পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

অবৈধভাবে কাউকে হত্যা করা সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কঠোর সতর্কবাণী

কাউকে অবৈধভাবে হত্যা করা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। তবে উক্ত হত্যা আরও ভয়ঙ্কর বলে বিবেচিত হয়, যখন তা এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয় যাকে বাঁচানো সবার নৈতিক দায়িত্ব এবং যাকে হত্যা করা একেবারেই অমানবিক। যেমন, নাবী-রাসুল, নিরস্ত্র নারী, নিস্পাপ শিশু, নিজ পিতা-মাতা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রপ্রধান অথবা উপদেশদাতা আলিম। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘’যারা আল্লাহর আয়াত সমুহকে অমান্য করে, নাবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। এরাই তারা যাদের সমুদয় আমল নিস্ফল হবে এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই’’ [আলে ইমরান ৩/৩২-২২]

হত্যা ভয়ানক এক অপরাধ। হত্যার ভয়াবহতার কারনে আল্লাহ তায়ালা শুধুমাত্র এক ব্যক্তির হত্যাকারীকে সকল মানুষের হত্যাকারী হিসাবে আখ্যায়িত করেছেনঃ
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘’এ কারনেই আমি বানী ইসরাইলের জন্য বিধান দিয়েছিলাম, যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা কিংবা যমিনে সন্ত্রাস সৃষ্টির কারন ব্যতীত কাউকে হত্যা করবে সে যেন তামাম মানুষকেই হত্যা করল; আর যে কোন মানুষের প্রান বাঁচালো, সে যেন তামাম মানুষকেই বাঁচালো। তাদের কাছে আমার রাসুলগন সুস্পষ্ট প্রমান নিয়ে এসেছিল, এরপরও তাদের অধিকাংশই পৃথিবীতে বাড়াবাড়ি করেছিল’’ [মায়িদাহ ৫/৩২]

ঈমানের ঘোষণাদানকারী অর্থাৎ কোনো মুসলিম ব্যক্তির মর্যাদা ও তাঁকে বিনা কারনে হত্যা করার ভয়াবহ পরিনতিঃ
উসামাহ ইবন যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) আমাদেরকে এক জিহাদে পাঠালেন। আমরা প্রত্যুষে ‘জুহাইনার’ (একটি শাখা গোত্র) ‘আল-হুরাকায় গিয়ে পৌঁছলাম। এ সময়ে আমি এক ব্যক্তির পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরে ফেলি। অবস্থা বেগতিক দেখে সে বললঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। কিন্তু আমি তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। কালেমা পড়ার পর আমি তাকে হত্যা করেছি বিধায়, আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হল। তাই ঘটনাটি আমি নাবী (সাঃ)-এর নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেনঃ ‘’তুমি তাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পর হত্যা করেছে! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সে অস্ত্রের ভয়ে জান বাঁচানোর জন্যই এরুপ বলেছে। তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেনঃ ‘তুমি কি তার অন্তর চিরে দেখেছ, যাতে তুমি জানতে পারলে যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল?’’ [মুসলিম ৯৬]

আল-মিকদাদ ইবন আসওয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসুল রাসুল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! যদি আমি কোন কাফিরের মুকাবেলায় লড়তে গিয়ে তার তরবারির আঘাতে একটি হাত কেটে যায়। তারপর সে আমার পাল্টা আক্রমন থেকে আত্মরক্ষার জন্য কোন গাছের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে বলে, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসলিম হয়েছি’- এ কথা বলার পর হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি তাকে হত্যা করবো? তিনি বললেনঃ না, তাকে হত্যা করো না। আমি আবার বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সে তো আমার হাত কেটে ফেলেছে। রাসুল (সাঃ) বললেনঃ তাকে হত্যা করো না। কেননা তুমি তাকে হত্যা করলে এ হত্যার পূর্বে তুমি (ঈমান আনার কারনে) যে মর্যাদায় ছিলে, সে ঐ মর্যাদায় চলে যাবে। আর এ কালেমা পাঠ করার পূর্বে সে যে অবস্থায় ছিল (অর্থাৎ কাফির), তুমি তার অবস্থায় চলে যাবে’’ [আবু দাউদ ২৬৪৪ (আলবানি সহীহ বলেছেন)]

