পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

কিয়ামতের অন্যতম আলামত : দাজ্জাল ও ঈসা (আ.) এর অবতরণ

দাজ্জালের আগমন

দাজ্জাল অর্থ প্রতারক। ইসলামী পরিভাষায় কিয়ামতের পূর্বে যে মহা প্রতারকের আবির্ভাব হবে তাকে ‘মাসীহ দাজ্জাল’ বলা হয়। যে নিজেকে ‘ঈশ্বর’ বা ‘ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী ব্যক্তিত্ব’ বলে দাবি করবে এবং তার ঈশ্বরত্ব প্রমাণের জন্য বহু অলৌকিক কর্মকা- দেখাবে। অনেক মানুষ তাকে বিশ্বাস করে ঈমানহারা হবে। দাজ্জাল বিষয়ক হাদীসগুলো মুতাওয়াতির পর্যায়ের। এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করছি।

(১) আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন:

ثُمَّ ذَكَرَ الدَّجَّالَ، فَقَالَ: إِنِّى لأُنْذِرُكُمُوهُ، وَمَا مِنْ نَبِىٍّ إِلاَّ أَنْذَرَهُ قَوْمَهُ… وَلَكِنِّى أَقُولُ لَكُمْ فِيهِ قَوْلاً لَمْ يَقُلْهُ نَبِىٌّ لِقَوْمِهِ ، تَعْلَمُونَ أَنَّهُ أَعْوَرُ ، وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِأَعْوَرَ

“রাসূলুল্লাহ (সা.))… দাজ্জালের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন: আমি তোমাদেরকে তার বিষয়ে সতর্ক করছি। প্রত্যেক নবীই তাঁর জাতিকে দাজ্জালের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। …. তবে পূর্ববর্তী কোনো নবী তাঁর জাতিকে যে কথা বলেন নি আমি তোমাদেরকে সে কথা বলছি। তোমরা জেনে রাখ যে, দাজ্জাল কানা (একটি চক্ষু নষ্ট) আর আল্লাহ কানা নন।

(২) আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)) বলেন:

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ عَنِ الدَّجَّالِ حَدِيثًا مَا حَدَّثَهُ نَبِىٌّ قَوْمَهُ إِنَّهُ أَعْوَرُ وَإِنَّهُ يَجِىءُ مَعَهُ مِثْلُ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ فَالَّتِى يَقُولُ إِنَّهَا الْجَنَّةُ هِىَ النَّارُ.

“আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের বিষয়ে একটি কথা বলব যা কোনো নবী তাঁর জাতিকে বলেন নি; তা হলো যে, দাজ্জাল কানা। আর সে তার সাথে জান্নাত ও জাহান্নামের নমুনা নিয়ে আসবে। যাকে সে জান্নাত বলবে সেটিই জাহান্নাম।”

(৩) আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন,

حَدَّثَنَا رَسُولُ اللَّهِ حَدِيثًا طَوِيلاً عَنِ الدَّجَّالِ، فَكَانَ فِيمَا حَدَّثَنَا بِهِ أَنْ قَالَ: يَأْتِى الدَّجَّالُ- وَهُوَ مُحَرَّمٌ عَلَيْهِ أَنْ يَدْخُلَ نِقَابَ الْمَدِينَةِ- بَعْضَ السِّبَاخِ الَّتِى بِالْمَدِينَةِ ، فَيَخْرُجُ إِلَيْهِ يَوْمَئِذٍ رَجُلٌ، هُوَ خَيْرُ النَّاسِ- أَوْ مِنْ خَيْرِ النَّاسِ- فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّكَ الدَّجَّالُ ، الَّذِى حَدَّثَنَا عَنْكَ رَسُولُ اللَّهِ حَدِيثَهُ ، فَيَقُولُ الدَّجَّالُ أَرَأَيْتَ إِنْ قَتَلْتُ هَذَا ثُمَّ أَحْيَيْتُهُ ، هَلْ تَشُكُّونَ فِى الأَمْرِ فَيَقُولُونَ لاَ. فَيَقْتُلُهُ ثُمَّ يُحْيِيهِ فَيَقُولُ حِينَ يُحْيِيهِ وَاللَّهِ مَا كُنْتُ قَطُّ أَشَدَّ بَصِيرَةً مِنِّى الْيَوْمَ، فَيَقُولُ الدَّجَّالُ أَقْتُلُهُ فَلاَ أُسَلَّطُ عَلَيْهِ.

