পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

কিয়ামতের মাঠে বিদা’আতকারীদের কঠিন পরিণতি

হাউযে কাউসারের সামনে থেকে একদল লোককে তাড়িয়ে দেয়া হবে

হাদীস- ১
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রান! আমি নিশ্চয়ই (কিয়ামতের দিন) আমার হাউয হতে কিছু লোকদেরকে এমনভাবে তাড়িয়ে দিব, যেমন অপরিচিত উটকে তাড়িয়ে দেয়া হয়’’ বুখারী ২৩৬৭; মুসলিম ৫৮৮৭-(৩৮/২৩০২)

হাদীস- ২
ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’কিয়ামত দিবসে মানুষকে খালি পায়ে, নগ্ন শরীরে ও খৎনাবিহীন অবস্থায় উঠানো হবে, যেভাবে প্রথমবার সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ‘যেদিন আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে আবার সৃষ্টি করবো। প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা আমার কর্তব্য, আমি তা অবশ্যই পালন করবো’ (আম্বিয়া ২১/১০৪)

ইবরাহীম (আঃ)-কে সর্বপ্রথম পোশাক পড়ানো হবে। আমার সাথীগনের মধ্যকার কিছু সংখ্যক লোককে বন্দী করে ডানে-বামে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে প্রভু! এরা তো আমার অনুসারী। আমাকে তখন বলা হবে, আপনি তো জানেন না, আপনার পরে এরা কী সব বিদা’আতি কাজ করেছে। আপনি তাদের কাছ থেকে পৃথক হওয়ার পর হতে তারা পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে আরম্ভ করেছে।

তখন আমি আল্লাহ তায়ালার সৎকর্মপরায়ণ বান্দা [ঈসা (আঃ)-এর] মতো বলবো, ‘আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তাহলে তারা তো আপনারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনি মহা পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় (মায়িদাহ ৫/১১৮)’’ বুখারী ৩৩৪৯, ৪৬২৫, ৪৬২৬, ৬৫২৬; মুসলিম ৭০৯৩-(৫৭/২৮৬০), ৭০৯৩-(৫৮/...); তিরমিযি ২৪২৩, ৩১৬৭; রিয়াদুস সালিহীন ১৬৯

বিদা’আতে লিপ্ত হওয়ার কারনেই তাদেরকে হাউযে কাওসার থেকে পানি পান করতে দেয়া হবে না

হাদীস- ৩
আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমি তোমাদের আগেই হাওযের কাছে গিয়ে হাজির হবো। আর ঐ সময় তোমাদের কতগুলো লোককে অবশ্যই আমার সামনে উঠানো হবে। আবার আমার সামনে থেকে তাদেরকে আলাদা করে নেয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে আমার প্রতিপালক! এরা তো আমার উম্মত। তখন বলা হবে, আপনার পরে এরা কী নতুন কাজ করেছে তা আপনি জানেন না’’ বুখারী ৬৫৭৬

হাদীস- ৪
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমার সামনে আমার উম্মতের কতক লোক হাউযের সামনে আসবে। তাদেরকে আমি চিনতে পারব। আমার সামনে থেকে তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলবো, এরা আমার উম্মত। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি জানো না তোমার পরে এরা কী সব নতুন নতুন মত ও পথ বের করেছিল’’ বুখারী ৬৫৮২

হাদীস- ৫
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমার উম্মত হতে একদল লোক কিয়ামতের দিন আমার সামনে (হাউযে কাউসারে) হাজির হবে। এরপর তাদেরকে হাউয থেকে আলাদা করে দেয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে প্রভু! এরা তো আমার উম্মত। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কী সব নতুন বিষয় সৃষ্টি করেছে এব্যাপারে নিশ্চয়ই তোমার জানা নেই, নিশ্চয়ই এরা দ্বীন থেকে পিছনের দিকে ফিরে গিয়েছিল’’ বুখারী ৬৫৮৫

হাদীস- ৬
সা’ঈদ ইবন মুসাইয়াব (রহঃ) নবী (সাঃ)-এর সাহাবীদের থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমার উম্মতের কিছু লোক আমার সামনে হাউযে কাউসারে হাজির হবে। তারপর তাদেরকে সেখান থেকে আলাদা করে নেয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে রব! এরা তো আমার উম্মত। তিনি বলবেন, তোমার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কী বিষয় সৃষ্টি করেছে সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই তোমার জানা নেই। নিঃসন্দেহে এরা দ্বীন থেকে পিছনে ফিরে গিয়েছিল’’ বুখারী ৬৫৮৬