জারীর ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) খাস’আম গোত্রের বিরুদ্ধে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরন করলেন। সৈন্যদল সেখানে পৌঁছে দেখল যে, ঐ গোত্রের কিছু লোক সিজদায় পরে আছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও তাদেরকে হত্যা করা হল। নাবী (সাঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি তাদের ওয়ারিশদেরকে দিয়াত (রক্তপন) প্রদানের নির্দেশ দিলেন’’ [আবু দাউদ ২৬৪৫ (আলবানি সহীহ বলেছেন)]

মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণীঃ
আবদুল্লাহ ইবন উমার (রাঃ) বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ আল্লাহর নিকট পৃথিবী ধ্বংস হওয়াটা অধিকতর সহজ ব্যাপার একজন মুসলিম খুন হওয়ার পরিবর্তে’’ [তিরমিযি ১৩৯৫ (আলবানি সহীহ বলেছেন)]

অবৈধভাবে কাউকে হত্যা করা কবিরা গুনাহ ও তার পরিনতিঃ
কাউকে অবৈধ ভাবে হত্যা করা অন্যতম কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা হত্যাকারীকে চির জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তিনি তার উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। তেমনি ভাবে তার উপর অভিশাপ ও আখেরাতে তার জন্য দ্বিগুন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘’আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন মুমিনকে হত্যা করে তার শাস্তি জাহান্নাম। যাতে সে স্থায়ীভাবে থাকবে, তার উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিসম্পাত। আল্লাহ তার জন্য মহাশাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন’’ [নিসা ৪/৯৩]

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেনঃ ‘’আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্যকে ডাকে না। আরা যথার্থ কারন ছাড়া কোন প্রান হত্যা করে না, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন এবং তারা ব্যভিচার করে না। আর যে এগুলো করবে সে শাস্তির সাক্ষাৎ লাভ করবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুন করা হবে আর সে সেখানে লাঞ্ছিত হয়ে চিরকাল বাস করবে। তবে তারা নয় যারা তাওবাহ করবে, ঈমান আনবে আর সৎকাজ করবে। আল্লাহ এদের পাপগুলোকে পুন্যে পরিবর্তন করে দিবেন; আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু’’ [ফুরকান ২৫/৬৮-৭০]

হত্যা অন্যতম সর্ববৃহৎ গুনাহ সমূহের একটিঃ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, প্রান হত্যা করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া আর মিথ্যা বলা, কিংবা বলেছেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া’’ [বুখারী ৬৮৭১; মুসলিম ৮৮]

কিয়ামতের দিন মানবাধিকার সম্পর্কে সর্বপ্রথম হত্যার বিচার করা হবেঃ
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’(কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম হত্যার বিচার করা হবে’’ [বুখারী ৬৫৩৩; মুসলিম ১৬৭৮]

হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণঃ
আবদুল্লাহ ইবন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে কেউ নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরে তার ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় থাকে না, সেগুলোর একটি হচ্ছে, হালাল ছাড়া হারাম রক্ত প্রবাহিত করা (অর্থাৎ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা) [বুখারী ৬৮৬৩]

আবুল হাকাম আল-বাজালী (রহঃ) বলেন, আমি আবু সাইদ খুদরি ও আবু হুরায়রাহ (রাঃ)-কে বর্ণনা করতে শুনেছি, রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আসমান-যমিনের মধ্যে বসবাসকারী সকলে একত্রে মিলিত হয়েও যদি একজন মুমিনকে হত্যা করার কাজে শরীক থেকে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাদের সকলকে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’’ [তিরমিযি ১৩৯৮ (আলবানি সহীহ বলেছেন)]

