নবীজি কি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন?



ক) অনেকে দাবী করেন, নবীজি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তারা সহিহ বুখারীতে বর্ণিত ইবনে শিহাব যুহরীর বক্তব্য পেশ করেন। আমরা এই লেখায় উল্লেখিত দাবীর সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করবো।


খ) সহিহ বুখারীর ছয় হাজার নয়শো বিরাশিতম হাদিসে বর্ণিত, ইবনে শিহাব যুহরী উরওয়ার সূত্রে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন,


রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওহির শুরু হয় ঘুমের ঘোরে ভালো স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা ভোরের আলোর মত উদ্ভাসিত হতো। ... কিছু দিনের জন্য ওহি বন্ধ থাকে। নবীজি এ সময় অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন।


... ইমাম যুহরী বলেন, আমরা শুনেছি, তিনি পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছিলেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিব্রীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ, নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর অস্থিরতা দূর হত, নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওহি বন্ধ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তিনি একই উদ্দেশ্যে দ্রুত পাহাড়ের চুড়ায় চলে যেতেন। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছলে জিব্রীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে সান্ত্বনা দিতেন।


গ) একটু মনোযোগ দিলেই বুঝা যাবে, এটি নবীজি বা কোন সাহাবির বক্তব্য নয়, ইবনে শিহাব যুহরীর কথা। যদিও সহিহ বুখারীতে প্রধানত নবীজি-সাহাবিদের বক্তব্যই বেশি এসেছে, তবে কখনো কখনো সম্পূরক মন্তব্য হিসেবে পরবর্তী আলেমদের কথাও বিবৃত হয়েছে। পরবর্তী আলেমদের সম্পূরক ব্যাখ্যা নবীজি-সাহাবিদের কথার সমমর্যাদাভুক্ত নয়। তাদের ব্যাখ্যা কুরআন-হাদিসের আলোকেই গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে।


ঘ) ইসলামে আত্মহত্যা মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না। (সৃরা বাকারা, ১৯৫) তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। (সূরা নিসা, ২৯) তোমরা কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না। ( সূরা বনী ইসরাইল, ৩৩)


দুনিয়াতে কেউ আত্মহত্যা করলে সে যেভাবে নিজেকে হত্যা করেছে, কেয়ামতের দিন সেভাবেই তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারী, ৫৭০০) নিজেকে পাহাড় থেকে ফেলে আত্মহত্যা করলে সে দীর্ঘকালীন জাহান্নামে যাবে, নিজেকে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যা করতে থাকবে। (সহিহ বুখারী, ৫৭৭৮)


এসব আয়াত-হাদিসের প্রেক্ষিতে অধিকাংশ আলেম যুহরীর বক্তব্য গ্রহণ করেনননি। ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবেও যুহরীর বক্তব্য শক্তিশালী নয়, কেননা তিনি এটি কার থেকে কবে ও কীভাবে শুনেছেন, সেটি স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি ব্যাখ্যা হিসেবেও এটি ইসলামের মৌলিক অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক। ইমাম কিরমানিসহ অধিকাংশ আলেমরা একে অনির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য বলে আখ্যা দিয়েছেন, আগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন।


ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি লেখেন, 'আমাদের কাছে পৌছেছে/আমরা শুনেছি' থেকে পরবর্তী অংশটুকু ইবনে শিহাব যুহরীর কথা। এটি আয়েশা (রাঃ) এর কথা নয়, তথ্যটি ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য নয়। (ফাতহুল বারী, খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩৫৯ )


মোটকথা ক) ঐতিহাসিক স্বচ্ছতা-নির্ভরযোগ্যতার অভাবে, খ) ইসলামি মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হবার প্রেক্ষিতে যুহরীর কথাটি গ্রহণ করার সুযোগ নেই।


ঙ) আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে নবীরা গুনাহ-অপরাধ থেকে পবিত্র। এই পবিত্রতা নবুওয়তের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। নবীরা আল্লাহর প্রতিনিধি, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, নবীরাই আল্লাহর হেদায়েতের ওপর আছেন, তাদের হেদায়াতের আলোকে পথ চলুন। (সূরা আনআম, ৯০) যদি নবীরা গুনাহ-অপরাধে লিপ্ত হন, তবে তাদের গুনাহ-অপরাধগুলো আদর্শ হিসেবে পরিচিতি পাবে। জনগণ ভুলকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে। এই জটিলতার প্রেক্ষিতে নবীদের পবিত্রতাকে ( ইসমতুল আম্বিয়া) জরুরি বলে আখ্যা দেওয়া হয়।