হাদীস- ৭
আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’নিশ্চয়ই আমি হাউযের ধারে থাকবো। তোমাদের মধ্য হতে যারা আমার কাছে আসবে আমি তাদেরকে দেখতে পাবো। কিছু লোককে আমার সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে প্রতিপালক! এরা আমার অন্তর্ভুক্ত, এরা আমার উম্মত। তখন বলা হবে, তুমি কি জানো তোমার পরে এরা কী সব আমল করেছে? আল্লাহর কসম! এরা দ্বীন থেকে সর্বদাই পিছনে ফিরে যেত।
বর্ণনাকারী ইবন আবু মুলাইকা বললেন, হে আল্লাহ! দ্বীন থেকে পিছনে ফেরা অথবা দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনায় পড়া থেকে আমরা তোমার কাছে পানাহ চাই’’ বুখারী ৬৫৯৩, ৭০৪৮; মুসলিম ৫৮৬৬-(.../২২৯৩)

হাদীস- ৮
আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমি হাউযে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেইই হাজির থাকবো। তোমাদের কিছু লোককে আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তোমাদের পান করাতে উদ্যত হবো, তখন কিছু লোককে আমার নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। আমি বলবো, হে রব! এরা তো আমার সাথী (উম্মত)। তখন তিনি বলবেন, আপনার পর তারা নতুন কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না’’ বুখারী ৭০৪৯

হাদীস- ৯
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে তাঁর সাহাবীগনের সামনে বলতে শুনেছিঃ ‘’আমি হাউযের নিকট তোমাদের মধ্য হতে যারা আমার নিকট আসবে তাদের প্রতীক্ষায় থাকবো। আল্লাহর কসম! আমার কাছ থেকে অবশ্যই কিছু ব্যক্তিকে আলাদা করে দেয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে রব! এরা তো আমারই এবং আমার উম্মতেরই। আল্লাহ বলবেন, আপনি অবশ্যই জানেন না, তারা আপনার পরে কি আমল করেছে। তারা তো তাদের পিছনের দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছে’’ মুসলিম ৫৮৬৭-(২৮/২২৯৪)

হাদীস- ১০
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমি হাউযের নিকট তোমাদের অগ্রগামী। আর আমি অবশ্যই কিছু দলের সম্বন্ধে বাক-বিতণ্ডা করবো এবং আমি অবশ্যই তাদের ব্যাপারে পরাজিত হয়ে যাব। তখন আমি বলবো, হে রব! এরা তো আমার সহচর, আমার সঙ্গী। তখন বলা হবে, আপনি তো জানেন না যে, তারা আপনার পরে কী নতুন বিষয়াদি আবিস্কার করেছে’’ মুসলিম ৫৮৭২-(৩২/২২৯৭)

হাদীস- ১১
আনাস ইবন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’নিশ্চয়ই হাউযের পাশে এমন কতিপয় লোক আসবে যারা পৃথিবীতে আমার সাহচর্য পেয়েছিল। এমন কি তখন আমি তাদেরকে দেখতে পাবো এবং তাদেরকে আমার সামনে নিয়ে আসা হবে। তখন আমার কাছে আসতে তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে। অতঃপর আমি বলবো, হে প্রভু! এরা তো আমার সঙ্গী, এরা আমার সঙ্গী। তখন আমাকে বলা হবে, নিশ্চয়ই আপনি জানে না, আপনার পরে এরা কিভাবে দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবন করেছে’’ মুসলিম ৫৮৯০-(৪০/২৩০৪)

হাদীস- ১২
আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আরাফাতের ময়দানে (বিদায় হজ্জের দিন) তাঁর কানকাটা উস্ট্রীতে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ ‘’তোমরা কি জানো আজ কোন দিন, এটা কোন মাস এবং এটা কোন শহর? তারা বলেন, এটা (মক্কা) সম্মানিত শহর, সম্মানিত মাস ও সম্মানিত দিন।

তিনি আরও বলেন, সাবধান! তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের রক্ত, তোমাদের পরস্পরের প্রতি তেমনই হারাম যেমনি তোমাদের এই মাসের সম্মান রয়েছে, তোমাদের এই শহরে তোমাদের এই দিনে।

