পরকালীন প্রস্তুতি

কুর'আন-সুন্নাহর আলোকে পরকালীন মুক্তির আশায় একটি পরকালমুখী উদ্যোগ

স্বাধীনতার স্বাদ



তিথি ছোটোবেলা থেকেই নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার নিয়ে সেইরকম সচেতন। হবেই না বা কেন? পরিবারে বাবা-মা, বড় ভাই সবাইকে সে এমনভাবেই ভাবতে দেখে এসেছে আশৈশব। তিরিশ পেরোলো তিথির, এখনও বিয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখায় না। ভার্সিটি পড়া পর্যন্ত মেয়ের এই অ্যাটিচ্যুডটা বাবা-মা দুজনকেই খুব স্বস্তি দিতো, তবে সম্প্রতি তারাও কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। এবার তো মেয়ের বিয়েশাদি করে একটু থিতু হওয়া দরকার, সারাজীবন কি মেয়ে অবিবাহিত ভাবেই কাটিয়ে দিতে চায় কিনা সে চিন্তাটা ইদানিং তাদেরকে বেশ ভাবাচ্ছে।


দুই-তিন বছর যাবৎ অনেক পাত্র দেখে, অনেক পাত্রকে রিজেক্ট করে, অনেক পাত্রের থেকে চুলচেরা ইন্টারভিউ নিয়ে শেষমেশ একজনকে তাদের বেশ মনে ধরলো। ছেলে ভালো চাকুরিজীবি, অনেক টাকা বেতন। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, ফ্যামিলি স্ট্যাটাস সবই তিথিদের সাথে মানিয়ে যায়।


বাবা-মায়ের পীড়াপীড়িতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিথি ছেলের সাথে কথা বলতে রাজি হলো। কথা বলা মানেই তো আর বিয়ে করা নয়, মনে মনে ভাবলো তিথি, ও একজন স্বাধীন মানুষ। সিদ্ধান্ত আর মতামত নেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে ওর।


নির্ধারিত দিনে রেস্টুরেন্টের কোণার টেবিলে বসে থাকা শাহেদকে দেখতে পেলো তিথি। ছেলেটা দেখতে মোটেও সুদর্শন না, সে যদিও চামড়ার সৌন্দর্য্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার মতো মেয়ে না। কিন্তু কথা বলতে বলতেই তিথি বুঝতে পারলো সে শাহেদকে পছন্দ করে ফেলেছে। এমন স্পষ্টবাদী আর স্বাধীনচেতা একজনকেই সে মনে মনে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করতে পারে। তবে এমন কোনো পুরুষ বাংলার মাটিতে জন্মেছে বলে তিথির কখনও বিশ্বাস হতো না। শাহেদকে পেয়ে তার এতদিনের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।


পাত্র-পাত্রী এবং তাদের দুই পরিবারের সবাই খুশি। ফলে দেখাদেখিটা বিয়ে পর্যন্ত গড়াতে সময় লাগলো না। কিন্তু প্রত্যেক গল্পেই একটা ক্লাইম্যাক্স থাকে। কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের ভালো দেখলে সহ্য করতে পারে না। ছেলেপক্ষ থেকে একদিন হুট করেই এমন এক আত্মীয় কাজের সুবাদে তিথির বাবার অফিসে উদয় হলো। তথাকথিত সেই শুভাকাঙ্ক্ষী কথায় কথায় এ কথাটা জানিয়ে গেলো যে, শাহেদরা আসলে বউয়ের নামে বাসা দেখাশোনার লোক খুঁজছে। শাহেদের একমাত্র বোন থাকে বিদেশে। বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে, তাদেরকে দেখাশোনা লোক নেই। তাই বউকে তারা কোনোভাবেই বাইরে চাকরি-বাকরি করতে দিতে ইচ্ছুক নন। ঘরের বউ ঘরেই থাকুক, এটাই তাদের চাওয়া।


কথাটা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই তিথির বাবার মাথায় রক্ত চড়ে গেলো। ভদ্রতার খাতিরে পাত্রপক্ষের আত্মীয়ের সামনে চুপ করে রইলেন ঠিকই, কিন্তু বাসায় এসে হুঙ্কার দিতে লাগলেন যে এমন কারো কাছে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে তিনি মোটেও ইচ্ছুক নন। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, এখন মেয়ে বিয়ের জন্য ক্যারিয়ার ছেড়ে দেবে, এটা মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু তিথি সব শুনেও চুপ।