ইমাম কিরমানি, কাজী ইয়াজ ও ইমাম নববী বলেন, 'নবীরা সকল প্রকারের ত্রুটি-দোষ থেকে মুক্ত।' ( শরহু মুসলিম, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ১২৭) ( আল কাওকাবুদ দারারী, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪১) ইমাম সানুসি বলেন, যেহেতু আল্লাহ তাআলা নবীদের অনুসরণ করতে বলেছেন, তাই এটিই অকাট্য প্রমাণ যে নবীরা কথা-কাজ-বাহ্যিক-গোপন সকল প্রকারের দোষ-ত্রুটি-অপরাধ থেকে পবিত্র। এ বিষয়ে হাক্কানি আলেমদের ঐক্যমত রয়েছে। (শরহুল মুকাদ্দামাত, ২৮১)


চ) নবীজি মানুষ ছিলেন। নবীজির মধ্যে খোদায়ী বৈশিষ্ট্য খোঁজা গর্হিত বিষয়। একইভাবে নবীজির ওপর দোষী-অপরাধীদের বৈশিষ্ট্য আরোপ করাও অশোভনীয় কাজ। নবীজি মানুষ ছিলেন, নবুওয়তের দায়িত্ব পালনে সদা তৎপর ছিলেন, ওহি না আসলে তার মধ্যে অস্থিরতা জাগবে, এটি খুবই স্বাভাবিক। কেন সবাই মুসলমান হচ্ছে না, এ নিয়েও নবীজি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা করতেন।


হয়তো ওহি আগমনের প্রত্যাশায় নবীজি বারবার পাহাড়ের চূড়ায় যেতেন, কেউ এই বিষয়টি দূর থেকে দেখে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে মনে করেছে। পরবর্তীতে লোককথার অংশ হিসেবে যুহরীর মুখে উঠে এসেছে। অথবা অস্থিরতার অতিশয়োক্তি হিসেবে আত্মহতার কথা বলা হয়েছে, আরবিতে অতিশয়োক্তি বুঝাতে কখনো কখনো এমন ব্যবহার দেখা যায়—যেমন মেসওয়াকের গুরুত্ব বুঝাতে বলা হয়েছে, রাসূল এমনভাবে মেসওয়াক করতেন যেন তিনি তার মাড়ি ছিলে ফেলবেন।। পুরো ঘটনাকে অতিশয়োক্তি হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়। কেননা আত্মঘাতী চিন্তার বর্ণনাটি ঐতিহাসিকভাবে কোন সাহাবি বা বয়োজ্যেষ্ঠ তাবেয়ীর মাধ্যমে প্রমাণিত নয়।


ছ) অনেকে মনে করেন, গোনাহের কাজ করলেই কেবল গুনাহ, মনে গুনাহের কথা আসলে বিশেষ অসুবিধা নেই। তাদের এই কথাটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বিষয়। নবীজি বলেছেন, মনে কোন খারাপ কথা আসলে বলা বা আমল করার আগ পর্যন্ত আল্লাহ এতে পাকড়াও করবেন না। (সহিহ বুখারী, ৫২৬৯)


ইমাম নববী বলেন, মনে যেসব কথা আসতে থাকে সেগুলো স্থায়ী না হলে এতে গোনাহের কিছু নেই। কেননা মনে আসতে থাকা কথা ঠেকানো অসম্ভব। তবে মনে কুচিন্তা আসলে ঠেকাতে হবে, ভাবতে থাকা যাবে না, কুচিন্তা প্রলম্বিত হতে দেওয়া যাবে না। প্রলম্বিত করা হারাম। (আল আজকার, ৫৩৫)


একই কথা আত্মঘাতী চিন্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মনে আত্মহত্যার কথা আসলে সাথেসাথে ভাবনা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রলম্বিত হতে দেওয়া যাবে না। স্বেচ্ছায় গুনাহের ভাবনা ভাবাও গুনাহের কাজ, প্রলম্বিত করা হারাম। কাজেই স্বেচ্ছায় আত্মহত্যার কথা ভাবার অনুমতি নেই।


© মাওলানা ইফতেখার জামিল

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন