পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

শিরকাত, মুদারাবা ও মুশারাকা কি?


প্রশ্ন : পার্থক্যসহ শিরকাত, মুদারাবা ও মুশারাকার সংজ্ঞা সবিস্তারে জানতে চাই।

উত্তর : বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে যেহেতু শিরকাত, মুদারাবা ও মুশারাকা সম্পর্কে আলোচনা হবে, কাজেই এর বিধিবিধান জানার আগে এগুলোর সংজ্ঞা, পরিচয় ও পারস্পরিক পার্থক্য ভালোভাবে বুঝে নেয়া প্রয়োজন।
শিরকাতের দুইটি সংজ্ঞা রয়েছে। একটি হলো, ব্যাপক অর্থবোধক সংজ্ঞা, যা মুদারাবা ও মুশারাকা উভয়কে শামিল করে। অপরটি হলো, বিশেষ অর্থ জ্ঞাপক সংজ্ঞা, যা মুদারাবা ও মুশারাকাকে শামিল করে না।

শিরকাতের ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক সংজ্ঞা : একাধিক সদস্য কোনো জিনিসের মালিকানায় বা কোনো লেনদেনে কিংবা লভ্যাংশে অংশীদার হওয়া। এ সংজ্ঞার আওতায় মুদারাবা ও মুশারাকাসহ শরিকি কারবারের যাবতীয় প্রকার শিরকাতের অন্তর্ভুক্ত।

শিরকাতের বিশেষ সংজ্ঞা : একাধিক সদস্য কোনো জিনিসের মালিকানায় কিংবা যৌথ পুঁজির কারবারে অংশীদার হওয়া। এ সংজ্ঞার মধ্যে শুধু পারিভাষিক শিরকাত ও মুশারাকা শামিল।

ব্যাপক অর্থবোধক ‘শিরকাত’ এর ধরনগুলো : ব্যাপক অর্থবোধক শিরকাত তিন ধরনের। যথা ১. পারিভাষিক শিরকাত, ২. মুদারাবা বা একপক্ষীয় মূলধনী কারবার, ৩. আধুনিক মুশারাকা বা যৌথ কারবার। পারিভাষিক শিরকাতের সংজ্ঞা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি দুই ধরনের সংজ্ঞা নিম্নে প্রদত্ত হলো

মুদারাবা বা একপক্ষীয় মূলধনী কারবার : দুইপক্ষ মিলে এ শর্তে কারবার করা যে, একপক্ষ মূলধন প্রদান করবে আর দ্বিতীয়পক্ষ তার শ্রম ব্যয় করে ওই মূলধন ব্যবসায় খাটাবে এবং ব্যবসা সংক্রান্ত যাবতীয় লেনদেন সেই আঞ্জাম দেবে। আর লভ্যাংশে উভয়পক্ষ চুক্তি অনুযায়ী শরিক থাকবে। এ ধরনের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দুইপক্ষ যৌথভাবে কারবার করাকে মুদারাবা বা একপক্ষীয় মূলধনী কারবার বলে। প্রথম পক্ষ অর্থাৎ মূলধনদাতাকে ‘রাব্বুল-মাল’ বা পুঁজি বিনিয়োগকারী (Invester) বলে। অপর পক্ষ তথা শ্রমদাতাকে কারবারি (Active) বা ‘মুদারিব’ বলে। এক্ষেত্রে খাটানো পুঁজিকে ‘রাসুল-মাল’ বা ‘মূলধন’ (Capital) বলে। মুদারাবার আরও দুইটি ধরন আছে। যথা ১. সাধারণ মুদারাবা, ২. বিশেষ শর্তযুক্ত মুদারাবা।

মুদারাবার এ দুই ধরনের আলোচনা পরবর্তী সময় ভিন্নভাবে সবিস্তারে উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

আধুনিক মুশারাকা (যৌথ কারবার) : ফিকাহশাস্ত্রের আগেকার কিতাবগুলোর মধ্যে ‘মুশারাকা’ শব্দকে শরিকি কারবারের বিশেষ কোনো ধরন বা কোনো নির্দিষ্ট কারবারের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। বরং ওই কিতাবগুলোতে ‘মুশারাকা’ আর ‘শিরকাত’কে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কাজেই ফিকহের এসব কিতাবে মুশারাকার সে অর্থ পাওয়া যাবে না, যে অর্থ উল্লেখ করা এখানে উদ্দেশ্য। অনুরূপভাবে শিরকাত বিষয়ের ওপর বর্তমানে যে গ্রন্থাদি রচিত হয়েছে, সেগুলোও মূলত আগেকার কিতাবাদি থেকে সংকলিত বিধায় এ কিতাবগুলোতেও মুশারাকার নতুন ধরনের কোনো তত্ত্বমূলক বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। কিন্তু আধুনিক তত্ত্ববিদরা শিরকাতের এক নতুন পদ্ধতিকে মুশারাকা বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ মুশারাকা শব্দ দ্বারা ফাইন্যান্সিং (Financing) আর ইনভেস্টমেন্টের সুদমুক্ত, অতি লাভজনক পদ্ধতিগুলো বোঝানো হয়ে থাকে। এর সারসংক্ষেপ রূপ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