মুয়াবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ প্রতিটি গুনাহ আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দিবেন। তবে দুটি গুনাহ যা আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না। আর তা হচ্ছে, কোন মানুষ কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে অথবা ইচ্ছাকৃত ভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে’’ [নাসায়ী ৩৯৮৪; আহমাদ; হাকিম ৪/৩৫১]

হত্যা করা কুফুরির অন্তর্ভুক্তঃ
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তাকে হত্যা করা কুফুরি’’ [বুখারী ৬০৪৪]
জারির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। বিদায় হজ্জের সময় নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমার পরে তোমরা একে অপরের গর্দান কাটাকাটি করে কাফির হয়ে যেও না’’ [বুখারী ১২১]

হত্যা অথবা যেকোনো পাপের কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও মানুষ যেভাবে মানুষ পাপি হয়ঃ
আল-উরস ইবন আমীরাহ আল- কিনদী (রাঃ) সুত্রে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ''কোনো স্থানে যখন অন্যায় সংঘটিত হয়, তখন সেখানে উপস্থিত ব্যাক্তি তাতে অসন্তুষ্ট হলে, সে অনুপস্থিতদের মতোই গণ্য হবে (অর্থাৎ তাঁর কোনো গুনাহ হবে না); আর যে ব্যাক্তি অন্যায় কাজের স্থান হতে অনুপস্থিত থেকেও তাতে সন্তুষ্ট হয়, তাহলে সে অন্যায়ে উপস্থিতদের অন্তর্ভুক্ত'' [আবু দাউদ ৪৩৪৫ (আলিবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন)]

হত্যাকাণ্ডে উৎসাহ দানকারী ব্যক্তির আমলনামায় হত্যার পাপের একটা অংশ যোগ হবেঃ
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘’কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে নিজেদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায়, আর তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা গুমরাহ করেছে, নিজেদের অজ্ঞতার কারনে। হায়! তারা যা বহন করবে তা কতইনা নিকৃষ্ট’’ [নাহল ১৬/২৫]
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’যে কোন ব্যক্তিকে অন্যায় ভাবে হত্যা করা হয়, তার পাপের ভাগ আদম (আঃ)-এর প্রথম (হত্যাকারী) পুত্রের উপরও বর্তাবে। কারন সে-ই প্রথমে হত্যার রীতি চালু করে’’ [বুখারী ৭৩২১]

একজনের অপরাধে অপরজনকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না ও তাকে কোন শাস্তি দেয়া যাবে নাঃ
আমর ইবন আহওয়াস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী (সাঃ)-কে বিদায় হজ্জের দিন বলতে শুনেছিঃ সাবধান! অপরাধী তার অপরাধের দ্বারা নিজেকেই দায়বদ্ধ করে। পিতার অপরাধে পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধে পিতাকে দায়বদ্ধ করা যাবে না’’ [ইবন মাযাহ ২৬৬৯; তিরমিযি ২১৫৯, ৩০৮৭; সাহীহাহ ১৯৭৪; ইরওয়া ৭/৩৩৩-৩৩৪ (আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)]
তারিক আল-মুহারিবী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সাঃ)-কে তাঁর হস্তদ্বয় এতো উপরে তুলে বলতে শুনেছি যে, তাঁর বগলের শুভ্রতা আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছেঃ সাবধান! সন্তানের অপরাধে মাকে অভিযুক্ত করা যাবে না। সাবধান! সন্তানের অপরাধে মাকে অভিযুক্ত করা যাবে না’’ [ইবন মাযাহ ২৬৭০; নাসায়ী ৪৮৩৯; ইরওয়া ৭/৩৩৫ (আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)]
আল-খাশখাশ আল-আম্বারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার এক পুত্রসহ নাবী (সাঃ)-এর কাছে এলাম। তিনি বললেনঃ ‘’তোমার অপরাধের প্রতিশোধ তাঁর কাছ থেকে নেয়া যাবে না এবং তার প্রতিশোধ তোমার কাছ থেকে নেয়া যাবে না’’ [ইবন মাযাহ ২৬৭১; আহমাদ ২০২৪৫ (আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)]
উসামাহ বিন শারীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’একজনের অপরাধের জন্য অপরজনকে দায়বদ্ধ করা যাবে না’’ [ইবন মাযাহ ২৬৭২; সাহীহাহ ৯৮৮ (আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)]

