ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস (১ম পর্ব)


আওরংগজেব কি আসলেই নিষ্ঠুর বাদশাহ ছিলেন?

প্রকৃত ইতিহাস জানা না থাকলে অনেক সময় ভালো মানুষকেও খারাপ এবং খারাপ মানুষকেও মহা মানব বলে মনে হয়। আমরা আমাদের ছোটোবেলায় অমুসলিমদের রচিত ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, বাদশাহ আওরংগজেব (যিনি টুপি সিলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, রাত জেগে তাহাজ্জুদ সালাত পড়তেন), তিনি তার আপন দুই ভাইকে হত্যা করেছিলেন। ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত একজন মানুষের এমন কঠোর আচরণ যা রাজা-বাদশাহদের মাঝে খুব সাধারণ ছিলো, বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দিতো। মনে হতো, ইশ! কি দরকার ছিলো আপন দুই ভাইকে হত্যা করার জন্য? নিজের ভাইদেরকে নিষ্ঠুরভাবে একেবারে না মেরে জেলখানায় বন্দী করে রাখলেইতো হতো। ভাবতাম বাদশাহ আওরংগজেব ধার্মিক ব্যক্তি হলেও হয়তোবা ক্ষমতার লোভ বা অহংকার থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। যাইহোক, পরবর্তীতে প্রকৃত ইতিহাস জানার পর আমার ধারণা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়।

বাদশাহ আওরংগজেব তার যে দুই ভাইকে হত্যা করেছিলেন, তাদের একজন হচ্ছে দারাশিকো। দারাশিকো তার পথভ্রষ্ট দাদা আকবরের মতো হিন্দু ধর্ম ও সূফীবাদের সমন্বয়ে নতুন একটা ধর্ম প্রচার করা শুরু করেছিলো। এছাড়া তারা শিরক ও কুফুরী আক্বীদাহর অনুসারী শিয়াদেরকে বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে বসিয়ে তাদেরকে শক্তিশালী করেছিলো। এই যদি হয় সত্যি ঘটনা, তখন আমি অন্তর থেকে দুয়া করি, নিজের ভাই হওয়া সত্ত্বেও বাদশাহ আওরংগজেব আল্লাহর এই দুশমনকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তার গুনাহ-খাতা মাফ করুন, তার প্রতি রহম করুন ও পরকালে তাকে সম্মানিত করুন।

গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঃ

যাচাই-বাচাই না করে একজন কাফিরতো দূরের কথা, একজন ফাসিক (পাপাচারী মুসলমানের) কথাও বিশ্বাস করতে আল্লাহ তাআ’লা নিষেধ করেছেন (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ৬)। আমরা হিন্দু ঐতিহাসিকদের বলতে শুনি Akbar The Great বা মহামতি আকবার। আর আওরংগজেবকে দেখানো হয় সাম্প্রদায়িক, অত্যন্ত জালিম ও নিষ্ঠুর বাদশাহ হিসেবে। অথচ আকবার তার হিন্দু রাজপুত স্ত্রী যোধাবাঈকে খুশি করার জন্য ‘দ্বীনে ইলাহী’ নামে বিভিন্ন ধর্মের মিশ্রণে নতুন একটা ধর্ম প্রচার করেছিলো, যেখানে হিন্দু ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিলো আর ইসলামের প্রতি ছিলো বিদ্বেষী মনোভাব। অপরদিকে আওরংগজেব ছিলেন ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়নকারী, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। হিন্দু, মুনাফিক, সেকুলার (ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী) ও কাফির ঐতিহাসিকদের আওরংগজেব প্রতি বিদ্বেষের কারণ বুঝতে আমাদের কষ্ট হওয়ার কথা না। এমনকি মুসলিম ব্যক্তিত্বদের চরিত্রে কালিমা লেপনের জন্য আজকালকার মুসলমানদের মাঝে জনপ্রিয় অনেক হিন্দু সাহিত্যিকেরাও মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় কম যায়নি। বিখ্যাত(!) ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে আওরঙ্গজেবকে একজন বিশ্বাসঘাতক বাদশাহ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বাদশাহ আওরংগজেব উপমহাদেশে নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্যে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শরীয়াহ অনুযায়ী মুসলমানদের থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ও হিন্দু বা কাফিরদের থেকে জিযিয়া (ট্যাক্স) আদায় করা জারি রাখেন। মুসলমানদের রক্ষার জন্যে তিনি শিখ মারাঠাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। ইসলাম বাস্তবায়নের কারণে ভারতের সেকুলার গোষ্ঠী আজ পর্যন্ত তাকে গালিগালাজ করে। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তিনি ‘হানাফী মাযহাবের’ আলেম ছিলেম। তার শাসনামলে হানাফী মাযহাবের আলেমরা একটা ফতোয়ার বই সংকলন করেছিলেন, যা “ফতোয়ায়ে আলমগিরি” নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, বাদশাহ আওরংগজেবের উপাধি ছিলো আলমগীর।

তথ্যসূত্রঃ “শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ ) ও তাঁর চিন্তাধারা”। লিখেছেন জুলফিকার আহমাদ কিসমতী।

Post a Comment

Previous Post Next Post