স্বামী স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্ক ও পারস্পরিক বোঝাপড়া



কুরআনে মাজিদে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট আয়াত থেকে এমন তিনটা বিষয় প্রতীয়মান হয়, যেই তিনটি বিষয় হাজবেন্ড ও ওয়াইফের রিলেশনে থাকাটা জরুরি। এই তিনটি বিষয় ছাড়া তারা দাম্পত্য জীবনে একটি সুস্থ সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারবে না। বরং তাদের রিলেশন একটা বিষাক্ত সম্পর্কে রূপ নিবে।


তিনটি বিষয় হল:

১। মুহাব্বাত ও ভালবাসা

২। রহমত ও অনুগ্রহ

৩। পারস্পরিক বোঝাপড়া


সুরা রুমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তাঁর নিদর্শনের মধ্যে হল এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিণী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পার আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এর মাঝে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।" ( সুরা রুম, আয়াত ২১)


এই আয়াতের শেষের দিকে আল্লাহ তায়ালা স্বামী স্ত্রীর মাঝে দুটি বিষয় ঢেলে দেয়ার কথা বলেছেন। এরমধ্যে প্রথমটা হল, ভালবাসা। ভালবাসা ছাড়া কখনোই স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হতে পারে না। এবং এই ভালবাসাটা এমন পর্যায়ের হতে হবে, যেটা দুজনকে আয়াতে উল্লেখিত দ্বিতীয় বিষয়ের দিকে ধাবিত করবে। সেটা হল, দয়া, অনুগ্রহ, ইহসান। আরো সুস্পষ্ট করে বলে সেক্রিফাইস বা আত্মত্যাগ। ইহসান বা সেক্রিফাইসের মূল কথা হল, দুজনই কেবল তাদের দায়িত্বের হিসেবে আটকে থাকবে না। বরং দায়িত্বের সীমা পেরিয়ে দুজনেই দুজনের জন্য সেক্রিফাইসের কথা চিন্তা করবে, দুজনই একে অপরের প্রতি ইহসান করবে।


মানুষটার জন্য কতটুকু করলেই যথেষ্ট হবে- এই চিন্তার চেয়ে মানুষটার জন্য আমি কতটুকু করতে পারি- এই চিন্তাটাকে ফোকাসে রাখতে হবে। যেই পরিবারে একে অপরের দায়িত্বের সীমা নিয়ে ঝগড়া হয় বুঝতে হবে এই পরিবার আল্লাহপ্রদত্ত সেই ভালবাসার উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি, যেই ভালবাসা তাদেরকে ইহসান বা সেক্রিফাইসের দিকে নিয়ে যাবে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত পরিবারের ভিত্তি কেবল ন্যায়ের উপর নয়। বরং এর ভিত্তি আরো উর্ধ্বের বিষয় প্রেম-ভালবাসা এবং অনুগ্রহ-আত্মত্যাগের উপর।


মুহাব্বাত ও রহমত নিয়েও স্বামী স্ত্রীর অতিরিক্ত আরেকটি কর্তব্য আছে। সেটি হল, অপরের প্রতি ভালবাসাকে প্রকাশ করা এবং অপরের ভালবাসাটাকে ফীল করা। আবার অপরের ইহসান বা অনুগ্রহটাকে অনুভব করা এবং প্রকাশ্যে সেটার মূল্যায়ন করা। অপরের সেক্রিফাইসটাকে উৎযাপন করা। এটা করতে না পারলে ভালবাসাও কমতে থাকবে এবং ইহসানটাও বিরক্তিকর হয়ে উঠবে। সেটা আর মধুর অনুভূতিতে থাকবে না।


হাজবেন্ড ওয়াইফের রিলেশনে তৃতীয় উপাদানটি হল মিচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং তথা পারস্পরিক বোঝাপড়া। আল্লাহ তায়ালা বলছেন, তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরাও তাদের পোশাক। ( সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৭)


দুটি মানুষ একই পোশাকের আবরণে বা একই ছাদের নিচে বসবাস করা সত্ত্বেও যদি তাদের চিন্তাভাবনা ও বোঝাপড়া বিপরীতমুখী হয় তখন আসলে তারা একে অপরের পোশাক থাকে না। পশ্চিমা বোরকেন ফ্যামিলিগুলোতে বোঝাপড়ার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ তাদের কাছে পারিবারিক মিচুয়াল সম্পর্কের তেমন ভেল্যু নেই। যে যার ইচ্ছামত চলবে। কিন্তু মুসলিমদের ফ্যামিলিগুলো এমন বিচ্ছিন্ন নয়। তারা যে যার সুবিধামত চলবে না, বরং পরস্পরে মিলে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে চলবে। এখানে একগুয়েমির কোন স্থান নেই।

কুরআনের শাব্দিক অলংকার থেকেও এই উপাদানটি প্রমাণিত হয়। আরবীতে স্ত্রীকে বলা যায় জাওযাহ। যেসব স্থানে স্বামী স্ত্রীর মাঝে শারিরীক, চিন্তাগত ও আদর্শগত মিল আছে সেসব জায়গাতেই জাওযাহ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু যেসব জায়গায় শারিরীক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও চিন্তা ও আদর্শের মিল পাওয়া যায়নি সেখানে জাওযাহ এর পরিবর্তে ইমরাআতুন শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণ টেনে লেখা আর লম্বা করতে চাচ্ছি না। এখান থেকে বুঝা যায়, প্রকৃতপক্ষে নারীপুরুষ স্বামীস্ত্রী হতে হলে, তাদের ভিতর চিন্তাগত বোঝাপড়াটাও জরুরি। এই আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা বোঝাপড়া না থাকলে একটি সুস্থ সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না। বোঝাপড়ার গ্যাপের কারণে এখানে সম্পর্কেরও দূরত্ব তৈরি হতে থাকবে।


ফেমিনিজম হোক আর ব্রাহ্মণ্যবাদ হোক- দুটি চিন্তাই সরাসরি হাজবেন্ড ওয়াইফের সম্পর্কের শেষ দুটি উপাদানকে ক্ষতবিক্ষত করে। দুটি চিন্তা একে অপরের ইহসানকে মূল্যায়ন করে না। বরং দুজনকে দুই মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ইহসানের পথ থেকে সরিয়ে আমার অধিকার আর তোমার অধিকারের কার্ড ধরিয়ে দেয়। আর তখন তাদের মধ্য থেকে প্রথম উপাদান তথা ভালবাসাও বিলুপ্ত হতে থাকে। তারা হয়ে উঠে একে অপরের শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী। অথচ আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে।


লেখাঃ ইফতেখার সিফাত (আল্লাহ্‌ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন)

1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন