পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

মঙ্গলবার্তা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
যে মানুষটা মূর্তির সামনে প্রণাম করে সে কোনদিন বলে না মূর্তিটা তাকে সৃষ্টি করেছে। যে আগুনের চারপাশে ঘুরে সে-ও বলে না এই আগুনটা পৃথিবী,আকাশ সৃষ্টি করেছে। মাজারের সামনে সিজদায় পড়ে থাকা কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, সে-ও বলবে না এই মৃত ব্যক্তিটাই তাকে রোগমুক্ত করেছে। এরা সবাই শিক্ষিত,উচ্চশিক্ষিত। তারা এই সব “কুসংস্কার” এ বিশ্বাসী নয়। আল্লাহ এ কথাটা কুরআনে বলেছেন এভাবে-

وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُ ۖ فَأَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ [٤٣:٨٧]

অর্থঃ “আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে তারা অবশ্যই অবশ্যই বলবে আল্লাহ। তাহলে তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?” (সুরা যুখরুফ ৪৩:৮৭)

যারা এত জোর দিয়ে বলবে আল্লাহ তাদের স্রষ্টা তাদের কিন্তু আল্লাহ মুসলিম বলেননি। কারণ তারা আল্লাহকে স্রষ্টা মানত, তার ইবাদাত করত না। তাকে অমঙ্গল থেকে উদ্ধারকারী মানত, কিন্তু তার কাছে অমঙ্গল থেকে বাঁচার জন্য দুয়া করত না। তাই আল্লাহ উপরে বলেছেন, “তাহলে তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে”।

তারা আল্লাহকে সবকিছুর মালিক মানত, কিন্তু তার কাছে দুয়া করত না কেন? কারণ-

তারা বিশ্বাস করত, ঐ মূর্তি, ভাস্কর্য, কবরের মানুষ এগুলো হলো “উসীলা” বা মাধ্যম যা তাকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেবে।

وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُوا مِن دُونِهِۦٓ أَوْلِيَآءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلْفَىٰٓ

অর্থঃ যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে (বলে যে), আমরা তাদের ইবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। (সূরা যুমার ৩৯:৩)

ব্যাপারটা কি এমন যে, একদিন সকালে তারা ঘুম থেকে উঠলো আর হঠাৎ একজনের মনে হলো এই মূর্তিগুলো আমাদের উসীলা, তারা আমাদের কথাগুলো আল্লাহকে বলবে?

না। বরং সূরা নূহে আল্লাহ মূর্তিপূজার ইতিহাস বলেছেন।[১] তাদের মূর্তিগুলো ছিল কিছু ভালো মানুষের, যারা মারা যাবার পর তাদের “স্মৃতির স্মরণে প্রতীক” হিসেবে তারা এগুলো বানায় যাতে এর দিকে তাকালে তাদের ভালো কাজগুলোর কথা মনে হয় আর সেখান থেকে অণুপ্রেরণা নিতে পারে।খুব সুন্দর যুক্তি,তাই না?

“স্মৃতির স্মরণে প্রতীক” বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ছিলো মূর্তি বানানোর আদি অকৃত্রিম যুক্তি। যেহেতু মূর্তিগুলো খুব ভালো মানুষের তাই সহজাতভাবেই তার প্রতি তাদের সম্মানের অনুভূতি কাজ করত। যখন পরবর্তী প্রজন্মগুলো এসে দেখলো এই মূর্তিগুলোকে “আবহমানকাল ধরে” সম্মান শ্রদ্ধা করা হয় তার মানে এরা নিশ্চয়ই আল্লাহর খুব কাছের লোক, তাদের কাছে চাইলে তারা সুপারিশ করে আল্লাহর কাছে বলবে। আর যেহেতু মূর্তিগুলোর প্রতি এতদিনে তাদের প্রচণ্ড ভালোবাসা তৈরি হয়েছে তাই এদের মাধ্যমে না চাইলে সেটা তাদের কাছে “বেয়াদবি”।

তাহলে আমরা বুঝলাম তাদের মূর্তিপূজা শুরু হয়েছিলো কোনো “প্রতীকী ভাস্কর্য” বানিয়ে সেটাকে “প্রতীকী সম্মান” দেখানোর মাধ্যমে এবং সেটাকে ভালোবাসার মাধ্যমে।
তাদের এই কাজগুলো ভুল কেন?অনেকগুলো কারণ-