মুশারাকা বস্তুত শিরকাত আর মুদারাবার সমন্বিত এক নতুন পদ্ধতি। এর সারকথা হলো মুদারাবার ক্ষেত্রে একজন পুঁজি বিনিয়োগ করে থাকে, যাকে পুঁজি বিনিয়োগকারী বা ‘রাব্বুল-মাল’ বলা হয়। অপরজন এর দ্বারা শ্রম খাটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে মুনাফা উপার্জন করে থাকে, যাকে ‘মুদারিব’ বা ‘কারবারি’ বলা হয়। সাধারণত কারবারি তার নিজস্ব পুঁজি এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে না; বরং পুঁজিদাতার মূলধন দ্বারা ব্যবসা করে থাকে। কিন্তু যখন কারবারি নিজের কিছু পুঁজি ওই ব্যবসায় লাগাতে চায়, তখন মুদারাবার সঙ্গে শিরকাত সমন্বিত হয়ে যায়। যেমন খালিদ হলো পুঁজি বিনিয়োগকারী আর ওমর হলো কারবারি। খালিদ ওমরকে মুদারাবার চুক্তিতে ১ লাখ টাকা প্রদান করেছে। এক্ষেত্রে ওমর (কারবারি) নিজের পক্ষ থেকে আরও ৫০ হাজার টাকা ব্যবসায় খাটিয়েছে। তাহলে এ শিরকাত মুশারাকায় রূপান্তরিত হয়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে এ পদ্ধতিকে মুদারাবাও বলা যাবে।

আধুনিক মুশারাকার আরও বিশ্লেষণ সামনে কোনো সময় উল্লেখ করা হবে।

পরিভাষাগত শিরকাত তিন ধরনের : ১. শিরকাতে ইবাহাহ তথা সর্বজনীন অংশীদারিত্ব। ২. শিরকাতে মিলক তথা মালিকানায় অংশীদারিত্ব। ৩. শিরকাতে আকদ তথা চুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্ব।

শিরকাতে ইবাহার সংজ্ঞা : ‘শিরকাতে-ইবাহা’ হলো ব্যক্তি মালিকানামুক্ত সর্বজনের অবাধে ব্যবহারযোগ্য মালিকানায় শরিক হওয়া। এ অংশীদারিত্বকে সাধারণত রাষ্ট্রীয় আইনের আলোকে সর্বজনীন মালিকানা বা আন্তর্জাতিক মালিকানা বলা হয়।

শিরকাতে ইবাহার প্রমাণে কোরআন : ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য ভূম-লের যাবতীয় বস্তু।’ (সূরা বাকারা : ২৯)। ‘আসমান-জমিনের যাবতীয় বস্তু তিনি তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন।’ (সূরা জাসিয়াহ : ১৩)। ‘তোমাদের এবং মুসাফিরদের জন্য সাগরে শিকার ধরা এবং তা ভক্ষণ করা হালাল করা হয়েছে।’ (সূরা মায়েদা : ৯৬)।

শিরকাতে ইবাহার প্রমাণে হাদিস : ‘তিন জিনিসের মধ্যে সর্বজন শরিক থাকে পানি, ঘাস এবং আগুন।’

সর্বজনীন অংশীদারিত্ব বলতে এমন অবাধ বস্তুকে বোঝায়, যার ব্যবহার অধিকারে সর্বজন নির্বিশেষে শরিক থাকে। রাসুল (সা.) এগুলো সর্বজনের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এ ধরনের বস্তু যেমন
১. পানি, অর্থাৎ সাগর, নদনদী এবং খালবিলের পানি।
২. ঘাস, অর্থাৎ মালিকানামুক্ত জমির উদ্ভিদ, তৃণলতা ও গাছপালা।
৩. আগুন, অর্থাৎ মালিকানামুক্ত জ্বালানি কাঠ, যা জ্বালিয়ে আলো এবং খাবার রান্নার ব্যবস্থা করা হয়।
৪. খনিজ সম্পদ, অর্থাৎ এমন খনিজ, যা কখনও নিঃশেষ হয় না এবং জমিন থেকে নির্গত হয়।
৫. সর্বজনীন ব্যবহারিক বস্তু। যেমন মহাসড়ক, সড়ক, মসজিদ, মুসাফিরখানা, মাঠ-ময়দান এবং উদ্যান ইত্যাদি।

পরিভাষাগত শিরকাতের আরও দুইটি ধরন হলো শিরকাতে মিলক এবং শিরকাতে আকদ। শিরকাতে মিলক আবার দুই ধরনের। যথা:
১. শিরকাতে মিলক ইখতিয়ারি তথা ইচ্ছাধীন মালিকানায় অংশীদারিত্ব।
২. শিরকাতে মিলক গাইরে ইখতিয়ারি তথা অনিচ্ছাধীন মালিকানায় অংশীদারিত্ব।

এমনিভাবে শিরকাতে আকদ তথা চুক্তিবদ্ধ অংশীদারিত্বও দুই ধরনের। যথা ১. শিরকাতে মুফাওয়াজা। ২. শিরকাতে ইনান। আবার শিরকাতে মুফাওয়াজা এবং শিরকাতে ইনান প্রত্যেকটি তিন ধরনের:
১. শিরকাতে আমাল, যাকে ‘শিরকাতে আবদান’ বা তাকাব্বুল কিংবা ছানায়ি বলা হয়।
২. শিরকাতে উজুহ, যা মালেকি মাজহাবে ‘শিরকাতুজ জিমাম’ বলা হয়।
৩. শিরকাতে আমওয়াল।

 
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া বায়তুল আমান, মোহাম্মদপুর

কোন মন্তব্য নেই