পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

দিনে দিনে বাড়ছে যে ভালোবাসা

আলহামদুলিল্লাহ্‌, আসসালাতু আসসালাম আলা রসুলুল্লাহ, ওয়ালা আহলিহি ওয়া আসহাবিহি ওয়ামান ওয়ালা ।

ছোটবেলা থেকেই ইসলামী মূল্যবোধ গুলো সম্মান করার শিক্ষা পেয়েছিলাম পরিবারের কাছ থেকেই। কিন্তু ইসলামকে কাছ থেকে জানা কিংবা ইসলামের সৌন্দর্য্যগুলো অন্তর দিয়ে অনুধাবন করানোর জন্য যে শিক্ষা, তা সমাজের আর ১০জনের মত আমার মধ্যেও ঘাটতি ছিল, এখনও আছে।

আসলে ইসলামকে গ্রহণ করার মধ্যেই যে সত্যিকারের আধুনিকতা, এর মাঝেই যে একজন মুক্তমনার প্রকৃত মুক্তি নিহিত- এই শিক্ষাটা দেয়া আমাদের পারিবারিক কিংবা সামাজিক শিক্ষার অংশই মনে করা হয় না। মনে করা হয়, “মুসলিম ঘরে জন্মাইছিস, এখন নামাজ পড়, রোজা রাখ- এটা কর, ওইটা কর।” ঠিক যেমন করে একজন বিধর্মীর সন্তান তার ধর্মীয় আচার অনুষ্টান পালন করে যাচ্ছে, ঠিক তেমন করেই একজন মুসলিমের সন্তানও তার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে গর্ববোধ করার শিক্ষাটা আসছে না। আপন রবকে চেনার বা জানার শিক্ষাটা আসছে না। নিজের ধর্মটাকে সঠিকভাবে জানার শিক্ষাটাও আসছে না। আর এজন্যই আল্লাহকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসার স্পৃহা অন্তরে জাগছে না, ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝবার স্পৃহাও অন্তরে সৃষ্টি হচ্ছে না।

কেন আমি মুসলিম? কেন আমাকে ইসলামই পালন করতে হবে? কে আমার রব? কি তার পরিচয়? আমার রবের নাম আল্লাহ- এই উত্তরই কি যথেষ্ট? নাকি আমার রবের আরও পরিচয় আমার জানা উচিৎ? ইসলামই কেন সত্য ধর্ম? ইসলাম কি সত্যিই আমাকে মুক্তি দিতে পারবে? অন্যান্য জীবন ব্যাবস্থার সাথে ইসলামের পার্থক্য কোথায়? কোথায় গিয়ে ইসলাম
অন্যান্য জীবন ব্যাবস্থা থেকে উপরে উঠে গেল?

আমার জন্য ইসলামকে জীবন ব্যাবস্থা হিসেবে মেনে নেয়া অনেক পুরোনো কথা। কিন্তু ইসলামের প্রেমে পড়ে গেছি এটা হচ্ছে নতুন কথা। প্রতিনিয়তই পড়ছি। আজ সকালেও পড়েছি। শেষ নিঃশ্বাসের আগ অব্দি এভাবেই প্রেমে পড়তে চাই।

গত ৪ বছরের বেশি সময় ধরে ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান গরিমার পরিধির তুলনায় অনেক অনেক ছোট। বিশাল এক বৃত্তের একেবারে কোনায় পড়ে থাকা একটি বিন্দু মাত্র। ১ম বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় যখন ভ্রুণবিদ্যা পড়ছিলাম, তখন একবার নতুন করে ইসলামের প্রেমে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

প্রফেসর সাহারা আমাদের এম্ব্রায়লজি পড়াতেন। তো, একদিন তিনি পড়াচ্ছিলেন কি করে আমাদের কিডনী তৈরী হয়। আর কি করে আমাদের টেস্টিস পেটের ভেতর থেকে স্ক্রুটামে চলে আসে। ম্যাম বলছিলেন, প্রথমে কিডনী থাকে তলপেটের ভেতর। আর টেস্টিস থাকে বুকের পাজর আর মেরুদন্ডের মাঝের মাঝের অংশে। সেখান থেকে টেস্টিস আস্তে আস্তে নিচে নামতে থাকে আর কিডনী উপরে উঠতে থাকে। এরপর কিডনী মোটামোটি চলে যায় যেখানে টেস্টিস ছিল, সেখানে। কিন্তু যখন টেস্টিস নিচে নামতে থাকে, তখন তার রক্তনালীগুলো নিয়ে আসে পিঠের সেই জায়গা থেকেই। তখন মাথায় চলে আসলো সুরা আত-তারিকের কিছু আয়াত (৫-৭)। 'অতএব মানুষ যেন (ভেবে) দেখে তাঁকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে! তাঁকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে বেগে নির্গত এক পানি (বীর্য) থেকে। যা বেরিয়ে আসে মেরুদন্ড ও পাজরের মধ্য থেকে।'

এটা তো শুধু ১টা উদাহরণ। এমন হাজারটা উদাহরণ আছে। এমন খুব কম দিন যায়, যখন এই মানবদেহ আমাকে মুগ্ধ করে না। প্রতিটা জায়গায় এত এত চমৎকার ডিজাইন যে, বলে শেষ করা যাবে না। মাঝে মাঝে মনে হয় পুরো মেডিক্যাল সাইন্সটা হচ্ছে আসলে সুরা আত তীনের ৪ নাম্বার আয়াতের তাফসির- “অবশ্যই আমি মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর গঠনে সৃষ্টি করেছি।”

এই ডিজাইন দেখে যে শুধু ডাক্তারাই মুগ্ধ হয় তা না, বরং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার থেক শুরু করে আর্কিটেকচার- যে কেউই এই ডিজাইনে মুগ্ধ হতে বাধ্য।

প্রথমত, মহান সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন শ্রেষ্ট ডিজাইনার।

দ্বিতীয়ত, তার ডিজাইনের ব্যাখ্যা ইসলামের মত করে নিখুঁতভাবে আর কোন ধর্মই দেয় না।

মাঝে মাঝে বলতে শোনা যায়, এই পৃথিবীর সব ধর্মের মূল কথা একই। সত্য বল, সৎ পথে চল, মিথ্যা বলবে না... ইত্যাদি ইত্যাদি । প্রথমত আমি কথাটির সাথে একমত না। তবে যদি যুক্তির খাতিরে ধরেও নেই যে একই কথা বলে, তবুও ইসলামের ব্যাপারটা একটু বেশিই সুন্দর। ইসলাম শুধু বলেই না যে ভালো কাজ কর। ইসলাম দেখিয়েও দেয় ভালো কাজটা কেমন করে করতে হবে। ইসলামের এই বিষয়টা আমার খুব বেশি ভালো লাগে। ইসলাম যতটা না তাত্বিক, এরচেয়েও অনেক বেশি বাস্তবিক।

যেমন, অন্যের সাথে ভালো ব্যাবহার কর- এটা প্রায় সব ধর্মেরই একটি অভিন্ন শিক্ষা। কিন্তু ইসলাম শিখিয়ে দেয় কি করে ভালো ব্যাবহার করতে হবে। একেবারে ছোট্ট একটা উদাহরণঃ খুব অবাক লাগে, হাসি বিষয়টাকে ইসলাম এত চমৎকার করে ভালো ব্যাবহারের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। কত ছোট একটা কাজ। কত সহজ একটা কাজ। অথচ রসুল (সঃ) শিখিয়ে গেলেন, হাসি দিয়ে কথা বলা হচ্ছে সদাকা। কি অবাক কান্ড। হাসলেও নাকি সওয়াব হবে। ইসলামকে ভালো না বেসে যাবো কোথায়?

আসলে ইসলাম ভালো কাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে দেয়।

আমার এক বন্ধু সেদিন একটা কথা বলছিবলছিল, “মানুষ মনে করে, সকাল থেকে মধ্যরাত্রির কর্মকান্ডের সব কিছুই ইসলাম শিখিয়ে দেয়। তাহলে কি আমার কিছু করার নেই? মানে আমি নিজে যা চাই তা করতে পারব না? বরং, ব্যাপারটা এভাবে দেখলে কাধের বোঝা কত হালকা হয়ে যায় যে, ইসলাম আমাকে যখন শিখিয়েই দিয়েছে কি করলে আমার রব আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন, সেই ক্ষেত্রে আমাকে আর আগ বাড়িয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।”

ইসলামের একটা বিষয় আমার অনেক ভালো লাগে। যা হচ্ছে ইসলাম একমাত্র আশার ধর্ম। আল্লাহ্ সুবহানু তাঁর কথায় যেমন ভয় দেখিয়েছেন, তেমন আশাও দেখিয়েছেন। ভুল করলে ফিরে আসো, আল্লাহও তোমাকে গ্রহন করে নেবেন। তাওবাহ্ করতে আসলে রসুলও (সঃ) তাকে সাদরে গ্রহন করে নিতেন। ইসলাম শেখায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার জন্য আমার রবের দরজা কখনো বন্ধ হবে না।

ইসলামের মত এত ডায়নামিক জীবন ব্যাবস্থা আর দ্বিতীয়টি নেই। ইসলামের মূল গ্রন্থ ১৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। কিন্তু, অবাক করা বিষয়, কি নেই এতে? ৬২০-৩০ সালের সেই স্ট্যান্ডার্ড দেখে ২০১৫’র সমস্যাও নিখুঁতভাবে সমাধান করা সম্ভব। অথচ মানুষ সংবিধান বানায়, তা উপর কাটাছিড়া করে। তবুও সব এক করে নিতে পারে না। ইসলাম স্রষ্টার ধর্ম বলেই তো তা সম্ভব । ।

ইসলামকে কেন ভালো লাগে তা আসলে অল্প কিছু কথায় বলে শেষ করে দেয়া সম্ভব নয়। যদি আমি এই ভালোবাসার কথা ৫ লাইন বলি, তাহলে ৫০ লাইন ভালোবাসার অনুভুতি অন্তরে কাজ করে। সেই ভালোবাসার কথা লেখা বা বলা সম্ভব নয়। তবে আশা করি, যার জন্য এই ভালবাসা, তিনিই বুঝতে পারবেন এই ভালোবাসার সত্য-মিথ্যা ও গভীরতা।


লিখেছেন: সাঈদ আল মনসুর ইনাম (EMC)

কোন মন্তব্য নেই