পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

ঈমানের আলামত


আমরা আমাদের 'মাথার উপরে পাহাড়' দেখি নাকি নাকের ডগায় মাছি? একদম শেষে নিজেরা নিজদেরকে উত্তর দিলেই হবে।

[১]
একজন ছেলে চরমভাবে সিগারেটে আসক্ত। সে জানে এটা হারাম এবং গুনাহের কাজ। কিন্তু অভ্যাস ছাড়তে পারছে না। তবে সে ছাড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে, প্রতি নিয়ত দুয়া করে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে কমাচ্ছে।

আরেকজন ছেলে, সেও সিগারেট খায়। তবে সে স্বীকার করতে চায়না যে সিগারেট হারাম। সে বিভিন্ন ভ্রান্ত দলীল আর নিজের মনগড়া ব্যাখা দিয়ে এটা প্রমাণ করতে চায় যে এটা খুব বেশী মাকরূহ, হারাম নয়। অর্থাৎ সে নিজের খাওয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চায় যে খাওয়া যাবে।

[২]
একজন ছেলে বা মেয়ে হারাম সম্পর্কে জড়িত আছে। মনে ছিটে ফোটা দ্বীন আছে। স্বীকার করছে যে চরম পাপ হচ্ছে। আবার বেরিয়ে আসতেও পারছেনা ঈমানের দুর্বলতায়। তাছাড়া শয়তানও সম্পর্কটা লোভনীয় ও শোভনীয় করে রেখেছে। কিন্তু তাদের ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করছে যে এটা পাপ হচ্ছে ও আল্লাহ'র কাছে ঘৃন্য। বেরিয়ে আসার আপ্রান চেষ্টা করছে এবং অবশেষে বেরিয়ে আসতে সফল হচ্ছে।

আরেকটা দ্বীনি মডারেট অবৈধ কাপল। এটা প্রমানের ব্যাপারে চেষ্টায় আছে যে বিয়ের আগেও পবিত্র প্রেম সম্ভব। এবং তারা যে এত বড় পর্যায়ের গুনাহ করছেন, সেই ব্যাপারে তাদের কোন আফসোস নিই, ন্যুনতম অনুভুতি বা ভ্রুক্ষেপ নেই। এইদিকে নামাজ কালামও চলছে, ঐদিকে স্বাভাবিক ভাবেই অবৈধ প্রেমও চলছে। কোন অনুভুতি নেই, বের হয়ে আসার চেষ্টা নেই।

[৩]
একজন মেয়ে ঈমানের দুর্বলতা, পারিবারিক চাপ ও পরিস্থিতির কারণে বোরকা পড়তে পারেনা। সালোয়ার কামিজ পড়ে। তবে বোরকা ছাড়া যে পূর্ন পর্দা হয়না এটা সে স্বীকার করে। নিজের পোশাকের জন্য তার অপরাধ বোধও হয় এবং নিয়ত আছে আল্লাহ সহজ করে দিলে বোরকা পরবেন।

আরেকজন মেয়ে, যে সালোয়ার কামিজ পড়লে ওড়না গলায় পরে, টপ্স জিনস পরে বেপর্দা হয়ে চলে, নিজের পাপের ব্যাপারে তার কোন ঘৃন্য অনুভুতি কাজ করেনা উলটো বড় বড় জ্ঞান দেয় যে বোরকা ইসলামী পোষাক নয় এবং তাদের সেই ঐতিহাসিক মনগড়া ফতোয়া দেয় যে, মূলত মন পরিষ্কার থাকাটাই ঈমান, মন পরিষ্কার তো সব ওকে। পোশাকে কী আসে যায়!

[৪]
একজন ছেলে বা মেয়ে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সময় হঠাত খারাপ ভিডিও সামনে চলে আসায় নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে তা দেখে ফেলল, তারপর অনুতপ্ত হয়ে খুব কান্নাকাটি করে আল্লাহ'র কাছে মাফ চেয়ে নিল।

আরেকজন ছেলে বা মেয়ে, এব্যাপারে যখন ইচ্ছে হল এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই ব্রাউজ করে খুঁজে এমন ভিডিও দেখল। এবং এ ব্যাপারে তার মধ্যে কোন অপরাধ বোধ কাজ করল না।

[৫]
একটা ছেলে পরিবেশ পরিস্থিতি ও ঈমানের দুর্বলতায় দাঁড়ি রাখতে পারছেনা। অথচ তার তীব্র ইচ্ছে আছে। সে এটার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে কিন্তু প্রতিবার বাধ্য হয়ে দাঁড়ি চেছে ফেলতেহচ্ছে। সে প্রচন্ড অপরাধ বোধে ভুগে। গুনাহের লজ্জায় মাথা তুলে দাড়াতে পারেনা। শায়খদের থেকে শুনেছে যেখানে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে ইন শা আল্লাহ তাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন, তবুও সে শান্তি পাচ্ছেনা।

আরেক ছেলে দাঁড়ি তো রাখেই না, উল্টো যারা দাঁড়ি রাখে তাদের সাথে এই তর্কে ব্যস্ত যে দাঁড়ি ফরজ, ওয়াজিব সুন্নত নাকি নফল। নিজের দাঁড়ি না রাখা নিয়ে যেহেতু তার মনে কোন অনুভুতি নেই তাই সে এটা জাস্টিফাই করতে ব্যস্ত দাঁড়ি না রাখলেও চলে ব্যাপারটা।

দেখুন, আমাদের সবারই গোনাহ তো হয়েই যায়। শয়তানের ধোঁকায়, নফসের প্ররোচনায়, ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় গোনাহ হয়েই যায়। মানুষকে তো সৃষ্টিই করা হয়েছে এই ভাবে যে সে গুনাহ করবে, আবার ক্ষমা চাইবে। আল্লাহ যদি চাইতেন আমরা গুণাহমুক্ত হি তাহলে তিনি আমাদেরকে ফেরেশতা হিসেবে তৈরী করতেন, মানুষ নয়। ওয়াল্লাহু আলাম।

➡ এখন যেটা লক্ষ্যনীয় যে গুনাহ'র আফটার ইফেক্ট টা কী? গুনাহ করে আমি কি অনুতপ্ত? নাকি আমার কোন ফিলিংসই নেই এই ব্যাপারে? বরং আমি আমার গুনাহটা কে জাস্টিফিকেশনের চেষ্টায় থাকছি?
.
গুনাহ করাটা যতটা জাহেলিয়াতি, গুনাহ করে গুনাহগুলোকে দেখেও না দেখার ভান করা আরো ভয়াবহ। আমরা অনেক সময় স্বীকার করতে চাইনা নিজেদের গুনাহ গুলো। কতো রকম যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করি। একটু ফ্যাশন, শখ, মনের ইচ্ছা পূরণ, মানুষের সামনে বড় হওয়া, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমরা গুনাহ-র কাজে জড়িয়ে পরি। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিনয়ের সাথে ক্ষমা চাওয়ার কথা ভাবতে পারিনা। অথচ কিয়ামতের দিন এক আল্লাহর রহমত আর দয়া ছাড়া কিছুই আমাদেরকে আগুন থেকে বাঁচাতে পারবে না।

➡ আমাদের যুক্তি, অহংকার, শয়তানের মতই আমাদেরকে ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বিরত রাখে। মনে আছে? শয়তানও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে অযৌক্তিক যুক্তি জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছিল যে, আদম মাটির তৈরী আর সে আগুনের। সে কেন আদমকে সেজদাহ করবে?

আমাদের গুনাহের ব্যাপারে আমাদের ভিউটা কেমন, সেটাই আমাদের ঈমান যাচাই এর ফিল্টার। গুনাহের কাজ করে মনে খারাপ লাগা, আফসোস আসা এটা ঈমানের আলামত। গোনাহ করে খারাপ না লাগাটা ঈমানহীনতার আলামত।

✍ হযরত আবু উমামা রাঃ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করল, “ঈমান”কি? রাসূল (সা) বললেন, "যখন তোমার নেক কাজ তোমাকে আনন্দিত করে, আর গোনাহের কাজ তোমাকে পেরেশান করে সেটাই তোমার ঈমান, তুমি মুমিন।"

লোকটি আবার জিজ্ঞেস করে, তাহলে গোনাহ কি? তিনি বললেন, "যখন তোমার মনে কোন বিষয় নিয়ে সংশয় হয়,তাহলে তা ছেড়ে দাও। সেটাই গুনাহ" [মুসনাদে আহমাদ, হা/২২১৬৬, মুসনাদুল হারেস/১১]

➡ এখন উপরের পাঁচটা উদাহরণের দ্বিতীয় ব্যক্তিরা তাদের উক্ত পাপকে কোন পাপই মনে করেনা। অনেক বড় বড় পাপ কে ছোট পাপ মনে করে এবং ছোট পাপকে আমলেই নেয়না। গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করে।

এই ধরণের মানুষ সেই যামানাতেও ছিল। যাদের সম্পর্কে বর্ণিত আছে-

✍ হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা এমন সব কাজ কর যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহর যুগে এগুলোকে মনে করতাম ধ্বংসকারী। [ সহীহ বুখারী]

এজন্য দেখবেন এদের কেউ কেউ সগীরা গুনাহকে খুবই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। যেমন বলে, একবার খারাপ কিছু দেখলে অথবা কোন গাইরে মাহরাম এর সাথে মিশলে, একবার হ্যান্ডসেক করলে কি-ই বা ক্ষতি হবে?