অদ্ভুত! দুই দিনের মধ্যে এমন কী প্রেম হয়ে গেলো যে এ ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে? চিন্তাটা প্রত্যেকের মাথাতেই এলো বটে। কিন্তু তিথিদের বাসায় সবাই-ই স্বাধীন চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী। তিথি যদি শাহেদকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে অন্য কেউ বাধা দেয়ার কেউ না। তিথি অবশ্য বোকা মেয়ে না। ও জানে এমন কিছু ছোটোলোক পৃথিবীতে আছে, মানুষের খুশি দেখলে যাদের পেটের ভাত হজম হয় না। তাই সে শাহেদের সাথে সরাসরি কথা বলে সবকিছু খোলাসা করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।


শাহেদ তিথির মুখে এ কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলো! “আরে বাবা! বিয়ের পর তুমি কি আমার চাকর হয়ে যাবে নাকি? তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, বিয়ের পর তুমি কী করতে চাও সে সিদ্ধান্ত নেয়ার। এ ব্যাপারে আমি বলার কে? আর আমার বাবা-মায়ের দেখাশোনার ব্যাপারটা নিয়ে তুমি মোটেও চিন্তিত হয়ো না। উনারা দুজনেই এখনও যথেষ্ট অ্যাক্টিভ। আর পরের ব্যাপার পরে দেখা যাবে। তবে এটুকু নিশ্চিন্ত থাকো, তুমি একজন স্বাধীন মানুষ, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেয়ার কেউ না! স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের উপর নিজের মত চাপিয়ে দিক, এ ব্যাপারটা আমি ঘৃণা করি। বিয়ে মানে তো নিজের স্বাধীনতাকে বন্ধক রাখা নয়!”


শাহেদের পরিষ্কার চিন্তা আর খোলামেলা কথা শুনে তিথি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো। যথাসময়ে দুজনের বিয়ে হয়ে গেলো। এত খুশি তিথি আর জীবনে কখনও হয় নি। শাহেদের মতো মানুষ হয় না। তিথি তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে চলে, ঠিক যেমনটা সে বিয়ের আগেও চলতো। মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যাওয়ায় তিথি এখন পুরোদমে নিজের চাকরি আর ক্যারিয়ারে মনোনিবেশ করলো। শাহেদের এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র অভিযোগ বা ইন্টারফেয়ারেন্স নেই। তিথিও কখনও শাহেদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে, বা শাহেদ তার সুপিরিওর, এমনটা অনুভব করে না। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই দুটি স্বাধীন ব্যক্তির মতো নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেয়।


ভালোই চলছিল জীবন ফুরফুরে বাতাসের মতো স্বাধীন। কিন্তু তিথিকে কিছু না জানিয়ে একদিন হুট করেই শাহেদ তার এতদিনের চাকরিটা ছেড়ে দিলো। কী ভেবে এত বড় কাজটা করলো শাহেদ? ও কি জানেনা মাস শেষে বাসার ভাড়া, গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, পানির বিল, বুয়ার বেতন, ড্রাইভারের বেতন, এসবের জন্য কত টাকা লাগে? এত টাকা কোথা থেকে আসবে? তিথি আপনমনে ভাবলো, শাহেদ কি তবে আমার টাকার উপর চলার চিন্তা করছে?


শাহেদকে বেলা বারোটার সময় আর্মচেয়ারে আরাম করতে দেখে রাগে তিথির পিত্তি জ্বলে গেলো। এই সময় ওদের দুজনেরই অফিসে থাকার কথা ছিল। আজ যদিও তিথির ছুটি চলছে। কিন্তু সে হুটহাট রাগ দেখানোর মতো বোকা মেয়ে না। সংযত স্বরে বললো, “আড়াই লাখ টাকার চাকরিটা এভাবে হুট করে ছেড়ে দিলে কেন? কোনো বেটার অফার পেয়েছ বুঝি? কবে জয়েন করছ নেক্সট? নাকি কোনো ব্যবসায় নামছো?”


শাহেদ তিথিকে অবাক করে দিয়ে বললো, “আমি ঠিক করেছি আর চাকরি বা ব্যবসা কোনোটাই করবো না। তোমার চাকরি করার প্রসঙ্গে আমি কখনও মাথা গলাই নি। তাই আমার চাকরি নিয়েও তুমি নাক গলাবে না প্লিজ। একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে এটুকু সিদ্ধান্ত আমার নিজের নেয়ার অধিকার আছে আশা করি।”


তিথি পুরাই মখা হয়ে গেলো। রাগে ওর মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছে। ও আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বললো, “তাহলে তোমার সংসারের ঘানি চালাবেটা কে শুনি?”