“রাসূলুল্লাহ (সা.) একদিন আমাদেরকে দাজ্জালের বিষয়ে দীর্ঘ কথা বললেন। তাঁর কথার মধ্যে তিনি বলেন: দাজ্জালের জন্য মদীনার মধ্যে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। এজন্য সে মদীনার পার্শবর্তী মরুপ্রান্তরে আগমন করবে। তখন এক ব্যক্তি (মদীনা থেকে) বেরিয়ে তার কাছে গমন করবে, যে সে সময়ের শ্রেষ্ট মানুষ বা শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন। সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই সেই দাজ্জাল যার কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে তাঁর হাদীসের মধ্যে জানিয়েছেন। তখন দাজ্জাল (উপস্থিত অনুসারীদেরকে) বলবে: আমি যদি এ ব্যক্তিকে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করি তবে কি তোমরা আমার (ঈশ্বরত্বের) বিষয়ে সন্দেহ করবে? তারা বলবে: না। তখন দাজ্জাল সে ব্যক্তিকে হত্যা করবে তারপর জীবিত করবে। তখন সে ব্যক্তি বলবে: আল্লাহর কসম, তোমার (দাজ্জাল হওয়ার) বিষয়ে আমি পূর্বের চেয়ে এখন আরো বেশি সুনিশ্চিত হলাম। তখন দাজ্জাল তাকে হত্যা করার চেষ্টা করবে কিন্তু সে তার উপর আর কর্তৃত্ব পাবে না (সে তার কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না)।”

(৪) আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

مَا بَعَثَ اللَّهُ مِنْ نَبِىٍّ إِلاَّ أَنْذَرَ قَوْمَهُ الأَعْوَرَ الْكَذَّابَ ، إِنَّهُ أَعْوَرُ ، وَإِنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ ، مَكْتُوبٌ بَيْنَ عَيْنَيْهِ كَافِرٌ

“যত নবী প্রেরিত হয়েছেন সকলেই কানা মিথ্যাবাদীর বিষয়ে তার উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। তোমরা সতর্ক থাকবে। সে কানা আর তোমাদের প্রতিপালক কানা নন। আর তার দু চোখের মধ্যবর্তী স্থানে ‘কাফির’ লেখা থাকবে।”


(৫) নাওয়াস ইবন সামআন (রা) বলেন:




“রাসূলুল্লাহ (সা.) একদিন সকালে দাজ্জালের কথা বললেন। তিনি উচ্চস্বরে ও নিম্নস্বরে এমন গুরুত্ব দিয়ে বললেন যে আমাদের মনে হলো দাজ্জাল খেজুরের বাগানের মধ্যে উপস্থিত….  তিনি আমাদের বলেন: আমি তোমাদের মাঝে থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আবির্ভাব হয় তবে তোমাদের পক্ষ থেকে আমিই তার সাথে বিতর্ক করব। আর যদি এমন অবস্থায় সে আসে যখন আমি তোমাদের মাঝে নেই তবে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের পক্ষ হয়ে বিতর্ক করবে। আর প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ আমার খলীফা (স্থলাভিষিক্ত) থাকবেন। দাজ্জাল কোঁকড়ানো চুল ফোলা চোখ একজন যুবক। আমি যেন তাকে ‘আব্দুল উয্যা ইবন কাতান’ নামক লোকটির সাথে তুলনা করছি। তোমাদের কেউ যদি তাকে পায় তবে সে যেন তার কাছে সূরা কাহাফের প্রথম আয়াতগুলো পাঠ করে। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থানে বহির্ভূত হবে এবং ডানে-বামে অশান্তি-বিশৃঙ্খলা ছড়াবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা সুদৃঢ় থাকবে।

