Ticker

6/recent/ticker-posts

Advertisement

দেনা-পাওনা


মহানবী ﷺ নামাযের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী ﷺ বললেন, “কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)।” (বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯ নং)

পক্ষান্তরে মিথ্যা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা কোন মুসলিমের গুণ নয়। এ গুণ হল এক মুনাফিকের। কিন্তু ঋণগ্রস্ত হয়ে মুসলিম কখনো বা মিথ্যা বলতে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে বাধ্য হয়। আর কখনো বা অভ্যাসগতভাবে ঋণ করে পরিশোধের ঝুটা ওয়াদা দিয়ে কার্যক্ষেত্রে তা পালন করে না।

ঋণ করার পর ঋণ পরিশোধে টাল-বাহানা করা অন্যায়। শোধ করার মত ক্ষমতা ও উপায় থাকতেও অনেকে তাতে ছেঁচড়ামো করে, চাইতে গেলে অনেকে রেগে ওঠে, অনেকে ব্যঙ্গ করে, অনেকে বলে, 'দেখ, কয়টা টাকা পাবে তো বারবার এসে ঘর খাল করে দেবে।' কেউ বলে, 'টাকাটা কি মেরে দেব নাকি, খেয়ে নেব নাকি?' অনেকে বলে, 'তুমি তো বড়লোক মানুষ। তোমার টাকা নেওয়ার এত তাগাদা কেন? তোমার তো ব্যাংকেই থাকবে। আর ব্যাংকের সূদও তো খাবে না? ব্যাংকে থাকা আর আমার কাছে থাকা সমান।' ইত্যাদি। এমন লোকেরা 'নেওয়ার সময় খুশিখুশি, দেওয়ার সময় কষাকষি' প্রদর্শন করে থাকে। নেওয়ার সময় সুচ হয়ে আসে, কিন্তু দেওয়ার সময় ফাল হয়ে যায়। নেওয়ার আগে বারবার সালাম দেয়, দাওয়াত খাওয়ায়, কিন্তু দেওয়ার সময় দূরে থেকে নমস্কার জানায়, অথবা সাক্ষাৎ হওয়ার ভয়ে দূর থেকে দেখেই অন্য পথ ধরে। অনেকে মিথ্যা বলে, 'ঘরে নেই, টাকা নেই' ইত্যাদি বলে এমন ছেঁচড় সাজে যে, পরিশেষে ঋণদাতাই পুনরায় তার নিকট থেকে নিজের প্রাপ্য চাইতে লজ্জাবোধ করে। অনেকে মিষ্টি মিষ্টি কথায় এমন সংকোচময় পরিবেশ সৃষ্টি করে যে, ঋণদাতা ঋণ দিয়ে হায়-পস্তানি করতে থাকে। কারো কাছে প্রকাশ করলেও এমন ছেঁচড়ের নাকি অপমান হয়। তখন 'উল্টে চোর গৃহস্থকে ডাঁটে।'

কিন্তু আমাদের মহানবী ﷺ বলেন, “ঋণ পরিশোধে সক্ষম ব্যক্তির টাল-বাহানা নিজের জন্য অপমান ও শাস্তিকে বৈধ করে নেয়।” (আবূ দাঊদ ৩৬২৮, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ৩৬২৭, ইবনে হিব্বান ১১৬৪, হাকেম ৪/১০২, বাইহাকী ৬/৫১, আহমাদ ৪/২২২, ইরওয়াউল গালীল ১৪৩৪ নং)

আব্দুল্লাহ বিন মুবারাক বলেন, অর্থাৎ তার প্রতি কঠোর বাক্য প্রয়োগ করে তাকে লজ্জিত করা এবং আইনের মাধ্যমে তাকে হাজতে দেওয়া বৈধ হয়ে যায়। (মিশকাত ২৯১৯ নং)

কিন্তু সে তখন ঢেঁটা হয়ে যায়।

সহজে আর পাত্তা দেয় না।

সালামাল্কি করতে চায় না।

ফোন করলে ফোন ধরে না। ম্যাসেজ দিলে উত্তর দেয় না।

অন্যভাবে বললে, বলে বিজি ছিলাম। মিথ্যা ওজর দিয়ে এড়িয়ে যেতে চায়।

নির্লজ্জ ও বেহায়া হয়ে যায়। অনেকে গালি খায়, অনেকে লানত পায়।

সব যেন গা-সওয়া হয়ে যায়। 'পিঠ করেছি কুলো, যত কিলোবি কিলো, কান করেছি ঢোল, যত বলবি বোল।'

তখন তার 'ঋণ মাথার পিন' নয়, দাতার মাথার পিন হয়ে যায়। ঋণ তার রাতের ঘুম কেড়ে নেয় না, দাতার প্রেসার বেড়ে যায় টাকা মারা পড়ার আশঙ্কা ও টেনশনে। নামায বরবাদ হয়। পাত্তা না দিলে মাথা ঠুকতে মন হয়!

