Ticker

6/recent/ticker-posts

Advertisement

স্বামী ও স্ত্রী একসাথে জান্নাতে থাকা সম্পর্কিত তিনটি প্রশ্নের উত্তর



প্রশ্নঃ১. দুনিয়ার জীবনে যারা স্বামী স্ত্রী, তারা কী আখিরাতেও স্বামী স্ত্রী হিসেবেই জান্নাতে যাবে?


উত্তরঃ প্রথমতঃ ইসলামী শরী’আহ অনুযায়ী স্বামী কিংবা স্ত্রীর যে কোন একজনের মৃত্যু দ্বারা উভয়ের মাঝের বাহ্যিক বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। এ কারণেই একজন নারী স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত পালন শেষে অন্যত্রে বিবাহের সম্পর্কে জড়াতে পারেন। পাশাপাশি চার স্ত্রী রাখা পুরুষের জন্যও একজন স্ত্রীর ইনতিকালের পর চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে অন্য কাউকে বিয়ে করার সুযোগ থাকে। চার স্ত্রীর কম হলে তো কথাই নেই।


দ্বিতীয়তঃ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়, তার জুড়ি মেলা ভার। অনেক ক্ষেত্রেই একজনের মৃত্যুতে অন্যজন এতটাই আবেগতাড়িত হয়ে পরেন যে, দ্বিতীয় বিয়েতে আর আগ্রহী হন না। পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এমন নারী ও পুরুষগণ আখিরাতেও তার প্রাণপ্রিয় স্বামী কিংবা স্ত্রীর সান্নিধ্য কামনা করে থাকেন। এখন দেখার বিষয় হল কুরআন, হাদিস ও আছারে এ ধরনের কোন সুযোগ রয়েছে কিনা। এমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় কিনা?


এক. এই আলোচনায় যাওয়ার আগে নিজেকে জান্নাতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। স্বামী ও স্ত্রী যদি এই সংকল্পে নিজেদের ঈমান ও আমলকে নিখাদ রাখে তবে তা সম্ভব হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,


“وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلا يُظْلَمُونَ نَقِيراً”


পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে যারা আমল করে আর তারা ঈমানদারও হয়, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তারা খেজুর দানার কণা পরিমাণও অত্যাচারিত হবেনা। (সুরা নিসা ৪:১২৪)

অন্যত্রে আল্লাহ তাআলা বলেন,


مَنْ عَمِلَ صَالِحاً مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ


যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব। (সুরা নাহল ১৬:৯৭)


দুই. স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে না করলে স্বামীর সাথে জান্নাতে যাবে ইনশা আল্লাহ


عَنْ عِكْرِمَةَ أَنَّ أَسْمَاءَ بِنْتَ أَبِي بَكْرٍ كَانَتْ تَحْتَ الزُّبَيْرِ بْنِ الْعَوَّامِ. وَكَانَ شَدِيدًا عَلَيْهَا فَأَتَتْ أَبَاهَا فَشَكَتْ ذَلِكَ إِلَيْهِ فَقَالَ: يَا بُنَيَّةُ اصْبِرِي فَإِنَّ الْمَرْأَةَ إِذَا كَانَ لَهَا زَوْجٌ صَالِحٌ ثُمَّ مَاتَ عَنْهَا فَلَمْ تَزَوَّجْ بَعْدَهُ جُمِعَ بَيْنَهُمَا فِي الْجَنَّةِ


ইকরামা রহ. বলেন, আসমা বিনতে আবু বকর রা. ছিলেন জুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. এর স্ত্রী। তিনি স্ত্রীর প্রতি কিছুটা কঠোর ছিলেন। আসমা রা. একবার পিতা আবু বকর রা. এর নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ জানালেন। আবু বকর রা. বললেন, বেটি! একটু ধৈর্য ধর। কোন মেয়ে যদি নেককার স্বামী পায়, আর তার মৃত্যুর পর অন্যত্রে বিয়ে না বসে; তাহলে আল্লাহ তাআলা উভয়কে জান্নাতে একত্রিত করবেন। (তবাকাতু ইবনু সা’আদ,৮/১৯৭। আসমা রা. এর আলোচনা। সিলসিলাতুস সহিহাহ, ১২৮১)


عَنْ حُذَيْفَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ لِامْرَأَتِهِ: إِنْ شِئْتِ أَنْ تَكُونِي زَوْجَتِي فِي الْجَنَّةِ، فَلَا تَزَوَّجِي بَعْدِي، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ فِي الْجَنَّةِ لِآخِرِ أَزْوَاجِهَا فِي الدُّنْيَا، فَلِذَلِكَ " حَرَّمَ اللهُ عَلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُنْكَحْنَ بَعْدَهُ؛ لِأَنَّهُنَّ أَزْوَاجُهُ فِي الْجَنَّةِ