আমরা বললাম: সে কতদিন পৃথিবীতে থাকবে? তিনি বলেন: ৪০ দিন। প্রথম দিন এক বছরের মত। দ্বিতীয় দিন এক মাসের মত। তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের মত। আর অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের সাধারণ দিনের মত। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, এক বছরের মত যে দিন সে দিনে কি এক দিনের সালাত আদায় করলেই চলবে? তিনি বলেন: না, তোমরা সালাতের জন্য সময় হিসাব করে নিবে। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল: পৃথিবীতে তার দ্রুততা কিরূপ? তিনি বলেন: ঝড়-তাড়িত মেঘের মত। সে এক জাতির নিকট এসে তাদেরকে দাওয়াত দিবে। তখন তারা তার উপর ঈমান আনবে এবং তার ডাকে সাড়া দিবে। তখন তার নির্দেশে আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত হবে, যমিনে ফল-ফসল জন্ম নেবে, তাদের পালিত পশুগুলোর আকৃতি ও দুধ সবই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাবে। অতঃপর সে অন্য একটি জনগোষ্ঠীর নিকট গমন করবে এবং তাদেরকে দাওয়াত দিবে। তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। তখন সে তাদের নিকট থেকে ফিরে যাবে, কিন্তু তাদের যমিনগুলো অনুর্বর ফসলহীন হয়ে যাবে এবং তাদের হাতে তাদের সম্পদের কিছুই থাকবে না। সে পতিত ভূমি দিয়ে গমন করার সময় তাকে বলবে: তোমার সম্পদ-ভান্ডার বের কর। তখন মৌমাছিরা যেমন রাণী মাছির পিছে পিছে চলে তেমনি খনিজ সম্পদগুলো তার পিছে পিছে চলবে। এরপর সে একজন যৌবনে পূর্ণ যুবককে ডেকে তাকে তরবারি দ্বরা দুখ- করবে এবং তীর নিক্ষেপের দূরত্বে ছুড়ে ফেলবে। এরপর তাকে ডাকবে। তখন সে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার দিকে এগিয়ে আসবে।

সে যখন এসব করবে তখন আল্লাহ মরিয়মের পুত্র ঈসা (আ)-কে প্রেরণ করবেন। তিনি দামেশকের পূর্ব দিকে সাদা মিনারার উপর অবতরণ করবেন। তাঁর পরিধানে থাকবে দুটি রঙিন কাপড়। তিনি তাঁর হাত দুটি দুজন ফিরিশতার পাঁখার উপর রেখে অবতরণ করবেন। তিনি মাথা নিচু করলে ফোঁটা ফোঁটা (ঘাম) পড়বে। আবার যখন মাথা উচু করবেন তখন মুক্তোর মত (ঘাম) পড়বে। যে কোনো কাফির তাঁর নিশ্বাস পেলেই মৃত্যুবরণ করবে। আর তাঁর দৃষ্টি যতদূর যাবে তাঁর নিশ্বাসও ততদূর যাবে। তিনি দাজ্জালকে খুঁজতে থাকবেন এবং ‘বাব লুদ্দ’ নামক স্থানে তাকে পেয়ে তাকে বধ করবেন। এরপর আল্লাহ যাদেরকে দাজ্জাল থেকে রক্ষা করেছেন এমন মানুষদের নিকট তিনি আগমন করবেন। তিনি তাদের মুখম-ল মুছে দিবেন এবং জান্নাতে তাদের মর্যাদার বিষয়ে কথা বলবেন।