১। এই ধারণা যে আল্লাহর কাছে চাওয়ার জন্য মাধ্যম লাগে। বরং মুসলিমরা বিশ্বাস করে আল্লাহ মানুষের অন্তরের খবরও জানেন এবং মাধ্যমের সাহায্য ছাড়াই আল্লাহ সবকিছু করতে পারেন। তাই আল্লাহর জন্য মাধ্যম দরকার এমনটা মনে করা আল্লাহর গুণাবলীকে খাটো করা।আর “আমার মাধ্যম দরকার কারণ আমি তুচ্ছ,গুনাহগার এবং আল্লাহ আমার কথা শুনবেন না” এমন ধারণাও আল্লাহর ব্যাপারে খারাপ ধারণা।

২। এই ধারণা যে ঐ ভালো মানুষগুলো আল্লাহর “মাধ্যম” অথচ আল্লাহ তাদের “উসীলা” হওয়া বা তাদের দুয়া কবুল হওয়া বা তাদের নিজেদেরই জান্নাতে যাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেননি।

৩। এই ধারণা যে আল্লাহ যদি কাউকে জান্নাতে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেন বা কোনো মর্যাদা দেন, তবে তার কাছে চাইতে হবে বা তাকে আল্লাহর কাছে চাওয়ার “মাধ্যম” মনে করতে হবে।

৪। এই ধারণা যে ঐ মাধ্যমগুলোর কাছে চাইলে তারা এই দুয়া শুনতে পায়, তার জবাব দেয় এবং তা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার সামর্থ্য রাখে।এই ধারণার দ্বারা তারা সৃষ্ট বস্তুর উপর অতিরিক্ত মর্যাদা বা ক্ষমতা আরোপ করে।

“তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকো,উপাস্য মনে কর,তারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছুর মালিক নয়, তাতে ওদের কোনো অংশীদারিত্বও নেই, তারা আল্লাহর কাজে সাহায্যকারীও নয়। যাকে অনুমতি দেয়া হবে সে ছাড়া কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।”(সূরা সাবা ২৩,২৪)

এই সুপারিশকারীদের কোনো মালিকানা নেই, অংশীদারিত্ব নেই, সাহায্যকারী নয় এবং অনুমতি না দিলে কিছুই করতে পারবে না। তাহলে আর কোন যুক্তিতে তাদের কাছে ধর্ণা দিতে হবে?

৫। এই ধারণা যে যেহেতু আবহমানকাল ধরে পূর্বপুরুষরা এই কাজ করে আসছে তার মানে এটাই ঠিক।[২]

“আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে কখনো না, আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদিও তাদের বাপ দাদারা কিছুই জানতো না, জানতো না সরল পথও।”(বাকারাঃ ১৭০)

৬। এই ধারণা যে যারা এই কাজ করে তারা দুনিয়ায় খুব সুখে আছে,তারা ধনী ও ক্ষমতাবান এবং আল্লাহ তাদের উপর কোনো শাস্তি দিচ্ছেন না,সুতরাং তারাই ঠিক।[৩] বিপরীতভাবে যারা এই কাজ করে না তারা দুঃখ কষ্টে আছে,তার মানে তারা ভুল।[৪]
ইত্যাদি আরও অনেক...

তারা যা বলে সবই তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তি। এজন্যই কুরআনে আল্লাহ বারবার তাদের দাবির স্বপক্ষে দলীল আনতে বলেছেন।

قُلْ هَاتُوا۟ بُرْهَـٰنَكُمْ إِن كُنتُمْ صَـٰدِقِينَ [٢٧:٦٤]

অর্থঃ বল,তোমরা প্রমাণ নিয়ে আসো,যদি তোমরা সত্যবাদী হও।(নামলঃ ৬৪)