হুযাইফা রা. হতে বর্ণিত, তিনি তার স্ত্রীকে বলেন, তুমি যদি আমার সাথে জান্নাতে থাকতে চাও তাহলে আমার পরে কাউকে বিয়ে করো না। কেননা নারী দুনিয়াতে সর্বশেষ যার সাথে সংসার করবে, জান্নাতে তার সাথেই থাকবে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা রাসুল সা. এর ওফাতের পর তাঁর সম্মানীতা স্ত্রীগণের জন্য অন্যত্রে বিবাহ হারাম করেছেন। কারণ তারা জান্নাতেও রাসুল সা. এর সাথেই থাকবেন। (সুনানুল কুবরা বাইহাকী, ১৩৪২১। সনদ হাসান গরীব)


তিন. একাধিক স্বামী গ্রহণ করলে এবং উভয়ে নেককার হলে শেষ জনের সাথে জান্নাত হবে।


عَنْ عَطِيَّةَ بْنِ قَيْسٍ الْكِلَابِيِّ قَالَ: خَطَبَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ أُمَّ الدَّرْدَاءِ بَعْدَ وَفَاةِ أَبِي الدَّرْدَاءِ، فَقَالَتْ أُمُّ الدَّرْدَاءِ: إِنِّي سَمِعْتُ أَبَا الدَّرْدَاءِ يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «§أَيُّمَا امْرَأَةٍ تُوُفِّيَ عَنْهَا زَوْجُهَا، فَتَزَوَّجَتْ بَعْدَهُ فَهِيَ لِآخِرِ أَزْوَاجِهَا» وَمَا كُنْتُ لِأَخْتَارَكَ عَلَى أَبِي الدَّرْدَاءِ فَكَتَبَ إِلَيْهَا مُعَاوِيَةُ: فَعَلَيْكِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ مَحْسَمَةٌ


আতিয়্যাহ বিন কায়িস কিলাবী রহ. বলেন, আবু দারদা রাঃ এর ইনতিকালের পর আমীরুল মু’মিনীন মু’আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রা. তার বিধবা স্ত্রী উম্মু দারদা রহ. এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। জবাবে উম্মু দারদা রহ. বলেন, আমি আবু দারদা রা. এর কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসুল সা. কে বলতে শুনেছি যে, “যে মহিলা তার স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যত্র বিয়ে করেন, তিনি তার সর্বশেষ স্বামীর অধিকারে চলে যান (দুনিয়া ও আখিরাতে)।” অতএব আপনাকে আমি আবু দারদার ওপর প্রাধান্য দিতে পারব না। তার এ উত্তর শুনে মু’আবিয়া রা. লিখে পাঠান, আপনি তাহলে বেশি বেশি রোজা রাখুন। কারণ রোজা জৈবিক চাহিদা হ্রাস করে।

(তাবরানী মু’জামুল আওসাত, ৩১৩০। সিলসিলাতুস সহিহাহ, ১২৮১। সনদ হাসান।)


চার. একাধিক স্বামী গ্রহণ করলে উত্তমজনের সাথে জান্নাতে যাবেন।


عَنْ أَنَسٍ : أَنَّ أُمَّ حَبِيْبَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَتْ : يَا رَسُولَ اللهِ ، اَلْمَرْأَةُ يَكُونُ لَهَا الزَّوْجَانِ فِي الدُّنْيَا ، ثُمَّ يَمُوتُونَ وَيَجْتَمِعُونَ فِي الْجَنَّةِ ، لِأَيِّهِمَا تَكُونُ ؟ لِلْأَوَّلِ أَوْ لِلْآخِرِ ؟ قَالَ : لِأَحْسَنِهِمَا خُلُقًا كَانَ مَعَهَا يَا أُمَّ حَبِيْبَةَ ، ذَهَبَ حُسْنُ الْخُلُقِ بِخَيْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সা. এর সম্মানীতা স্ত্রী আম্মাজান উম্মু হাবীবাহ রা. বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা.! দুনিয়াতে একজন নারীর দু’ জন স্বামী ছিল। মৃত্যুর পর যখন তারা একত্রিত হবে তখন উক্ত নারী কার সাথে জান্নাতে যাবে? প্রথমজনের সাথে নাকি দ্বিতীয়জনের সাথে?

