটার মধ্যে কী এমন জাদু আছে? যেই জাদুমন্ত্রে একটা মেয়ে যা ধরে এতোদিন আঁকড়ে ছিলো সবই ছেড়ে চলে যায়?

একদিন কুর’আন পড়তে গিয়ে শৈশবের Mystery Box -এ জমা সেই রহস্য উন্মোচন করি।

যে প্রশ্নটা এতোদিন ধরে মাথায় ঘুরঘুর করতো তার উত্তরটা খুঁজে পাই।

আধুনিক ইতালির রাজধানীর নাম রোম। পবিত্র কুর’আনের একটি সূরার নাম এই রোম। আল্লাহ এই সূরার একটা আয়াতে বলেন,

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাঁদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা করে।” [সূরাহ আর-রূম, আয়াত : ২১]

এই আয়াতটা ছোটবেলার বিয়ে নিয়ে আমার যে কৌতুহল ছিলো তার উত্তর দিয়ে দেয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে ভালোবাসা তৈরি হয় আল্লাহ প্রথমে এটাকে বলেছেন তাঁর নিদর্শন-মিরাকল। এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরি হয়? আল্লাহ বলেন, তিনি নিজেই এই ভালোবাসা স্বামী-স্ত্রীর অন্তরে ইন্সটল করে দেন। সুবহানআল্লাহ!

ছোটবেলা থেকে আমি চিন্তা করতাম, বিয়ের পর কিভাবে দুজন মানুষ এতো আপন হয়ে যায়? দুজন মানুষ কিভাবে একে অপরকে নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়?

আল্লাহ একই আয়াতে এটাকে আল্লাহর নিদর্শন বলে একটা শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন ‘যারা চিন্তা করে’। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটা উপহার, একটা ব্লেসিং এটা তো তখনই বুঝতে পারবো যখন আমরা এটা নিয়ে একটু চিন্তা করবো।

সেই মেয়েটি কেন তার স্বামীকে প্রায়োরিটি লিস্টের শেষ অপশন রেখে মা-বাবা, সন্তানকে বাদ দিয়েছে, হামনাহ (রা.) কেন আপন ভাই আর চাচার শোকে বেশি মর্মাহত না হয়ে স্বামীর শোকে বেশি মর্মাহত হন এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই কুর’আনের আয়াতটিতে।

এই ভালোবাসাটি আল্লাহর একটা নিদর্শন।
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂
লেখাঃ আরিফুল ইসলাম (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)

কোন মন্তব্য নেই