এ অবস্থায় আল্লাহ মরিয়মের পুত্র ঈসা (আ)-কে ওহী করবেন  যে, আমি আমার এমন একদল বান্দাকে বের করে দিয়েছি যাদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা কারো নেই। কাজেই আমার বান্দাদেরকে নিয়ে পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ ইয়াজূজ -মাজূজকে প্রেরণ করবেন। সকল জনপদ দিয়ে তারা চলতে থাকবে। তাদের মধ্য থেকে যারা প্রথমে বের হবে তারা তাবারিয়া হ্রদে পৌঁছে হ্রদের সব পানি পান করবে। সব শেষে যারা সে পথ দিয়ে যাবে তারা বলবে: এখানে এক সময় পানি ছিল। আল্লাহর নবী ঈসা (আ) ও তাঁর সাথীরা অবরুদ্ধ থাকবেন। এমনকি একটি ষাড়ের মাথা তাদের কাছে ১০০ স্বর্ণমুদ্রার চেয়েও উত্তম বলে গণ্য হবে। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আ) ও তাঁর সাথীরা আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। আল্লাহ ইয়াজূজ-মাজুজদের ঘাড়ে এক জাতীয় কীট প্রেরণ করবেন ফলে তারা সকলেই একযোগে মহামারিতে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহর নবী ঈসা (আ) ও তাঁর সাথীরা পৃথিবীতে নেবে আসবেন। কিন্ত পৃথিবীর এক বিঘত জমিও তাদের পঁচাগলা লাশ থেকে মুক্ত পাবেন না। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আ) ও তাঁর সাথীর আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। এরপর আল্লাহ সর্বব্যাপী বৃষ্টি দান করবেন যা বাড়িঘর ও তাঁবুসহ পুরো পৃথিবী ধুয়ে আয়নার মত চকচকে করবে। এরপর যমিনকে বলা হবে: তোমার ফল-ফসল উৎপন্ন কর এবং তোমার বরকত বের কর। তখন একটি বেদানা একদল মানুষেরা ভক্ষণ করবে এবং তার খোসার ছায়া পেতে পারবে। আল্লাহ সম্পদে বরকত প্রদান করবেন। এমনকি একটি উটের দুধ একদল মানুষের চাহিদা মেটাবে, একটি গরুর দুধ একটি গোত্রের চাহিদা মেটাবে, একটি মেষ একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। এ অবস্থা চলতে থাকবে। এমন সময়ে আল্লাহ একটি পবিত্র বায়ুপ্রবাহ প্রেরণ করবেন যা মানুষদের বগলের নিচে ধরবে এবং সকল মুমিন-মুসলিম ব্যক্তির প্রাণ গ্রহণ করবে। এরপর শুধু খারাপ মানুষগুলোই জীবিত থাকবে। তারা দুনিয়াতে গর্দভের মত অশ্লীলতায় মেতে উঠবে। এদের সময়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে।

দাজ্জাল বিষয়ে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত। এ বিষয়ক হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, দুটি বিভ্রান্তির উপর এ ফিতনার ভিত্তি:

(১) অলৌকিকত্ব বা কারামত দেখে কাউকে ‘অলৌকিক ব্যক্তিত্ব’ বা ‘ওলী’ বলে বিশ্বাস করা এবং

(২) ওলী বা কোনো মানুষের মধ্যে ঈশ্বরত্ব বা ঐশ্বরিক শক্তি থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করা।


আমরা দেখেছি যে, মুশরিক জাতিগুলোর শিরকের মূল কারণ এ দুটো বিষয়। অবতারত্ব, ফানা, বাকা ইত্যাদি অজুহাতে তারা মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহ, তাঁর কোনো ক্ষমতা বা বিশেষণ মিশ্রিত বা প্রকাশিত হতে পারে বলে বিশ্বাস করেন। তাওহীদ বিষয়ক অজ্ঞতার কারণে বর্তমানে মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও এ দুটি বিশ্বাস ব্যাপক। বর্তমানে বিভিন্ন মুসলিম দেশে প্রায়ই নতুন নতুন ‘ওলী বাবা’ প্রকাশিত হন। কারামতের গল্প শুনে লক্ষলক্ষ মুসলিম এদেরকে ‘অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ওলী’ বলে বিশ্বাস করেন। সাজদা, তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা ইত্যাদি ইবাদতে তাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করেন। এ সকল ‘ক্ষুদ্র দাজ্জালের’ ভক্তগণ বিশ্বাস করেন যে, ঝড়-বৃষ্টি, ধন-সম্পদ, জীবন-মৃত্যু সবই তাদের বাবা বা গুরুর ইচ্ছাধীন। এ সকল ‘ক্ষুদ্র দাজ্জাল’ মহা দাজ্জালকে গ্রহণ করার প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। যারা  ছোট দাজ্জালদেরকে ‘কারামতের গল্প’ শুনেই মেনে নিচ্ছেন, স্বভাবতই ‘কানা দাজ্জাল’-এর মহা ‘কারামত’ দেখে তাকে বিনা দ্বিধায় মেনে নিবেন। এমনকি যারা ছোট দাজ্জালদের বিশ্বাস করে নি তারাও কানা দাজ্জালের মহা ‘কারামত’ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। শুধু তাওহীদ ও রিসালাতের গভীর ঈমান এবং মহান আল্লাহর তাওফীক ও রহমতই মুমিনকে এ ফিতনা থেকে রক্ষা করবে।