অনেকে এমন ছেঁচড় হয়ে যায় যে, 'নিজেরটা ঢাকা থাক, পরেরটা বিকিয়ে যাক' নীতি চালিয়ে ঋণ বাকি রেখে কুরবানী দেয়, ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেয়, জমি কেনে, জমি বন্ধক নেয়, ঘর সাজায়, বিলাসিতা করে, বেড়াতে যায়, আরও কত কি!

ঋণীর উচিত এবং শতভাবে উচিত, উপকারের বদলা উপকার করে দেওয়া। যথাসময়ে প্রাপকের প্রাপ্য আদায় করে দেওয়া এবং টাল-বাহানা করে অথবা অস্বীকার করে লোকের মাল হরফ না করা।

আপনি অনেক সময় দেখবেন, বাহ্যতঃ আমানতদার ও মুত্তাকী মানুষ অতি বিনয় ও কাকুতি-মিনতির সাথে আপনার নিকট এসে মধুর ভাষায় ঋণ চেয়ে বসবে। এমনও হতে পারে যে, আপনার ঋণ দেওয়ার মত তত পরিমাণ অর্থ নেই, অথবা ঐ অর্থ আজ বা কাল আপনার নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সে আপনাকে আপনার দানশীলতা স্মরণ করিয়ে দেবে, সওয়াবের কথা মনে করিয়ে দেবে, দাওয়াত করে খাইয়ে দেবে, ছোটখাটো উপহার দান করবে, আবার অনেক সময় এমন লোক দ্বারা সুপারিশ করিয়ে নেবে, যার কথা আপনি রদ্দ করতে পারবেন না। ফলে আপনার মন না চাইলেও আপনি তাকে ঋণ দিতে বাধ্য হবেন। গোপনে তার হাতে টাকা ধরিয়ে দেবেন, আর এ ব্যাপারে সাক্ষী রাখতে এবং ঋণ-পত্র লিখতে লজ্জাবোধ করবেন, অথচ মহান আল্লাহ এ কাজ আমাদের জন্য ওয়াজেব না করলেও মুস্তাহাব বলে কুরআন কারীমের সবচেয়ে লম্বা আয়াতে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

যাই হোক, সে আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আপনার উপকার ও অনুগ্রহের বড় প্রশংসা করবে। হয়তো বা তার এই অতিরিক্ত ও ভূয়সী প্রশংসায় আপনি লজ্জাবোধ করবেন। তারপর সালাম জানিয়ে আপনার কাছ থেকে বিদায় নেবে। কিন্তু তারপর?

তারপর তার আর দেখা পাবেন না। তার টিঁকিও আর নজরে আসবে না। আপনি তাকে খোঁজ করবেন। ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। আপনারও টাকার বিশেষ দরকার পড়েছে। আপনি আপনার প্রাপ্য তার নিকট চাইবেন, কিন্তু সে আপনার ছায়া থেকে বহু দূরে দূরে থাকবে। আপনি তার বাড়ির দরজায় করাঘাত করবেন, বাড়ির লোক আপনাকে বলবে, 'সে বাড়িতে নেই।' আপনি সকালে আসবেন, বলবে, 'সে ঘুমিয়ে আছে।' অতঃপর ফিরে গিয়ে এক ঘন্টা পরে আসবেন, বলবে, 'সে বাইরে গেছে।' ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে দেখা হলে বা ফোনে কোন প্রকার কথা হলেও সে কিন্তু আপনার ঋণের কথা তুলবে না। যত তাড়াতাড়ি পারে আপনার বলার আগে সালাম দিয়ে বিদায় নিতে চাইবে। যেন সে আপনার কাছ থেকে কিছুই নেয়নি।

তখন আপনাকে নিশ্চয়ই অন্য উপায় খুঁজতে হবে। তার বন্ধুদের দ্বারা এ ব্যাপারে সুপারিশ করাবেন, তখন তার প্রেসটিজে লাগবে, সে রেগে উঠবে। নাক সিঁটকে বলে উঠবে, 'আরে ভাই! ক'টা টাকা ঋণ দিয়ে আমাকে পেরেশান করে দিলে। টাকাটার জন্য আজব কচকচানি। তোমার কি ভয় হয় যে টাকাটা আমি খেয়ে ফেলব?' সে আপনাকে ধমক দেবে! অথচ আপনি তার সাথে নরম কথা বলবেন। আর এটাই বাস্তব।

পরিশেষে সে যদি 'ভাল' লোক হয়, তাহলে আপনার টাকা পরিশোধ করবে; কিন্তু ৫০/১০০ করে। এর ফলে ঋণ আদায় করতে আপনার ঘাম ছুটে যাবে। তখন মাল আপনার ফিতনা হয়ে দাঁড়াবে। তার পিছনে নিজ মূল্যবান সময় ব্যয় করবেন। অথচ ঐ টাকা ফেরৎ পেয়েও কোন উপকৃত হতে পারবেন না। সে আপনার নিকট থেকে এক সঙ্গে থোকে নিয়ে আপনাকে কিছু কিছু করে অল্প অল্প পরিমাণ শোধ করবে। বলা বাহুল্য, আপনি নিজের কাজের সময় সম্পূর্ণ টাকা এক থোকে ব্যয় করতে পাবেন না।