অবৈধ ভাবে শুধুমাত্র একজনকে হত্যার অপরাধে উমার (রঃ) সমগ্র সান’আ বাসীকে হত্যা করতে চেয়েছিলেনঃ
ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, আমাকে ইবন বাশশার (রহঃ) ইবন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একটি বালককে গোপনে হত্যা করা হয়। তখন উমার (রাঃ) বললেনঃ ‘’যদি গোটা সান’আবাসী (সম্ভবত ইয়েমেন) এতে অংশ নিত তাহলে আমি তাদেরকে হত্যা করতাম’’ [বুখারী ৬৮৯৬; বুলুগুল মারাম ১১৭৪]

পরকালে হত্যাকারীর ভয়ানক অবস্থা। নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীকে সঙ্গে নিয়ে কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত হবেঃ
ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেনঃ ‘’ কিয়ামতের দিন হত্যাকারী তার মাথার সাথে নিহত ব্যক্তির মাথা লটকানো অবস্থায় উপস্থিত হবে। নিহত ব্যক্তি বলবে, হে প্রভু! তাকে জিজ্ঞেস করুন, সে কেন আমাকে হত্যা করেছে?’’ [ইবন মাযাহ ২৬২১ (আলবানি সহীহ বলেছেন)]

কোনো নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা মুসলিমের চরিত্র নয়। কোনো নিরাপরাধ মানুষের হত্যাকাণ্ডে উল্লাসিত হওয়াও মুসলিমের চরিত্র নয়ঃ
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ''কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রোধ তোমাদেরকে যেন অবশ্যই সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে'' [মায়িদাহ ৫/২]

আকিদা-বিশ্বাসে ভিন্ন মতবাদ পোষণকারীকে হত্যা করা এবং সেই হত্যাকাণ্ডে উল্লাস প্রকাশ করা নিকৃষ্ট খারেজী মতবাদঃ
সাহাবী খাব্বার ইবন আরাত (রাঃ)-এর পুত্র আবদুল্লাহ তাঁর স্ত্রী পরিজনদের নিয়ে পথে চলছিলেন। খারেজীগণ তাঁকে উসমান (রাঃ) ও আলী (রাঃ) সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি তাদের সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করেন এবং সন্ত্রাস ও হত্যার ভয়ানক পরিনতির বিষয়ে হাদিস বলেন। তখন তারা তাঁকে নদীর ধারে নিয়ে জবাই করে এবং তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী ও অন্যান্য নারী ও শিশুকে হত্যা করে। এসময়ে তারা একস্থানে বিশ্রাম করতে বসে। তথায় একটি খেজুর গাছ থেকে খেজুর ঝরে পরলে একজন খারেজী তা তুলে মুখে দেয়। তখন অন্য একজন বলে, তুমি মূল্য না দিয়ে পরের দ্রব্য ভক্ষণ করলে? লোকটি তাড়াতাড়ি খেজুরটি উগরে দেয়। আরেকজন খারেজী একটি শূকর দেখে তার দেহে নিজের তরবারি দিয়ে আঘাত করে। তৎক্ষণাৎ তার বন্ধুরা প্রতিবাদ করে বলে, এটা অন্যায়, তুমি এভাবে আল্লাহর জমিনে বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছ ও পরের সম্পদ নষ্ট করছ! অতঃপর তারা শূকরের অমুসলিম মালিককে খুজে বের করে তাকে টাকা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেয়’’ [ইবনুল জাওযী, তালবিসু ইবলীস; পৃষ্ঠা নঃ ৮৪-৮৫]

এভাবে তারা অমুসলিমদের বিষয়ে ইসলামের উদারতা গ্রহন করেছে, সামান্য একটি খেজুরের বিষয়ে বান্দার হক নষ্ট করাকে ভয় পাচ্ছে; অথচ ভিন্নমতাবলম্বী মুসলিমকে বিভিন্ন অযুহাতে কাফির বলে হত্যা করছে এবং নিরস্ত্র নারী ও শিশুদেরকেও হত্যা করছে!!!

অত্যাধিক হত্যাকাণ্ড কিয়ামতের আলামতঃ
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’(শেষ যামানায়) ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে, অজ্ঞতা ও ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং ‘হারজ’ বেড়ে যাবে। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসুল! ‘হারজ’ কী? তিনি হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেনঃ এ রকম। যেন তিনি এর দ্বারা হত্যা বুঝিয়েছিলেন’’ [বুখারী ৮৫]
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’কিয়ামত কায়িম হবে না, যে পর্যন্ত ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে, অধিক পরিমানে ভুমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং ‘হারজ’ বৃদ্ধি পাবে। ‘হারজ’ (হচ্ছে) খুন-খারাবী। তোমাদের ধন-সম্পদ এতো বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে’’ [বুখারী ১০৩৬]
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’সময় নিকটতর হতে থাকবে, আর আমল কমে যেতে থাকবে, কৃপণতা ছড়িয়ে দেয়া হবে, ফিতনার বিকাশ ঘটবে এবং ‘হারজ’ ব্যাপকতর হবে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হারজ’ কী? নাবী (সাঃ) বললেনঃ হত্যা, হত্যা’’ [বুখারী ৭০৬১]
শাকিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ও আবু মুসা (রাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তাঁরা বললেন, নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’অবশ্যই কিয়ামতের আগে এমন একটি সময় আসবে যখন সব যায়গায় মূর্খতা ছড়িয়ে পড়বে এবং ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে। সে সময় ‘হারজ’ বর্ধিত হবে। আর ‘হারজ’ হল (মানুষ) হত্যা’’ [বুখারী ৭০৬২, ৭০৬৩]
আবু মুসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’কিয়ামতের আগে এমন একটি সময় আসবে যখন ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে এবং সর্বত্র মূর্খতা ছড়িয়ে পরবে,আর তখন ‘হারজ’ বেড়ে যাবে’’ [বুখারী ৭০৬৪]
আবু মুসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী (সাঃ)-কে পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের মতো একটি হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। আর হাবশী ভাষায় ‘হারজ’ অর্থ (মানুষ) হত্যা’’ [বুখারী ৭০৬৫]
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁর সম্পর্কে আমার ধারনা, তিনি হাদিসটি নাবী (সাঃ) হতে মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ ‘’কিয়ামতের আগে ‘হারজ’ অর্থাৎ হত্যার যুগ শুরু হবে। তখন ইলম বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং মূর্খতা প্রকাশিত হয়ে পরবে। আবু মুসা (রাঃ) বলেন, হাবশী ভাষায় ‘হারজ’ অর্থ (মানুষ) হত্যা’’ [বুখারী ৭০৬৬]
আবু আওয়ানা তাঁর বর্ণনাসুত্রে আবু মুসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, নাবী (সাঃ) যে যুগকে ‘হারজ’-এর যুগ বলেছেন, সে যুগ সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন কি? এর উত্তরে তিনি আগে উল্লেখিত হাদিসটি বর্ণনা করেন। ইবন মাস’উদ (রাঃ) বলেন, আমি নাবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামত যাদের জীবনকালে সংঘটিত হবে তারাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক’’ [বুখারী ৭০৬৭]

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হত্যার মতো জঘন্য কাজ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন।



Writer: Anisur Rahman

কোন মন্তব্য নেই