সৃষ্ট বস্তুকে এভাবে মনগড়াভাবে সম্মান-মর্যাদা দিয়ে তার অনুসরণ করা,তার কাছে কল্যাণ কামনা,আশা করা,অকল্যাণ থেকে আশ্রয় কামনা করা, ভালোবাসা, তার বিধানের দ্বারস্থ হওয়াই হচ্ছে শির্ক, যা সবচেয়ে বড় যুলুম[৫], যার শাস্তি চিরস্থায়ী জাহান্নাম[৬]। এর কারণ এই কাজগুলো ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত, আর ইবাদাতের হকদার কেবল আল্লাহ, এতে অন্য কাউকে যোগ করলেই সেটা শির্ক। মূলত এই মূর্তি বা প্রতীকগুলো তো কোনো বিধান দিতে পারে না, কিন্তু এগুলোর “স্রষ্টারা” এগুলোর প্রতি মানুষের আনুগত্য আদায় করে এবং নিজেদের বানানো বিধি নিষেধ, নিজেদের চেতনা বিশ্বাস এই মূর্তি বা প্রতীকের নামে চলিয়ে দেয়। ইসলাম এই অযৌক্তিক আচার এবং দাসত্ব সমূলে উৎখাত করে। তাই এই মনগড়া কোনো মূর্তি,ভাস্কর্য,ব্যক্তিত্ব,বিশেষ দিবস, যেকোনো সৃষ্ট বস্তুকে “প্রতীকী সম্মান” দেখানো অথবা “প্রতীকী ঘৃণা” দেখানো ইসলামে নেই। ইসলামে সব কিছুর মালিক আল্লাহ, তাই কল্যাণ বা মঙ্গলকামনা হবে আল্লাহর কাছে, অকল্যাণ বা অমঙ্গল থেকে আশ্রয়ও চাইতে হবে আল্লাহর কাছে। ইসলামে বাঘ-ভাল্লূক-পেঁচা-হায়েনা “অশুভ শক্তির প্রতীক” না, এদের ধাওয়া করলে বিজয় আসে না,অপশক্তিও দূর হয় না। নতুন বছরে মঙ্গলকামনা করলে মঙ্গল আসে না। এদিন ভালো খেলে, আনন্দ করলে সারা বছর আনন্দে কাটে না। এগুলো অর্থহীন বিশ্বাসমাত্র। আল্লাহর সব দিন সমান, কোন দিনকে বিশেষ মর্যাদা দেয়ার কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহর। বরং আমরা দেখেছি মূর্তিপূজার প্রারম্ভিক সময় থেকে মানুষ বিভিন্ন জিনিসের প্রতীক বানিয়ে কল্যাণ আশা করত। এই আচারগুলো বহু আগে থেকে চলে আসা কুসংস্কার। কুসংস্কার কোনো ঐতিহ্য নয়। এর স্বীকৃতি কোনো গর্বের বিষয় নয়। ইসলাম এসব কুসংস্কার পদদলিত করে। আর এর প্রচার-প্রসারকারীরা এর দ্বারা মূলত নিজেদের চেতনা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়, কখনোও তাদের মানতে বাধ্য করে।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই উম্মতের কিছু মানুষ মূর্তিপূজা করবে বলে জানিয়েছেন।[৭] ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-যিনি নিজ হাতে মূর্তি ভেঙেছেন তিনি নিজের ব্যাপারে আর নিজের সন্তানদের ব্যাপারে মূর্তিপূজার ভয় করতেন,তাই আল্লাহর কাছে দুয়া করেছেন।[৮] মানুষকে মূর্তিপূজা করানো শয়তানের “চূড়ান্ত উদ্দেশ্য”। সে আস্তে আস্তে মানুষকে এই কাজের দিকে ডাকে। তাই সে একে আকর্ষণীয় বানায়। এর সাথে সে তাই গান-বাজনা, নারী, ব্যবসা, মদ, উৎসব, মাস্তি ইত্যাদি জুড়ে দেয়। যেন মানুষ এই দুনিয়াবি জিনিসের লোভে সেখানে যায় এবং শির্কের প্রতি “স্পর্শকাতরতা” ও ঘৃণা কমে যায়। ফলে একসময় শির্কে পতিত হয়। আল্লাহ যেন মুসলিমদের এই দুনিয়ার হাতছানি এড়িয়ে জান্নাতকে অগ্রাধিকার বানানোর সামর্থ্য দেন।

রেফারেন্সঃ
[১] সূরা নূহঃ ২৩ আয়াতের তাফসীর
[২] আম্বিয়াঃ ৫৩,৫৪, শুআরাঃ ৭৪ ইত্যাদি বহু আয়াত
[৩]সূরা সাবাঃ ৩৪-৩৬
[৪]সূরা হূদঃ ২৫-২৭,সূরা শুআরাঃ ১০৫-১১৫
[৫]সূরা লুকমানঃ ১৩
[৬]নিসা ৪৮,বুখারীঃ ৪৪৯৭,মুসলিমঃ৯৩
[৭] “ততক্ষণ কিয়ামাত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ আমার উম্মাতের একদল মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং আমার উম্মতের একটি শ্রেণি মূর্তিপূজা করবে” (আবু দাউদঃ ৮৪৫২,আহমাদঃ ২৭৮,২৮৪)এছাড়াও সুরা নিসাঃ৫১,৫২,মায়িদাঃ ৬০,কাহফঃ২১
[৮]ইবরাহীমঃ ৩৫

Writer: ARIF AHMED

কোন মন্তব্য নেই