অনেকেই আগ্রহ ভরে হারাম জিনিসের দিকে নজর দেয় পত্র পত্রিকায়, টিভিতে বা সিনেমায়। এমনকি এদের কেউ কেউ যখন জানতে পারে যে এটি হারাম, তখন খুবই রসিকতা করে প্রশ্ন করে, এতে কত গুনাহ রয়েছে? তাহলে কবীরা গুনাহ না সগীরা গুনাহ?
.
অথচ তাদের জেনে রাখা উচিৎ, সগীরা গুনাহ'র কন্টিনিউয়েশন একসময় কবীরা গুনাহতে রূপ নেয়।

এই বিষয়টির বিপজ্জনকতা কেমন তা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কিছু নসীহত থেকে উপলব্ধি করা যায়।

✍ ‘‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও! নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলোর উদাহরণ হল ঐ লোকদের মত যারা কোন মাঠে বা প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান করল এবং তাদের প্রত্যেকেই কিছু কিছু করে লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) সংগ্রহ করে নিয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত এতটা লাকড়ি তারা সংগ্রহ করল যা দিয়ে তাদের খাবার পাকানো হল।
.
✍ নিশ্চয় নগণ্য ছোট ছোট গুনাহতে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদেরকে যখন সেই নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলো গ্রাস করবে (পাকড়াও করবে) তখন তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে।’’
.
✍ অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, ‘‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও; কেননা সেগুলো মানুষের কাঁধে জমা হতে থাকে অতঃপর তাকে ধ্বংস করে দেয়।’’[আহমদ, সহীহ আল-জামে’ ২৬৮৬-২৬৮৭]

বিজ্ঞ আলেমরা এই কারণে বলে থাকেন, গুনাহ ছোট আপনি এদিকে দৃষ্টি দিবেন না, বরং আপনি দৃষ্টি দিবেন এদিকে যে, আপনি কার অবাধ্যতা করছেন।
.
গুনাহ এবং বিপদ আপদ যেভাবে মুমিন ও জাহেল কে পার্থক্য করে দেয়,

.
✍ "মুমিনের দৃষ্টান্ত হল নরম কোমল শস্যের মত, বাতাস যেদিকে দোলা দেয়, শস্যের পাতা সেদিকেই দুলতে থাকে। বাতাস থেমে গেলে স্থির হয়ে যায়। মুমিনও তেমনি বিভিন্ন আপদ-বিপদ দিয়ে তাকে দোলা দেওয়া হয়। আর কাফিরের দৃষ্টান্ত হল দেবদারু গাছের মত, দৃঢ় স্থির (বাতাস তাকে টলাতে পারে না) অবশেষে আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তাকে মূলোৎপাটন করে দেন।" [সহীহ বুখারী, হা/ ৭৪৬৬]
.
✍ ‘মু’মিন বান্দার কাছে তার গুনাহগুলো এমন যেন এখনই পাহাড় ভেঙ্গে তার মাথার উপর পড়বে; আর একজন দুর্বৃত্তকারীর কাছে গুনাহ এরকম যে মাছি এসে তার নাকের উপর উড়াউড়ি করছে, আর সে হাত নাড়িয়ে সেটা সরিয়ে দিল’।
[বুখারি, বইঃ৭৫, হাদীস নং ৩২০]

সুতরাং আমাদের কৃত গুনাহ গুলোর ব্যাপারে আমাদের ভিউটা, অর্থাৎ আমরা সেগুলো কিভাবে দেখি, কতটুকু গুরুত্ব দিই সেটাই আমাদের ঈমান যাচাই এর ফিল্টার। আমরা ঈমানদার কিনা তা বুঝার জন্য রাসুল (সাঃ) এই মানহাজ বলে দিয়েছেন।


আমাদের দৃষ্টিতে আমাদের গুনাহ গুলো আসলে কেমন? মাথার উপর পাহাড়? নাকি নাকের ডগায় মাছির মত? গুনাহ গুলো আমাদেরকে পেরেশান করে নাকি আমরা গুনাহ গুলো গুনাহই মনে করিনা, ড্যামকেয়ার থাকি? ছোট খাট গুনাহ গুলোকে আমলে নেই না

নিজেদের গুনাহকে এই প্রশ্নের ফিল্টারে ফেলি এবং নিজেকেই উত্তর দিই। এই প্রশ্নেগুলোর সত্যকার উত্তর গুলোই বুঝিয়ে দিবে আমরা মুমিন নাকি জাহেল।

লিখেছেন: ভাই শাহ্ মোহাম্মদ তন্ময়

কোন মন্তব্য নেই