পক্ষান্তরে লোক যদি দায়-দায়িত্বহীন মন্দ হয়, তাহলে তো সে আপনার সম্পূর্ণ ঋণই খেয়ে বসবে। সাক্ষাৎ হয়ে চাইতে গেলেই কপাল চড়িয়ে, ভ্রূ কুঞ্চিত করে, চিৎকার করে বলে উঠবে, 'আমি তোমার ধারি না যাও। কী করবে করে নাও। থানা যাও, কোর্ট যাও---।' আর সে জানে যে, আপনার হাতে তার বিরুদ্ধে কোন দলীল-প্রমাণ নেই। কারণ, তখন আপনি লিখতে শরম করেছেন। সুতরাং থানা-পুলিশ করে কোন লাভও হবে না। আর যদি মেনেই নিই যে, আপনি ঋণ দেওয়ার সময় ঋণ-পত্র লিখে স্বাক্ষর-সাক্ষী রেখেছেন। তবুও কি কেস করে তার ফায়সালার অপেক্ষায় এত লম্বা সময় আপনি ধৈর্য রাখতে পারবেন? কেস করার থেকে আপনার ঐ টাকা নষ্ট হওয়াই ভাল হবে। কেননা, কেস করে তো বিড়াল লাভের জন্য মহিষ বিক্রি করতে হবে। আর তাতে আপনি নাকের বদলে নরুন পাবেন। নচেৎ (অমুসলিমদের ভাষায়) 'ঢাকের দায়ে মনসাই বিকিয়ে যাবে'।

আর পরকালে ভয় দেখিয়ে আদায় করবেন? ('কিয়ামতের দিনে আদায় করব' বললে অনেকে বলে, 'ভালো করলে, অনেক লম্বা সময় দিলে, শুকরিয়া তোমার!') তার কিয়ামতের বিশ্বাস বা ভয় থাকলে তবে তো?

পক্ষান্তরে এমনও কিছু চালাক লোক আছে, যারা আপনার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চট করে 'ফিক্সড ডিপোজিট' করে দেবে। অতঃপর ৫/৭ বছর সে টাকা আপনাকে শোধ না দিয়ে ব্যাংকে তা 'ম্যাচুরিটি' হয়ে ডবল হলে আপনাকে আপনার ঋণ ফেরৎ দিয়ে সূদ খেয়ে তৃপ্তি পাবে!

অনেক ধৃষ্ট ঋণগ্রহীতা আছে, যারা ঋণ নেবার সময় লিখালিখি করতে সম্মানে বাধায়, কিন্তু পরিশোধের সময় দাতার কাছে টাকা ফেরৎ পাওয়ার স্বাক্ষর করিয়ে নিতে লজ্জাবোধ করে না। এমন লোকেরা কি দ্বিতীয়বার ঋণ পাওয়ার যোগ্য? বলা বাহুল্য নানা ভোগান্তির কারণেই বহু (অমুসলিম) মহাজন বলে থাকে বা নিজ দোকানে লিখে থাকে,

'আজ নগদ কাল ধার,

ধারের পায়ে নমস্কার।'

আর তার জন্যই এসেছে অভিশপ্ত সূদী কারবার। যেহেতু তাতে থাকে দুই তরফের পার্থিব লাভ এবং দেনাদারের তাড়াতাড়ি আদায় দেওয়ার হুঁশ!

এর জন্যই অনেক সময় পরিশোধ করতে পারবে এমন লোকেরা ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ ঠকে শিক্ষা পেয়ে আর কেউ ঋণ দিয়ে বোকা হতে চায় না।

আর এই জন্যই অনেকে ঋণ না পেয়ে অপমানিত হয়ে শত্রুতে পরিণত হয়। কাছের বন্ধু বেজার হয়ে যায়।

সবশেষে বলি, হে ভাই ঋণী! এহসানীর বদলা কি এহসানী নয়? আপনাকে যে হাসিয়ে ঋণ দিল, তাকে আপনি ফাঁসিয়ে দিলেন এবং তার টাকাগুলো নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিলেন?

হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি লোকের মাল নিয়ে আদায় করার ইচ্ছা রাখে, সে ব্যক্তির তরফ থেকে তুমি তা আদায় ক'রে দাও।

আর যে ব্যক্তি তা নিয়ে আত্মসাৎ করার ইচ্ছা রাখে, তুমি তাকে (দুনিয়াতে ও আখেরাতে) ধ্বংস করো।


লিখেছেন: শাইখ আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