শুনে রাখো! আমি তোমাদের আগেই হাউযে কাউসারে উপস্থিত থাকব। অন্যান্য উম্মতের তুলনায় আমি তোমাদের সংখাধিক্য নিয়ে গৌরব করবো। তোমরা যেন আমার চেহারা কালিমালিপ্ত না করো। সাবধান! কিছু লোককে আমি মুক্ত করতে পারব, আর কিছু লোককে আমার নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া হবে। তখন আমি বলবো, হে আল্লাহ! এরা তো আমার সাথী। তিনি বলবেন, তোমার পরে এরা কী বিদা’আত করেছে তা তুমি জানো না’’ ইবন মাযাহ ৩০৫৭ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার সময় রাসুল (সাঃ) বলবেনঃ ‘দূর হও, দূর হও’

হাদীস- ১৩
সাহল ইবন সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমি তোমাদের আগে হাউযের নিকট পৌঁছব। যে আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে, সে হাউযের পানি পান করবে। আর যে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। নিঃসন্দেহে কিছু সম্প্রদায় আমার (হাউযের) সামনে উপস্থিত হবে। আমি তাদেরকে চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। এরপর আমার এবং তাদের মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে’’

আবু সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেন, তখন নবী (সাঃ) বলবেনঃ ‘এরা তো আমারই অনুসারী।‘ তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয়ই জানেন না যে, আপনার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কী পরিবর্তন করেছে। তখন নবী (সাঃ) বলবেনঃ তারা দূর হোক, দূর হোক’’ বুখারী ৬৫৮৩, ৬৫৮৪, ৭০৫০, ৭০৫২; মুসলিম ৫৮৬২-(২৬/২২৯০), ৫৮৬৩-(.../২২৯১)

হাদীস- ১৪
উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’আমি তোমাদের জন্য হাউযের নিকট অগ্রগামী হবো। তাই সাবধান! আমার নিকট তোমাদের এমন কেউ যেন না আসে, যাকে আমার নিকট হতে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়, যেমন হারানো উটকে ভাগিয়ে দেয়া হয়। আর আমি বলতে থাকবো, কেন তাদেরকে তাড়ানো হচ্ছে? তখন বলা হবে, আপনি তো জানেন না, তারা আপনার পরে কী নতুন বিষয়ের আবিস্কার করেছে? তখন আমি বলবো, দূর হও! মুসলিম ৫৮৬৮-(২৯/২২৯৫)

হাদীস- ১৫
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) কবরস্থানে এসে কবরবাসীদেরকে সালাম দিলেন এবং বললেন, ঈমানদার কবরবাসীরা! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহ চাহে তো অচিরেই আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমাদের আকাঙ্ক্ষা এই যে, আমরা আমাদের ভাইদেরকে দেখতে পাবো।
সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন, তোমরা আমার সাহাবী। আর যারা আমাদের পরে আসবে, তারা আমার ভাই।

আমি তোমাদের আগেই হাউযের নিকট উপস্থিত হবো। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এমন লোকদেরকে কিভাবে চিনবেন, যারা এখনও জন্মলাভ করেনি? রাসুল (সাঃ) বললেন, তোমরা কি দেখো না, যদি কোনো ব্যক্তির একটি সাদা পা ও সাদা চিহ্নযুক্ত ঘোড়া অপর ব্যক্তির কালো ঘোড়ার সাথে মিশে যায়, তবে কি সে তার ঘোড়াটি চিনতে পারবে না? তাঁরা বলেন, হাঁ, নিশ্চয়ই চিনতে পারবে। রাসুল (সাঃ) বললেন, তাঁরা কিয়ামতের দিন অযুর বদৌলতে সাদা হাত-পা ও সাদা চিহ্ন বিশিষ্ট অবস্থায় আসবে।
আমি তোমাদের আগেই হাউযে কাউসারে উপস্থিত হবো। একদল লোক আমার হাউয থেকে বিতাড়িত হবে, যেমন পথভোলা উট বিতাড়িত হয়। আমি তাদেরকে ডেকে বলবো, তোমরা এদিকে এসো, তোমরা এদিকে এসো। তখন বলা হবে, এসব লোক আপনার পরে দ্বীনকে পরিবর্তন করেছে এবং তারা পশ্চাতে ফিরে গেছে। তখন আমি বলবো, দূর হও, দূর হও’’ ইবন মাযাহ ৪৩০৬ (আলবানি সহীহ বলেছেন)


Writer: Anisur Rahman

কোন মন্তব্য নেই