মহান আল্লাহ বান্দাদের পরীক্ষার জন্য দাজ্জালকে কিছু ক্ষমতা প্রদানের সাথে সাথে তার অক্ষমতা প্রকাশিত রাখবেন। সে নিজের নষ্ট চক্ষুটি ভাল করতে সক্ষম হবে না। যেন সচেতন মুমিন বুঝতে পারেন যে, সে সীমাবদ্ধ ক্ষমতার সৃষ্টি মাত্র। কিন্তু ঈমানের গভীরতা না থাকলে এ সীমাবদ্ধতা মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় অথবা ভক্তিভরে তা ব্যাখ্যা করে। যেমন বর্তমানের ক্ষুদ্র দাজ্জালদের ভক্তগণ তাদের গুরুদের অক্ষমতা ব্যাখ্যা করে।

অতীত ও বর্তমানে বিভিন্ন বিভ্রান্ত দল দাজ্জাল বিষয়ক হাদীসগুলোকে রূপক অর্থে গ্রহণ করে নানা প্রকার উদ্ভট ব্যাখ্যা করেছে। তারা দাজ্জাল বলতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে। এ প্রসঙ্গে ইমাম নববী (৭৬৭ হি) বলেন: “কাযী ইয়ায (৫৪৪ হি) বলেন: “মুসলিম এবং অন্যান্য মুহাদ্দিস দাজ্জালের বিষয়ে যে সকল হাদীস উদ্ধৃত করেছেন সেগুলো হক্কপন্থীদের দলীল। তারা দাজ্জালের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, দাজ্জাল বলতে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যার দ্বারা আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা করবেন এবং যাকে তাঁর ক্ষমতাধীন কিছু বিষয়ের ক্ষমতা প্রদান করবেন।… ঈসা (আ) তাকে হত্যা করবেন। এটিই আহলুস সুন্নাত এবং সকল মুহাদ্দিস, ফকীহ ও গবেষকের মত। খারিজীগণ, জাহমীগণ এবং মুতাযিলীদের কেউ কেউ দাজ্জালের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন….।”

মুমিনের দায়িত্ব সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসগুলো সরল ও বাহ্যিক অর্থে বিশ্বাস করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুসারে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সংরক্ষণের জন্য দুআ করা। বিভিন্ন হাদীসে তিনি দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার দুআ শিখিয়েছেন এবং সূরা কাহ্ফ-এর প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ ও পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ক কয়েকটি দুআ ‘রাহে বেলায়াত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছি।


ঈসা (আ)-এর অবতরণ

কিয়ামতের বড় আলামতগুলোর অন্যতম ঈসা (আ)-এর অবতরণ। এ বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা আমরা দেখেছি। কুরআনের পাশাপাশি বহুসংখ্যক সাহাবীর সূত্রে মুতাওয়াতির হাদীসে তাঁর অবতরণের বিষয়টি প্রমাণিত। উপরে আমরা এ অর্থে চারটি হাদীস দেখেছি। অন্য হাদীসে আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لَيُوشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمُ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا مُقْسِطًا فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ ، وَيَقْتُلَ الْخِنْزِيرَ ، وَيَضَعَ الْجِزْيَةَ ، وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لاَ يَقْبَلَهُ أَحَدٌ، حَتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

“যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, অচিরেই তোমাদের মাঝে মরিয়মের পুত্র ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর বধ করবেন, জিযিয়া তুলে দিবেন এবং সম্পদের প্রাচুর্য দেখা দেবে। এমনকি কেউ সম্পদ গ্রহণ করবে না, এমনকি একটি সাজদার মূল্য দুনিয়া ও তার সব সম্পদের চেয়ে বেশি বলে গণ্য হবে।”

অন্য হাদীসে আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

الأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ لِعَلاَّتٍ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ وَأَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ لأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بَيْنِى وَبَيْنَهُ نَبِىٌّ وَإِنَّهُ نَازِلٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ رَجُلاً مَرْبُوعاً إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ عَلَيْهِ ثَوْبَانِ مُمَصَّرَانِ كَأَنَّ رَأْسَهُ يَقْطِرُ وَإِنْ لَمْ يُصِبْهُ بَلَلٌ فَيَدُقُّ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَيَدْعُو النَّاسَ إِلَى الإِسْلاَمِ فَيُهْلِكُ اللَّهُ فِى زَمَانِهِ الْمِلَلَ كُلَّهَا إِلاَّ الإِسْلاَمَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِى زَمَانِهِ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ وَتَقَعُ الأَمَنَةُ عَلَى الأَرْضِ حَتَّى تَرْتَعَ الأُسُودُ مَعَ الإِبِلِ وَالنِّمَارُ مَعَ الْبَقَرِ وَالذِّئَابُ مَعَ الْغَنَمِ وَيَلْعَبَ الصِّبْيَانُ بِالْحَيَّاتِ لاَ تَضُرُّهُمْ فَيَمْكُثُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى وَيُصَلِّى عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ

“নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাইদের মত; তাঁদের মাতৃগণ পৃথক হলেও তাঁদের দীন একই। মরিয়মের পুত্র ঈসার বিষয়ে আমারই অধিকার বেশি; কারণ তাঁর ও আমার মাঝে কোনো নবী নেই। তিনি অবতরণ করবেন। যখন তোমরা তাঁকে দেখবে তাঁকে চিনবে: তিনি মধ্যমাকৃতির লালচে-শুভ্র মানুষ। তাঁর পরিধানে হালকা হলুদ রঙের দুটি কাপড় থাকবে। (পরিচ্ছন্নতার কারণে) তাঁর মাথায় পানি স্পর্শ না করলেও মনে হয় যে তা থেকে পানি পড়ছে। তিনি ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর বধ করবেন, জিযিয়া অপসারণ করবেন, সকল মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকবেন। তাঁর সময়ে ইসলাম ছাড়া অন্য সকল ধর্ম বিলুপ্ত হবে। তাঁর সময়েই মাসীহ দাজ্জালকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন। এরপর পৃথিবীতে শান্তি-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। এমনকি উটের সাথে সিংহ, গরুর সাথে বাঘ ও মেষের সাথে চিতা চরবে। শিশুরা সাপ নিয়ে খেলবে কিন্তু সাপ তাদের ক্ষতি করবে না। তিনি চল্লিশ বৎসর অবস্থান করবেন। এরপর তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং মুসলিমগণ তাঁর জানাযা আদায় করবে।

আরো অনেক হাদীস এ বিষয় বর্ণিত। মুমিনের দায়িত্ব এ বিষয়ক কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা সরল অর্থে বিশ্বাস করা। কিয়ামতের আলামতগুলো বর্ণনামূলক। এগুলো ঘটবে বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন। ঘটার পরে বিশ্বাস করা ছাড়া মুমিনের অন্য কোনো দায়িত্ব নেই। ঈসা (আ) বিষয়ক সকল ভবিষ্যদ্বাণী যখন প্রকাশিত হবে, তখন সে যুগের মুমিনগণ বলবেন, আল-হামদু লিল্লাহ, মুহাম্মাদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, কোনো আলামত পরিপূর্ণ প্রকাশিত হওয়ার আগে তা নিয়ে গবেষণা-বিতর্ক বা বিশ্বাস বিভ্রান্তির দরজা উন্মুক্ত করে।আল্লাহ আমাদরেকে সঠকি বুঝ দান করুন। আমীন।


 ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর 
অধ্যাপক,  আল-হাদীস বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
 চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট

কোন মন্তব্য নেই