রাসুল সা. বললেন, উম্মু হাবীবাহ! তার মধ্যে যার চরিত্র উত্তম হবে তার সাথে মহিলাটি জান্নাতে থাকবে। উত্তম চরিত্রের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ রয়েছে। (তারীখু দামিশক, ৫/৩৭১। তাযকিরাতু আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ, ৯৯৩। সনদ খুবই দুর্বল।)


পাঁচ. একাধিক স্বামী থাকলে যে কাউকে বেছে নেয়ার ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে।


عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، الْمَرْأَةُ مِنَّا تَتَزَوَّجُ الزَّوْجَيْنِ وَالثَّلَاثَةَ وَالْأَرْبَعَةَ، ثُمَّ تَمُوتُ فَتَدْخُلُ الْجَنَّةَ وَيَدْخُلُونَ مَعَهَا، مَنْ يَكُونُ زَوْجَهَا مِنْهُمْ؟ فَقَالَ: يَا أُمَّ سَلَمَةَ، إِنَّهَا تُخَيَّرُ، فَتَخْتَارُ أَحْسَنَهُمْ خُلُقًا، فَتَقُولُ: أَيْ رَبِّ، إِنَّ هَذَا كَانَ أَحْسَنَهُمْ مَعِي خُلُقًا فِي دَارِ الدُّنْيَا فَزَوِّجْنِيهِ، يَا أُمَّ سَلَمَةَ ذَهَبَ حُسْنُ الْخَلْقِ بِخَيْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ


রাসুল সা. এর সম্মানীতা স্ত্রী আম্মাজান উম্মু সালামা রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা.! দুনিয়াতে একজন মহিলার দুই, তিন বা চারবারও বিয়ে হয়ে থাকে। মৃত্যুর পর এই নারী যখন জান্নাতে যাবে তখন সেসব পুরুষও জান্নাতে যাবে। এমতাবস্থায় তাদের মধ্যে এই মহিলার স্বামী কে হবে?

রাসুল সা. বললেন, হে উম্মু সালামাহ! উক্ত নারীকে ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে। সে তাদের মধ্য হতে উত্তম চরিত্রের অধিকারীকে বেছে নিয়ে বলবে, ইয়া রব! এদের মধ্যে এই লোকটি দুনিয়াতে আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেছে। আজ তার সাথে আমার বিয়ে করিয়ে দীন। উম্মু সালামাহ! উত্তম চরিত্রের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

(তাবরানী মু’জামুল আওসাত, ৩১৪১। সনদ দুর্বল। তবে আগের বর্ণনার চেয়ে উত্তম।)


উপরের আলোচনা পর্যালোচনা করলে একাধিক স্বামী গ্রহণ করলে আখিরাতে উত্তমজনের সাথে থাকবে বলেই প্রতীয়মান হয়।


এখন আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে জান্নাতে পেতে চান তাহলে ঈমান ও আমলের পর সবচেয়ে জরুরি যেটা তা হল, আপনাকে আপনার স্ত্রীর কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হয়ে থাকতে হবে। অতএব দায়টা পুরুষের। নারীর নয়।


প্রশ্নঃ-২. একজন পুরুষের যদি একাধিক স্ত্রী থাকে, তাহলে তারা সবাই কি স্বামীর সাথে জান্নাতে থাকবে?

উত্তরঃ সকলেই জান্নাতি হলে এক সাথে থাকার সুযোগ রয়েছে।

জান্নাতিদের নিআমাত বর্ণনা করতে গিয়ে এক হাদিসে রাসুল সা. বলেছেন,


وَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ


আর তাদের প্রত্যেকেরই দু' জন করে স্ত্রী থাকবে।

(সহিহ বুখারি, ৩২৪৫)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার আসকালনী ও ইমাম কাসতালানী রহ. বলেন, এই দুই স্ত্রী হবে দুনিয়ার স্ত্রী। আর দুই হল সর্বনিম্ন। এর বেশি স্ত্রী হলেও এক সাথে জান্নাতে থাকার সুযোগ রয়েছে। ইনশাআল্লাহ।

(ফাতহুল বারী, ৬/৩২৫। ইরশাদুস সারী, ৫/২৮২)


৩. দুনিয়াতে যাদের বিয়ে হয়নি বা বিয়ের পর তালাক হয়েছে আর তালাকের পর পুনরায় বিয়ে করেননি তাদের কী হবে?

উত্তরঃ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য উপযুক্ত পাত্র পাত্রী নির্বাচন করে বিয়ের ব্যবস্থা করবেন ইনশাআল্লাহ।

এক হাদিসে রাসুল সা. বলেছেন,


مَا فِي الْجَنَّةِ أَعْزَبُ


জান্নাতে কেউ অবিবাহিত থাকবে না।

(সহিহ মুসলিম, ২৮৩৪)


সঠিক বিষয়ে আল্লাহই ভালো জানেন।


উত্তর দিয়েছেন: মুহাতারাম আহমাদ ইউসুফ শরীফ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