শাহেদ বললো, “কেন? তুমি চালাবে। আমি এতদিন ধরে আমার উপার্জন সংসারের জন্য ব্যয় করতে পারলে, তোমার টাকা কেন শুধু তোমারই টাকা হবে?”


তিথি রাগে গজগজ করতে করতে বললো, “তাহলে তুমি সারাদিন বাসায় বসে কী করবে?”


শাহেদ সোজা কথার মানুষ, সে নিজেকে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলো। “এতদিন সংসারের ঘানি টানতে টানতে আমি হাপিয়ে উঠেছি। প্রতিটা মানুষের জন্য কিছু নিজস্ব সময় দরকার, ইউ নো, “মী-টাইম” দরকার। আমারও একটু “স্পেইস” প্রয়োজন। আমি ভেবেছি, আমি নিজেকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখবো। নিজের শখের কাজগুলো করব, যখন ইচ্ছে শপিং এ যাব। পাশের বাসার (V̶a̶b̶i̶ থুক্কু) ভাইয়ের সাথে গল্প করবো। আমার জীবন নিয়ে যা ইচ্ছে সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চয়ই আমার আছে। নাকি তুমি চাও, আমি আমার জন্মসূত্রে পাওয়া স্বাধীনতাকে তোমার কাছে বন্ধক রেখে তোমার কথা মেনে চলি? আমার চাকরি ছাড়ার জন্য কি আমাকে তোমার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে?”


তিথির মনে পড়ে গেলো বিয়ের আগের কথা। ও নিজেই যখন বলতো, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই স্বাধীন দুটি মানুষ। বিয়ে মানে একটা পার্টনারশিপ যেখানে দুজন পার্টনার কেউ কারো উপর সুপিরিয়র না। কেউ কিছু করার জন্য অপর পক্ষের অনুমতির প্রয়োজন নেই। এখন সে আর জবাব খুঁজে পেলো না।


[তিন মাস পর]

তিথি এখন ভোর ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বাইরে কাজ করে। আজকাল তিথির ওপর খুব ধকল যায়। সারাদিন ধরে অফিসে বসের প্রেসার, রাস্তায় যানজট, ধুলোবালি, প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া আর অস্বাভাবিক কাজের চাপে ওর শরীর একদম ভেঙে পড়েছে। রাতে ফিরে শাহেদের হাতে রিমোট-কন্ট্রোল দেখে ওর মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেলো। আড়চোখে দেখতে পেলো, শাহেদ মনোযোগ দিয়ে একটা ইংলিশ মুভি দেখছে। সারাদিন খেটেখুটে ক্লান্ত হয়ে এসে শাহেদকে পা-দুলিয়ে মুভি দেখতে দেখে তিথি তার এতদিনকার আদর্শ ভুলে গিয়ে হুজুর-নারীদের মতো চেচিয়ে উঠে বলতে যাচ্ছিল, স্ত্রীর ভরণপোষণ করা স্বামীর দায়িত্ব!


কিন্তু বহু কষ্টে নিজের রাগটা গিলে নিলো তিথি। বোকা মেয়েদের মতো করে ভাবার কারণে ভেতরে ভেতরে কিছুটা লজ্জিত বোধ করলো। আর সিদ্ধান্ত নিলো, রাগ উঠলেও শাহেদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাটা ঠিক হবে না। নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই স্বাধীন নাগরিক, তার নিজের যা ইচ্ছে করবে।


এখন তিথি নিজেই নিজেকে দিনের মধ্যে একশবার বোঝায়, মানুষ হিসেবে শাহেদের অটোম্যাটিক একটা স্বাধীনতা আছে, সে যা খুশি তাই করবে। কিন্তু তবুও তিথি মনে মনে খুশি হতে পারে না। রাতদিন খাটুনির পর বিছানায় পিঠ ঠেকালে স্বাধীনতার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে ইচ্ছা করে। আর ওদিকে শাহেদ প্রতিদিন বেলা দশটায় ঘুম থেকে উঠে আরামসে মী-টাইম কাটায়, ধোঁয়াওঠা ক্যাপাচিনো টি আর এসপ্রেসো কফির ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড দিয়ে নিচে আধ্যাত্মিক ক্যাপশন লেখে, কফি চায়ের চেয়ে সুপিরিয়র না, চা-ও কফির চেয়ে সুপিরিয়র না। চা ও কফি হলো নারী ও পুরুষের মতো।

আফটার অল, দুজনেই সমানে সমান।


Writer: Anika Tuba

কোন মন্তব্য নেই